kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রহস্যঘেরা জিন মসজিদ

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রহস্যঘেরা জিন মসজিদ

মহান আল্লাহর অপার সৃষ্টিরহস্যের অন্যতম বিস্ময় জিন জাতি। জিন শব্দের অর্থ গোপন, গোপনীয়, গুপ্ত। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত ‘জিনের অস্তিত্ব’ অস্বীকার করা ঈমানের পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে এসেছে—‘আমি (আল্লাহ) জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমারই ইবাদত করার জন্য।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)

পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নাম ‘জিন’। পবিত্র কাবাঘরের অদূরে অবস্থিত ‘মসজিদে জিন’, এখানেই জিনরা প্রিয় নবী (সা.)-এর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন শুনে তাঁর প্রতি ঈমান আনে। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘অতঃপর তারা (নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল) আমরা এক বিস্ময়কর কোরআন শুনেছি, যা সঠিক ও নির্ভুল পথ প্রদর্শন করে। তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি...।’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১-২)

পবিত্র মদিনার পার্শ্ববর্তী ‘ওয়াদিউল জিন’ নামক স্থানেও প্রিয় নবী (সা.) জিনদের ঈমান-ইসলামের পথে দাওয়াত দিয়েছিলেন।

এমনকি অনেকের মতে, বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণে হজরত সুলাইমান (আ.) জিনদের কাজে লাগিয়েছিলেন।

বাংলাদেশেও কিংবদন্তি ও লোকায়ত ভাবনায় জিন মসজিদের অস্তিত্ব ও খ্যাতির অনুসন্ধান মেলে। যদিও এগুলোর সত্যতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

যেমন—লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার দেনায়েতপুর গ্রামে অবস্থিত মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ। জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেড় শ বছর আগে, শত শত জিন মিলে রাতারাতি মসজিদটি তৈরি করে। যদিও মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা মসজিদ তৈরিবিষয়ক জনশ্রুতিটি বিশ্বাস করে না।

লক্ষ্মীপুরের জিন মসজিদ বা মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ

লক্ষ্মীপুরের প্রখ্যাত আলিম মাওলানা আবদুল্লাহ (রহ.) ভারতের দেওবন্দে উচ্চশিক্ষা লাভের পর দেশে ফিরে ১৮৮৮ সালে দিল্লির শাহি মসজিদের আদলে মসজিদটি তৈরি করেন। ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থ এ মসজিদে তিনটি গম্বুজ ও চারটি মিনার রয়েছে। প্রতি কাতারে ৮৫ জন বা ছয় কাতারে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

সমতল ভূমি থেকে মসজিদটি বেশ উঁচুতে অবস্থিত, ১৩ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। অন্য এক পাশের সিঁড়ি মসজিদের নিচের দিকে নেমে গেছে ২০ ফুট গভীরে, সেখানে রয়েছে একটি ইবাদতখানা। মাওলানা আবদুল্লাহ (রহ.) সেখানেই অধ্যাত্ম সাধনায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এখন অবশ্য সেখানে পানি জমে থাকে। মসজিদের পাশেই আছে কওমি মাদরাসা, মুসাফিরখানা ও বিশাল দিঘি।

অন্যদিকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় যাওয়ার পথে ভুল্লি-পাঁচপীরহাট সড়কের পাশে অবস্থিত ছোট বালিয়া জামে মসজিদ।

রূপকথা অনুযায়ী, কোনো এক অমাবস্যা রাতে জিন-পরিরা ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় এলাকাটি তাদের পছন্দ হলে তারা মাটিতে নেমে আসে এবং মসজিদ তৈরি শুরু করে। কিন্তু গম্বুজ তৈরির আগেই সকাল হয়ে গেলে কাজ শেষ না করেই ওরা চলে যায়। ফলে গম্বুজ ছাড়া দাঁড়িয়ে যায় অসাধারণ একটি মসজিদ! স্থানীয়দের কাছে এ জন্যই ছোট বালিয়া জামে মসজিদ স্বীকৃত হয় ‘জিন মসজিদ’ হিসেবে।

ছোট বালিয়া জামে মসজিদ নির্মাণকাহিনি

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় জমিদার মেহের বকস চৌধুরী উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বালিয়া মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা করেন। শিলালিপি অনুসারে মসজিদটির নির্মাণকাল ১৩১৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯১০ সাল।

কথিত আছে, জমিদার মেহের বকস চৌধুরী দিল্লির আগ্রা ও পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ থেকে স্থপতি নিয়ে আসেন। মোগল স্থাপত্যশৈলীর জটিল নকশার মসজিদটি নির্মাণ যেমন ছিল ব্যয়বহুল, তেমনি সময়সাপেক্ষ। মসজিদ নির্মাণ অসম্পূর্ণ রেখেই প্রধান স্থপতি মারা গেলে কাজও বন্ধ হয়ে যায়। জমিদার মেহের বকস স্থানীয় কারিগর দিয়ে মসজিদের কাজ শুরু করলেও তাঁরা মসজিদের গম্বুজ বানাতে পারেননি। অন্যদিকে মেহের বকসও ১৩১৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯১০ সালে মারা যান। পরে মেহের বকসের ছোট ভাই মসজিদের কাজে হাত দেন, তিনিও মসজিদের কাজ শেষ হওয়ার আগেই মারা যান। ফলে গম্বুজবিহীনভাবেই মসজিদের ১০০ বছর পেরিয়ে যায়।

তবে ২০১০ সালে মেহের বকসের প্রপৌত্রী তসরিফা খাতুনের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের সহায়তায় গম্বুজসহ মসজিদের নির্মাণ ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়।

সমতল থেকে ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উঁচু ভিত্তির ওপর পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি, উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি মসজিদ কমপ্লেক্সটি সিঁড়িপথ, খোলা চত্বর ও নামাজঘর এমন তিন অংশে বিভক্ত। মূল ভবনের ছাদ মেঝে থেকে ১৭ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। বর্তমানে ছোট বালিয়া মসজিদে একই আকারের তিনটি গম্বুজ ও চার কোনায় চারটি বড় মিনার ছাড়াও রয়েছে আরো ছোট চারটি মিনার। হাতে পোড়ানো ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদের দেয়ালে ইট কেটে কলস, ঘণ্টা, বাটি, ফুল ইত্যাদির নকশা তৈরি করা হয়েছে।

খাজা শাহবাজ মসজিদ নির্মাণকাহিনি

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন তিন নেতার মাজারের পাশের হাজি খাজা শাহবাজ মসজিদ অবস্থিত। অভিজাত ব্যবসায়ী হাজি শাহবাজ কাশ্মীরি ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে বসতি গড়েন। জনশ্রুতি আছে, খাজা শাহবাজ টঙ্গী থেকে এসে জিনদের নিয়ে এ মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। এ জন্যই খাজা শাহবাজ মসজিদকে জিন মসজিদ বলা হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ৬৮ ও প্রস্থে ২৬ ফুট। মিম্বর কালো পাথরের, বাইরের রং লাল। মসজিদটিকে প্রত্নসম্পদ ঘোষণা করা হয়েছে। মোগল স্থাপত্যশৈলীর খাজা শাহবাজ মসজিদ ঢাকার ৩৩৮ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় রয়েছে, শাহজাদা মুহাম্মদ আজমের সুবাহ্দারির সময় হাজি খাজা শাহবাজ মসজিদ বা এই জিন মসজিদ নির্মিত।

আসলে বাংলাদেশের জিন মসজিদগুলো জাতীয় ঐতিহ্য ও মুসলিম স্থাপত্যকলার অংশ। নির্মাণশৈলী ও কিংবদন্তিতে অনন্য এসব মসজিদের যেমন রয়েছে ইবাদতের গাম্ভীর্য, তেমনি আছে পর্যটন গুরুত্ব। আবার বাংলাদেশের অনেক মসজিদেই জিনের অস্তিত্ব ও গভীর রাতে ইবাদতের জনশ্রুতিও রয়েছে। লোক-বিশ্বাসের পেছনে প্রামাণ্য ভিত্তির প্রয়োজন হয় না। বরং শ্রুতি ও আগ্রহই তো কিংবদন্তির প্রাণ। কেননা কিংবদন্তি অর্ধসত্য ও অর্ধ-ঐতিহাসিক। সত্যের খোলস ইতিহাস এবং ইতিহাসের কঙ্কাল কিংবদন্তি। ওই কঙ্কালে কল্পনার লেবাস লাগিয়ে ইতিহাস হেঁটে চলে মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায়। জনশ্রুতি, গল্প-গীত ইত্যাদির যত্নে কিংবদন্তি বেঁচে থাকে পরম সম্মানে এবং বড় হয় গর্বের মান্যতায়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া গাজীপুর।

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা