kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইসলামের আলোকে বাড়ি ভাড়ার নিয়মনীতি

মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া, নায়েবে মুফতি, মারকাযুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়া, ঢাকা

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



ইসলামের আলোকে বাড়ি ভাড়ার নিয়মনীতি

বাসস্থান মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। জীবিকা উপার্জনের তাগিদে বহু মানুষ আজ শহরমুখী। তাই প্রয়োজন হয়েছে বিপুলসংখ্যক বাসস্থানের। জীবনের এই অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের তাগিদে শহরগুলোতে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট। তৈরি হচ্ছে বড় বড় কমার্শিয়াল স্পেস ও শপিং মল।

বসবাস বা ব্যবসার প্রয়োজনে বাড়ি বা দোকান ভাড়া নেওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। এটি যুগ যুগ ধরে চলমান একটি ব্যবস্থা। ভাড়া বাসায়ই সারাটি জীবন পার করে দিচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। আজকের নাগরিক সভ্যতায় এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও বিধি-বিধান। ভাড়া দেওয়া-নেওয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই শরিয়তে যেমন ভাড়া প্রক্রিয়ার স্বীকৃতি রয়েছে, তেমনি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে  এর বিধি-বিধান।

কোরআন মজিদ এবং হাদিস শরিফে ভাড়া তথা ইজারার বৈধতা এবং এর বিধান সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। ফিকহবিদরা সেগুলোর আলোকে ইজারার বৈধ ও অবৈধ পন্থা, বৈধতার শর্তাবলি এবং অবৈধতার ক্ষেত্রগুলো এবং এ ক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেগুলো মেনে চললে ভাড়া চুক্তিটি শরিয়তসম্মত হবে এবং উভয় পক্ষ ইহকাল ও পরকালে এর সুফল ভোগ করবে।

অবশ্য দুঃখজনক ব্যাপার হলো, অনেক ক্ষেত্রেই শরিয়তের ওই সব বিধানের বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। ফলে কোনো ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা কর্তৃক ভাড়াটিয়া নিগৃহীত হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার দ্বারা বাড়িওয়ালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে হয়তো এর কারণ এটাই যে তারা এসংক্রান্ত শরয়ি আহকাম জানে না। আবার কেউ হয়তো এটাকে শরিয়তসংশ্লিষ্ট বিষয়ই মনে করে না; বরং আগাগোড়াই জাগতিক বিষয় মনে করে থাকে। তাই এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান জানার চেষ্টা করে না। আর শুধু নিজের স্বার্থই সামনে রাখে, অন্যের ক্ষতি হলো কি না বা তার প্রতি জুলুম হলো কি না তা ভেবেও দেখে না।

তাই ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের করণীয় ও সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হলো।

প্রথমেই মৌলিক কয়েকটি বিষয় :

১. ভাড়ার পরিমাণ অবশ্যই নির্দিষ্ট হতে হবে।

২. যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া হবে এর সব সুবিধা-অসুবিধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি ভাড়াটিয়াকে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করতে হবে।

বাড়িওয়ালার কর্তব্য

১. বাড়িভাড়া কত তা নির্ধারণ করে জানানো। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল কি ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত, না এর বাইরে তা-ও জানানো উচিত। তা ছাড়া নাইট গার্ড ও বাড়ির দারোয়ানের বেতন, ময়লা ফেলার বিল কিংবা অ্যাপার্টমেন্টগুলোর সার্ভিস ফি ইত্যাদি মিলে প্রতি মাসে সাধারণত কত টাকা হয়, তা চুক্তির সময়ই বলে দেওয়া আবশ্যক।

২. প্রতি মাসের ভাড়া কত তারিখের মধ্যে দিতে হবে তা চুক্তির সময়ই জানিয়ে দিতে হবে।

৩. বাড়ির সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে ভাড়াটিয়াকে আগেই অবহিত করা আবশ্যক। বিশেষত এমন ত্রুটি, যা জানতে পারলে সে হয়তো ভাড়াই নেবে না বা যেটির কারণে ভাড়া আরো কম হবে; যেমন—পানি নিয়মিত বা সার্বক্ষণিক না থাকা বা নিয়ম করে পানি দেওয়া। গ্যাসের সমস্যা থাকা বা দারোয়ান না থাকার কারণে গেট নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ইত্যাদি। কোনো কোনো বাসার লাইনে এক-দুইবার পানি ছাড়া হয় আর সবাই তখন নিজ নিজ পাত্রে জমা করে রাখে। এমন হলে ভাড়া চুক্তির সময়ই বলে দিতে হবে।

৪. বাড়ির মূল ফটক রাত কয়টায় বন্ধ করা হবে তা নির্ধারিত থাকলে চুক্তির সময়ই বলে দিতে হবে। যেন এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে দ্বন্দ্ব না হয়।

৫. প্রতিটি ফ্ল্যাটে পৃথক বিদ্যুৎ মিটার লাগানো উচিত, যেন প্রতিটি পরিবার নিজ খরচ অনুযায়ী বিল পরিশোধ করতে পারে। কোনো কোনো বাড়িতে সব ফ্ল্যাটের জন্য একটিমাত্র মিটার থাকে। ফলে সব ফ্ল্যাটের হিসাব একত্রে হয় এবং এক মিটারে অতিরিক্ত খরচ হওয়ার কারণে ইউনিটপ্রতি খরচ অনেক বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আরেকটি ত্রুটি হলো, মিটার একটি হওয়ার কারণে সবার ওপর সমহারে বিল চাপানো হয়। এতে বিদ্যুতের স্বল্প ব্যবহারের কারণে যাদের বাস্তব খরচ কম হয়, তাদের ওপর জুলুম হয়ে যায়। এ জন্য প্রতিটি ফ্ল্যাটে ভিন্ন ভিন্ন মিটার লাগানো দরকার।

তেমনি পানির মিটারও ভিন্ন হওয়া উচিত, যেন যার যার খরচ অনুযায়ী বিল নেওয়া যায়। শোনা গেছে যে ওয়াসা এভাবে প্রতি ইউনিটের জন্য আলাদা মিটার দেয় না। তাই এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দুটি পদ্ধতির কোনো একটি অবলম্বন করা যেতে পারে—

১. প্রতি মাসের পানির বিল সব ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়াদের মাঝে বণ্টন করে দেবে।

২. বাড়িওয়ালা পানির বিল বাসাভাড়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেবে। পানির নামে ভিন্ন বিল নেবে না। এ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা পূর্ণ ভাড়ার মালিক হবে। আর পানির বিল সে-ই আদায় করবে।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি প্রথমটির চেয়ে নিরাপদ ও উত্তম। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো বাসায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য ৩০০ বা ৪০০ টাকা পানির বিল নেওয়া হয়। কোনো কোনো এলাকায় এর চেয়েও বেশি নেওয়া হয়। ফলে কখনো কখনো এই টাকা দ্বারা মোট পানির বিল দিয়েও আরো উদ্বৃত্ত থেকে যায়। বাড়িওয়ালাকে নিজের ফ্ল্যাটে ব্যবহৃত পানির বিল দিতে হয় না। উপরন্তু কখনো তা আরো অতিরিক্ত থেকে যায়। অথচ বাড়িওয়ালার জন্য পানির বিলের ক্ষেত্রে ব্যবসা করা বা অতিরিক্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াসার পানি দ্বারা ব্যবসা করার অনুমতি নেই। আর এটি ভাড়াটিয়াকে জানিয়েও করা হয় না। বরং কেউ কেউ তো খরচ অনুযায়ী নেওয়ার দাবি করে খরচের চেয়ে বেশি নিয়ে থাকে। তাই এভাবে অতিরিক্ত নেওয়া বৈধ হবে না।

৬. বাড়ি ছেড়ে দিতে হলে কত দিন আগে জানাতে হবে তা-ও চুক্তির সময় জানিয়ে দিতে হবে। কেউ কেউ দুই মাস আগে জানানোর শর্ত করে। চলতি মাসে বা আগের মাসে জানানোর শর্ত করা দূষণীয় নয়। সুতরাং বাড়ি ছাড়ার সময় চূড়ান্ত করা হলে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালা উভয়ের জন্যই তা পালনীয় হবে।

লক্ষণীয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চলতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে জানানোর শর্ত থাকে। তবে ভাড়াটিয়া যদি এর এক বা দুই দিন পরে জানায় তাহলেও পরবর্তী মাসের ভাড়া আদায় করা হয়। কখনো দুই মাস আগে জানানোর কথা থাকে। কিন্তু ভাড়াটিয়া হয়তো সময়মতো জানাতে পারেনি। তখন সে বাসা ছেড়ে দেওয়ার পরও তার থেকে দুই মাসের ভাড়া কেটে রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা বাস্তবেই অন্যত্র ভাড়া দিতে না পারলে পূর্বশর্ত অনুযায়ী ভাড়াটিয়া থেকে নির্ধারিত টাকা নেওয়া বৈধ হতে পারে।

তবে বাড়ির মালিকের কর্তব্য অন্যত্র ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করা। বাসাটি ভাড়া হয়ে গেলে আগের ভাড়াটিয়া থেকে অতিরিক্ত যা নেওয়া হয়েছে তা তাকে ফেরত দেওয়া জরুরি। নতুন ভাড়াটিয়া পেয়ে গেলে আগের ভাড়াটিয়া থেকে এ সময়ের ভাড়া রেখে দেওয়া জায়েজ হবে না।

 

ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব

শরিয়তের দৃষ্টিতে ভাড়াকৃত ভবন বা ফ্ল্যাট ভাড়াটিয়ার হাতে আমানত। এর যথাযথ ব্যবহার না করলে বা এ ক্ষেত্রে অবহেলা করলে সেটি খেয়ানত হবে। তাই বাড়ির সব কিছু যত্নসহকারে ব্যবহার করতে হবে। সজাগ থাকতে হবে, যেন ব্যবহারের ত্রুটির কারণে কোনো জিনিস নষ্ট না হয়। বেশি ময়লা জমে ফ্লোর যেন নষ্ট না হয়। এমনকি বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া দেয়ালে বেশি পেরেক ইত্যাদি মারা থেকেও বিরত থাকা উচিত।

ব্যবহারকারীর সীমা লঙ্ঘনের কারণে কোনো জিনিস নষ্ট হলে এর ক্ষতিপূরণ ভাড়াটিয়াকেই দিতে হবে। অবশ্য সীমা লঙ্ঘন ছাড়া সাধারণ ব্যবহারের কারণে কোনো কিছু নষ্ট হয়ে গেলে নতুন পার্টস কিনে দেওয়া বা মেরামত করে দেওয়ার দায়িত্ব বাড়িওয়ালার; যেমন—পানির কল নষ্ট হয়ে গেলে, বাথরুমের লোডাউন বা কোনো ফিটিংস নষ্ট হয়ে গেলে। তেমনি দরজা-জানালা, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনে কোনো সমস্যা হলে এগুলো ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্বও বাড়িওয়ালার। এগুলো ভাড়াটিয়ার ওপর চাপানো যাবে না।

এ কথাও বোঝা দরকার যে একটি জিনিস যে ভাড়াটিয়ার কাছে নষ্ট হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই ভাড়াটিয়ার একক ব্যবহারের কারণেই নষ্ট হয় না; বরং আগের ভাড়াটিয়ার দীর্ঘদিনের ব্যবহারও এর কারণ হয়ে থাকে। তাই কল, এর ফিটিংস ইত্যাদি লাগিয়ে দেওয়া এবং ব্যবহার উপযোগী করে দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে বাড়িওয়ালারই দায়িত্ব। এগুলো নষ্ট হয়ে গেলে ভাড়াটিয়া থেকে তা আদায় করা অন্যায়। মনে রাখা দরকার, ভাড়া বস্তুর কোনো কিছু সাধারণ ব্যবহারে নষ্ট হলে তা মেরামত করা মালিকেরই দায়িত্ব।

সিকিউরিটি মানি প্রসঙ্গ

বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া থেকে অগ্রিম কিছু টাকা সিকিউরিটির জন্য নিয়ে থাকে। এই অগ্রিম টাকা আদায়ের বিভিন্ন নিয়ম আছে। নিয়মের ভিন্নতার কারণে এর বিধানও ভিন্ন হয়। যেমন—

১. কারো এমন নিয়ম থাকে যে এক বা দুই মাসের ভাড়া অগ্রিম দিতে হবে, যা বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় শেষ দুই মাসের ভাড়া হিসেবে ধরা হবে। এ ক্ষেত্রে তা ফিকহে ইসলামীর দৃষ্টিতে অগ্রিম ভাড়া হিসেবে ধর্তব্য হবে; সিকিউরিটি মানি তথা বন্ধক হিসেবে গণ্য হবে না।

২. দোকান বা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার জন্য দু-তিন লাখ বা আরো বেশি টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়। এরপর মাসে মাসে কিছু কিছু করে সব টাকা ভাড়ার সঙ্গে কেটে নেয়। পরে ফেরতযোগ্য হিসেবে কিছুই রাখা হয় না। এমনটি হলে এটিও অগ্রিম ভাড়া হিসেবে গণ্য হবে।

এ দুই ক্ষেত্রে অগ্রিম হিসেবে যা নেওয়া হয় সেই টাকার মালিক বাড়িওয়ালাই হবে। সুতরাং এ টাকা সে নিজ প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে এবং এটি তার জাকাতযোগ্য সম্পদ বলে গণ্য হবে। তাই জাকাতবর্ষ শেষে এই টাকা থেকে কিছু অবশিষ্ট থাকলে তাকেই এর জাকাত দিতে হবে। ভাড়াটিয়াকে এর জাকাত দিতে    হবে না।

৩. যদি অগ্রিম নেওয়া এই টাকা থেকে ভাড়া হিসেবে কোনো কিছু কাটা না হয় এবং চুক্তি শেষ হওয়ার আগের মাসগুলোর ভাড়া হিসেবেও গণ্য করা না হয়, বরং ভাড়াটিয়া বাড়ি ছাড়ার সময় তাকে এই টাকা ফেরত দেওয়ার শর্ত করা হয়, তাহলে এই টাকা সিকিউরিটি মানি বলে গণ্য হবে।

ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে সিকিউরিটি মানি রাহান তথা বন্ধকি সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। আর বন্ধকগ্রহীতার জন্য বন্ধকি বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েজ নেই। সেই হিসাবে বাড়ির মালিকের জন্য এই অগ্রিম টাকা খরচ করা জায়েজ নয়। সাধারণ নিয়মে টাকাগুলো নিজের কাছে বা ব্যাংকে রেখে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু আজকাল অনেক বাড়িওয়ালা বন্ধকের ওই নিয়ম মেনে চলে না। বরং প্রায় সবাই এ টাকা খরচ করে ফেলে। জমা রাখে না। তাই কোনো কোনো ইসলামিক স্কলার এই খরচকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই টাকাকে বন্ধক না ধরে ঋণ বলতে চান। আর এটিকে ভাড়ার সঙ্গে শর্ত না করে ভিন্নভাবে লেনদেন করতে বলেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে করলে বাড়িওয়ালার জন্য তা ব্যবহার করা বৈধ হবে। অবশ্য অন্য অনেক ইসলামী আইনবিদ এটিকে সিকিউরিটি তথা বন্ধকই বলেন। প্রমাণ ও দলিলের দিক থেকে এ মতটিই শক্তিশালী।

তবে হ্যাঁ, এই টাকাকে বন্ধক ধরা হলে সমস্যা হলো বাড়িওয়ালার জন্য তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়। আর ঋণ ধরা হলে সমস্যা হলো, ভাড়ার সঙ্গে ঋণ প্রদানের শর্ত করার কারণে ভাড়া-চুক্তি ভঙ্গ বা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে সিকিউরিটি মানির ক্ষেত্রে নিম্নের যেকোনো একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা নিরাপদ—

এক. একে অগ্রিম ভাড়া ধরা। অর্থাৎ বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় শেষের দিকের মাসের ভাড়া ধরা হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করা হবে। আর অগ্রিমের পরিমাণ বেশি হলে প্রতি মাসেই নগদ ভাড়ার সঙ্গে একটা অংশ ভাড়া হিসেবে কর্তন করা হবে। এই টাকা পরবর্তী সময়ে ফেরতযোগ্য হিসেবে ধরা হবে না। এভাবে অগ্রিম ভাড়া ধরা হলে এর মালিক বাড়িওয়ালাই হবে। এ ক্ষেত্রে সে তা ব্যবহার করতে পারবে এবং জাকাতও সে-ই আদায় করবে।

দুই. কোনো কোনো সময় বাড়িওয়ালা সিকিউরিটির টাকা দিয়ে বাড়ির সজ্জায়ন করে বা ফিটিংস ইত্যাদি লাগায়। এ ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে চুক্তি করা যেতে পারে : ভাড়াটিয়া এসব কাজ নিজ দায়িত্বে বা বাড়িওয়ালার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নিজের টাকা দিয়ে করে নেবে এবং তা ভাড়াটিয়ার মালিকানা হিসেবে গণ্য হবে। এরপর যখন বাসা ছেড়ে দেবে, তখন বাড়িওয়ালার কাছে একটি দাম ধরে জিনিসগুলো বিক্রি করে দেবে। এই পন্থা অবলম্বন করলে বন্ধক নিয়ে তা খরচ করার জটিলতাও থাকে না। আবার জাকাত কে দেবে—এই প্রশ্নও আসে না। কেননা ভাড়াটিয়া যেহেতু ওই টাকা খরচ করে ফেলেছে, তাই তার ওপর এর জাকাত আসবে না। আর বাড়িওয়ালাও এই টাকার মালিক হয়নি বিধায় তাকেও এর জাকাত দিতে হবে না।

 

ভাড়াটিয়া কি অন্যকে ভাড়া দিতে পারবে

নিজের জন্য ভাড়া নিয়ে মালিকের অনুমতি ছাড়া অন্যকে ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ার জন্য জায়েজ নেই। সুতরাং মালিকের অনুমতি ছাড়া সাবলেট নেওয়া বা অন্যকে ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ার জন্য বৈধ নয়। তবে মালিক অনুমতি দিলে অসুবিধা নেই।

আর নিজে ভাড়া নিয়ে পুরোটাই অন্যকে বেশি দামে ভাড়া দেওয়ার জন্য দুটি শর্ত আছে—

১. এর জন্য বাড়িওয়ালার অনুমতি নিতে হবে।

২. বেশি ভাড়া নিতে চাইলে ওই বাড়িতে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করতে হবে; যেমন—ডেকোরেশন করা, দরজা বা টাইলস লাগানো ইত্যাদি। আর সংস্কারমূলক কাজ বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়েই করতে হবে। নিজে ভাড়া নেওয়ার পর সংস্কারমূলক কোনো কাজ না করে বেশি টাকায় ভাড়া দেওয়া জায়েজ হবে না।

 

বাড়ি মর্টগেজ বা বন্ধক পদ্ধতি

কোনো কোনো বাড়ির মালিকের একত্রে পাঁচ-দশ লাখ টাকা দরকার হলে কারো থেকে এই শর্তে নেয় যে পাঁচ বছরের জন্য আপনি আমাকে ১০ লাখ টাকা দেন। আপনার টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ বছর পর্যন্ত আপনি আমার বাড়িতে ফ্রি বসবাস করবেন। অথবা অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে আপনি লাভবান হবেন। অনেকটা গ্রাম এলাকার জমি বন্ধক দেওয়ার মতোই।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময় নির্ধারিত থাকে না; বরং বলা হয়, যত দিন আপনার টাকা না দেব, তত দিন আমার বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভোগ করবেন। এই লেনদেন সম্পূর্ণ নাজায়েজ। কারণ এ ক্ষেত্রে বাসাটি বন্ধকি বস্তু। আর বন্ধকি বস্তু থেকে উপকার গ্রহণ করা ঋণ দিয়ে লাভ ভোগ করার মতো, যা সুদি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।

মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘এক ব্যক্তি আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে। আমি তার পিঠে আরোহণ করেছি।’ তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, ‘ঘোড়ার পিঠে চড়ে যে উপকার ভোগ করেছ তা সুদ।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৮০৭১)

ফাজালা বিন উবাইদ (রা.) বলেন, যে ঋণ কোনো লাভ নিয়ে আসে তা সুদের প্রকারসমূহের মধ্যে একটি। (সুনানে কুবরা, বায়হাকি, হাদিস : ১০৯৩৩)

 

সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিলে ভাড়া কমিয়ে দেওয়া

পূর্বোক্ত পদ্ধতির কাছাকাছি আরেকটি পদ্ধতি চালু হয়েছে। তা সচরাচর সিকিউরিটির মতো নয়; বরং কোনো এলাকায় সচরাচর সিকিউরিটি যদি ৫০ হাজার টাকা হয়, এ ক্ষেত্রে এর চেয়ে অনেক বেশি, যেমন—চার বা পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এই অতিরিক্ত সিকিউরিটি দেওয়ার কারণে ভাড়া একেবারে কমিয়ে দেওয়া হয়। যেমন—সাধারণ অবস্থায় ভাড়া যদি ১০ হাজার টাকা হয়, এ ক্ষেত্রে তার থেকে এক-দুই হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। যত দিন সিকিউরিটির টাকা ফেরত না দেবে, তত দিন ভাড়া এ রকম কম থাকবে।

এই পদ্ধতিও সম্পূর্ণ নাজায়েজ। মর্টগেজ পদ্ধতির মতো এটিও ঋণ দিয়ে মুনাফা ভোগ করারই আরেক ধরন। তাই এ পদ্ধতিও সম্পূূর্ণ বর্জনীয়। বেশি পরিমাণ সিকিউরিটি জমা নিলেও ভাড়া সাধারণত অন্যান্য বাসাবাড়িতে যেমন নেওয়া হয়, তেমনই নেওয়া উচিত। ভাড়া অস্বাভাবিক কমালে তা বন্ধকি সম্পত্তি থেকে উপকৃত হওয়া বা ঋণের কারণে লাভবান হওয়ার আওতায় পড়ে নাজায়েজ হবে।

 

ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গ

বাড়িওয়ালারা বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ভাড়া বাড়িয়ে থাকে; যেমন—অনেক মালিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে, সরকারি বেতন বাড়লে কিংবা নতুন বছর শুরু হলে অথবা কোনো উপলক্ষ ছাড়াই ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। এসব ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা নিজ ইচ্ছা অনুযায়ীই ভাড়া বাড়িয়ে থাকে। অথচ অযথা কিংবা যৌক্তিক কারণ ছাড়া ভাড়া বাড়ানো একটি অন্যায় কাজ। এ ছাড়া একসঙ্গে অস্বাভাবিক পরিমাণ ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়াও জুলুম ও অন্যায়। ভাড়া বাড়াতে হলে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে তা করবে। শরিয়তের দৃষ্টিতে ভাড়া-চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, এটি একতরফা চুক্তি নয়। এই নিয়ম মানা না হলে ভাড়াটিয়ার জন্য অন্যত্র চলে যাওয়ারও সুযোগ থাকবে।

আর মালিকের উচিত চুক্তির সময়ই ভাড়াটিয়ার সঙ্গে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বলে নেওয়া যে কখন থেকে ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে এবং কী পরিমাণ বৃদ্ধি করা হতে পারে, যেন পরবর্তী সময়ে পরস্পর মনোমালিন্যের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।

 

ভাড়াটিয়াকে বিনা কারণে নিষেধ করে দেওয়া

আগেই বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বাড়িওয়ালার যে চুক্তি হয়, তা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়া চুক্তির সময় শেষ হওয়ার আগে কারো জন্যই তা ভেঙে দেওয়া জায়েজ নয়। অবশ্য যৌক্তিক কোনো কারণ দেখা দিলে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালা উভয়ের জন্যই চুক্তি শেষ করে দেওয়ার সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াও অবশিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করে দোকান বা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারবে এবং বাড়িওয়ালাও তাকে দোকান বা বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে পারবে।

এখানে বাড়ি, দোকান ইত্যাদি ভাড়াসংক্রান্ত বহুল প্রচলিত কিছু মাসআলা উল্লেখ করা হলো। এ ছাড়া এ বিষয়ের আরো বহু মাসআলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গিয়ে তা জেনে নেওয়া আবশ্যক।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা