kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ আষাঢ় ১৪২৭। ১৪ জুলাই ২০২০। ২২ জিলকদ ১৪৪১

ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর

আধ্যাত্মিক সাধনা

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আধ্যাত্মিক সাধনা

আত্মশুদ্ধি হলো আত্মাকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করা। বাহ্যিক বিষয়ের মতো আত্মিকভাবেও অসংখ্য পাপ-পঙ্কিলতা বিদ্যমান। সেসব বিধানের চর্চা ও সে অনুযায়ী আমল করার নামই হলো আত্মশুদ্ধি। নবী করিম (সা.)-কে দুনিয়ায় প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাজকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তিনি [মহানবী (সা.)] তাদের আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে শোনাবেন আর তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের আত্মশুদ্ধি করবেন...।’ (সুরা, বাকারা, আয়াত : ১২৯)

কেউ যদি অন্তরে খারাপ নিয়ত রেখে বাহ্যিকভাবে কোনো ভালো কাজ করে, তাহলেও আল্লাহর কাছে তা গৃহীত হয় না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফলকাম, যে আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করেছে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৯)

যাদের অন্তর পরিশুদ্ধ নয় কিংবা পরিশুদ্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আসলে চক্ষু তো অন্ধ হয় না, বস্তুত অন্তরই অন্ধ হয়।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪৬)

অন্য আয়াতে এসেছে : ‘আল্লাহ মোহর এঁটে দিয়েছেন তাদের অন্তরে। ফলে তারা বুঝতেও পারেনি।’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ৯৩)

হাদিস শরিফে আছে, ‘জেনে রেখো, মানুষের দেহের মধ্যে একখণ্ড মাংসপিণ্ড আছে, যখন তা সংশোধিত হয়, তখন গোটা দেহ সংশোধিত হয়ে যায়। আর যখন তা দূষিত হয়, তখন পুরো দেহটাই দূষিত হয়ে যায়। মনে রেখো সেটাই কলব।’ (বুখারি ও মুসলিম)

উল্লিখিত কোরআনের আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের কলবের পরিচ্ছন্নতা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মোক্ষম পথ। অন্তরের অপরিচ্ছন্নতা মানুষকে কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যায়। তাই উলামায়ে কেরাম তালিমের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন। জাহেরি শিক্ষার পাশাপাশি বাতেনি শিক্ষা তথা আত্মশুদ্ধির প্রতি অতীব গুরুত্বারোপ করেছেন।

আত্মশুদ্ধি বা রুহানি শিক্ষার ব্যাপারে রাসুল (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও আগের মনীষীদের বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। উপমহাদেশের অন্যতম ইলমি ও রুহানি ব্যক্তিত্ব ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.) বসুন্ধরা, ঢাকায় ইসলামী উচ্চশিক্ষা ও আত্মশুদ্ধি কোর্সের সমন্বয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন আজ থেকে প্রায় ২৮ বছর আগে। ‘মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ’ নামে এই প্রতিষ্ঠানটি অতি স্বল্প সময়েই ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিম বিশ্বে খ্যাতি ও বিশ্রুতি লাভ করেছে। ইসলামী উচ্চশিক্ষা বিষয়ে যেমন প্রতিষ্ঠানটি সবার কাছে সমাদৃত, তেমনি আধ্যাত্মিকতা ও আত্মশুদ্ধির  মেহনতের ক্ষেত্রেও এটি অনন্য হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা আওলাদে রাসুল সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) এর সরাসরি ছাত্র। তিনি ছিলেন শায়খুল হাদিস হযরত জাকারিয়া (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক দীক্ষাপ্রাপ্ত। তিনি ছিলেন হাকিমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভি (রহ.)-এর খলিফায়ে আজল হজরত হারদুয়ী (রহ.)-এর খলিফা। তিনি আত্মশুদ্ধির বিশুদ্ধ চর্চার জন্য ‘মারকাযুল ইসলামী’তে প্রতিষ্ঠা করেন একটি ‘খানেকাহ’। যার নাম দেওয়া হয়—‘খানেকাহে এমদাদিয়া আশরাফিয়া আবরারিয়া।’ প্রতিদিন মারকাযে আত্মশুদ্ধির কোর্স হিসেবে, সাহরির সময় জিকির, সুন্নতি জিন্দেগি গড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান ও ছাত্রদের যাবতীয় তত্ত্বাবধান করা হয়।

আর প্রতি আরবি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার আত্মশুদ্ধিমূলক আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। এবং প্রতিবছর রবিউল আওয়ালের প্রথম বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই দিনব্যাপী ‘এহয়ায়ে সুন্নাত ইজতিমা’র আয়োজন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি ১৪৪১ হিজরি সালে ১৭তম আত্মশুদ্ধিমূলক মাহফিলের আজ সমাপনী দিবস।

এটি বিশেষভাবে আলেমদের জন্য আয়োজন করা হয়। এই ইজতেমায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হজরতের খলিফা-মুরিদানসহ উলামায়ে কেরাম, মসজিদের খতিব ও ইমামরা অংশগ্রহণ করেন। কেননা আলেমরা হলেন সমাজের প্রাণ। আলেম, ইমাম ও খতিবদের সংশোধন হলে সমাজ সংশোধনের পথ খুব দ্রুত প্রশস্ত হবে।

গত ১০-১১-২০১৫ হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.) জান্নাতবাসী হয়েছেন। তখন থেকে তাঁর সুযোগ্য সাহেবজাদা হজরত মাওলানা মুফতি আরশাদ রহমানি তাঁর অনুকরণেই সার্বিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যেকটি বিষয়ে তিনি সফল কাণ্ডারির ভূমিকায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনিও পিতার মতো হজরত হারদুয়ী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা। রুহানি দীক্ষা ও আত্মশুদ্ধি বিষয়ক হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর মহান মিশনও সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

এই আত্মশুদ্ধিমূলক মাহফিলের প্রথম দিনেই উপস্থিত হয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মান্যগণ্য বরেণ্য প্রায় এক হাজার ৫০০ উলামায়ে কেরাম। কর্তৃপক্ষও দূর-দুরান্ত থেকে আগত মেহমান উলামায়ে কেরামের জন্য যথাসম্ভব উন্নত মেহমানদারি ও খেদমতের ব্যবস্থা করেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর রুহানি ফয়েজ দ্বারা আমাদের ধন্য করুন। আমিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা