kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বৃহত্তর ময়মনসিংহের মসজিদ স্থাপত্য

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বৃহত্তর ময়মনসিংহের মসজিদ স্থাপত্য

‘হাওর জঙ্গল মৈষের শিং—এই তিনে ময়মনসিং’ বোঝাতে বলা হয়, ‘টানে শে কি মজা’ অর্থাৎ টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর।

১৭৮৭ সালের ১ মে জেলা এবং ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ময়মনসিংহ বাংলাদেশের অষ্টম বিভাগ হিসেবে পথচলা শুরু করে। ‘আইন-ই-আকবরি’র বর্ণনানুসারে, ‘আকবরের সময় মোমেনশাহী পরগনার শাসনকর্তা মোমেন শাহর নামানুসারে পরগনার নামকরণ হয় মোমেনশাহী। পরে আলাপসিং পরগনার ‘সিংহ’ যুক্ত হয়ে উচ্চারণ পরিবর্তনে হয় ময়মনসিংহ।’ (ইসলামী বিশ্বকোষ : ১৬ খণ্ড, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ১০৮)

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমনের ২৫০ বছর আগে ৪৪৫ হি. বা ১০৫৩ সালে হজরত শাহ মুহাম্মদ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহ.) বৃহত্তর ময়মনসিংহে ইসলাম প্রচার করেন।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব ও ঐতিহ্যের স্মারক মহানগরীর ‘বড় মসজিদ’। ১৮৫০-১৮৫২ সালে যাত্রা শুরু করা ১.৯ একর জমির ওপর নির্মিত ‘বড় মসজিদ’ একটি তিনতলা সুরম্য স্থাপত্য। দৈর্ঘ্য ১০৫ ফুট ও প্রস্থ ৮৫ ফুট। অপূর্ব অলংকরণে সুশোভিত মসজিদের ১২৫ ফুট উঁচু দুটি মিনার ও একটি কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরে মূল্যবান মোজাইক পাথরের মেঝে, দেয়ালজুড়ে স্বেত শুভ্র মনোরম টাইলস, সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, অত্যাধুনিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও তাপানুকূল ব্যবস্থা মুসল্লি মননে জান্নাতি আবহ জাগিয়ে তোলে।

প্রায় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মিসরের প্রখ্যাত কারি ও আলিম হজরত মাওলানা আব্দুল আওয়াল (রহ.) ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। মিসরি কারি সাহেব নামে তিনি পরিচিত ছিলেন। এরপর টানা ৫৬ বছর হাকিমুল উম্মাত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবির (রহ.) খলিফা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, জামানার কুতুব হজরত মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ.) ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। এ মহান সাধকের আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য, ফায়েজ, মেহনতে বড় মসজিদের দ্যুতি বিশ্বব্যাপী।

ভাটি বাংলার ঐতিহ্য ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব ‘গায়েবি মসজিদ’। সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচলিত, প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের পর সহসা এক মসজিদের গম্বুজ মানুষের নজরে আসে। তারা মাটি খুঁড়ে ও জঙ্গল পরিষ্কার করে মসজিদটি ব্যবহার উপযোগী করে। অত্যাচারী কোচরাজার নিষ্ঠুরতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি আবার অলৌকিকভাবে আবাদযোগ্য হলে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত হয়।

বর্ণিত আছে, সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে ঈশা খাঁর সমসাময়িক ইটনার দেওয়ান মজলিস দেলোয়ার খাঁ ‘গায়েবি মসজিদ’ নির্মাণ করেছিলেন। মোগল স্থাপত্যরীতিতে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় নির্মিত মসজিদটি ‘বাদশাহী মসজিদ’ বা ‘বড় মসজিদ’ নামেও পরিচিত। পাঁচ ফুট প্রশস্ত ও ৩২ ফুট উচ্চতার দেয়ালে নির্মিত মসজিদটি সুবৃহৎ তিনটি গম্বুজে ঢাকা একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য।

বাংলাদেশের ১০ টাকার নোটে শোভিত ‘আতিয়া মসজিদ’ টাঙ্গাইলের ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার লৌহজং নদীর পূর্ব পারে অবস্থিত। জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ‘আতিয়া মসজিদ’ ১০১৯ হি. (১৬১০-১১ সাল) নির্মিত হয়। শাহান শাহ বাবা আদম কাশ্মীরি (রহ.)-এর সম্মানে বায়েজিদ খান পন্নীর পুত্র সাঈদ খান পন্নী মসজিদটি নির্মাণ করেন। ‘আতিয়া মসজিদ’ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষণ তালিকাভুক্ত স্থাপনা।

আতিয়া মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, এর কুঁড়েঘরের কার্নিশের মতো ধনুক বক্রাকার কার্নিশ। বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সুলতানি ও মোগল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের সুসমন্বয় এখানে প্রাণময়।

‘পাগলা মসজিদ’ কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। মসজিদটিতে রয়েছে সুউচ্চ দৃষ্টিনন্দন মিনার। জনশ্রুতি রয়েছে, সহসা প্রমত্তা নরসুন্দার বুকে পানিতে ধ্যানরত এক ভাসমান দরবেশের আবির্ভাব হয়। তাঁর কল্যাণেই নদীর মধ্যে চর জেগে ওঠে। নদীর তীরবর্তী রাখুয়াইল গ্রামের এক গৃহস্থের গাভি নিয়মিত নদী সাঁতরিয়ে গিয়ে ওই দরবেশের পাত্রে ওলানের দুধ দিয়ে আসত। এতেই গাভির দরিদ্র মালিক ও স্থানীয় লোকজনের চরম বৈষয়িক উন্নতি হয়। এমন আরো অসংখ্য কেরামতিতে বিমুগ্ধ মানুষজন ওই দরবেশের খেদমতে হুজরাখানা তৈরি করে। দরবেশের মৃত্যুর পর তাঁর হুজরাখানার পাশেই পাগলা সাধকের স্মৃতিতে ‘পাগলা মসজিদ’ নির্মিত হয়। এ জনশ্রুতির ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আরেক জনশ্রুতি হলো, হয়বতনগরের প্রতিষ্ঠাতাদের পরিবারের এক নিঃসন্তান বেগমকে জনগণ ‘পাগলা বিবি’ বলে ডাকত। দেওয়ানবাড়ির এ বেগম নরসুন্দার তীরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে তিনি ‘পাগলা বিবি’ নামে পরিচিতি পান। দুই শতাব্দী প্রাচীন পাগলা মসজিদ। এ মসজিদের দান বাক্সে দৈনিক প্রায় লাখ টাকা জমা পড়ে। দান বাক্স খুললেই পাওয়া যায় স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী।

শোলাকিয়া ‘সাহেব বাড়ি’তে প্রতিষ্ঠিত মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে বিশ্বনন্দিত শোলাকিয়া ঈদগাহ। ১৭০০ শতাব্দীর শেষার্ধে বিশিষ্ট বুজুর্গ সুফি সৈয়দ আহমদ (রহ.) ১৮২৭ সাল/১২৪৮ হি. একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ঈশা খাঁর বংশধর জঙ্গলবাড়ী ও হয়বতনগরের জমিদাররা সুফি সৈয়দ আহমদ (রহ.)-কে পরম শ্রদ্ধা-সম্মানের সঙ্গে দেখতেন। ওই সময় ‘সৈয়দ সাহেব’-এর বাড়ি বা সংলগ্ন ওই অঞ্চলেই কোনো মসজিদ ছিল না। সৈয়দ সাহেব ‘সাহেব বাড়ি’তে মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর নিজের ক্রয়কৃত তালুকি সম্পত্তিতে ঈদগাহ স্থাপনের উদ্যোগ নেন।

‘শোলাকিয়া’ কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এখানে বর্তমানে সোয়া লাখ নয়, বরং কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হয়। বিশিষ্ট বুজুর্গ সুফি সৈয়দ আহমদ (রহ.) প্রতিষ্ঠিত শোলাকিয়া ঈদগাহর মূল জমির পরিমাণ ৬.৬১ বা প্রায় সাত একর। কাতারসংখ্যা ২৬৫ বা প্রায় ৩০০। প্রতি কাতারে মুসল্লি দাঁড়ায় ৫০০ জন।

বৃহত্তর ময়মনসিংহে মসজিদকেন্দ্রিক লোকবিশ্বাস তাওহিদ, রিসালাতের প্রেরণায় মানুষকে ইবাদতমুখী চেতনা দান করে। এমনই অনেক মসজিদের অন্যতম হলো কিশোরগঞ্জের শহীদি মসজিদ, কুতুবশাহ মসজিদ, নেত্রকোনার শাহ সুলতান মসজিদ, টাঙ্গাইলের খামারপাড়া মসজিদ, গোপালপুরের ২০১ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, বেলুয়া খানবাড়ি মসজিদ, জামালপুরের শাহ জামাল মসজিদ, মেলান্দহ মালঞ্চ মসজিদ, শেরপুরের বারদুয়ারি মসজিদ ও মায়া সাহেবার মসজিদ। ৮৬ বছরে কখনো কোরআন তিলাওয়াত বন্ধ হয়নি ধনবাড়ী নবাব প্যালেস মসজিদে। আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য গফরগাঁওয়ের তেরশ্রী জামে মসজিদ। এ ছাড়া ময়মনসিংহ মহানগরীর উপকণ্ঠে চরখরিচায় গড়ে উঠছে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক স্বয়ংক্রিয় গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ।

শান্তি-সহাবস্থান, জান্নাতি পরিতৃপ্তির স্থাপত্য নিদর্শন আল্লাহর ঘর মসজিদগুলো টিকে থাকবে অনন্তকাল। এ ক্ষেত্রে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ঐতিহ্যের বিজয় কেতন উড়িয়ে তাওহিদের বার্তা শোনায় বরাবর।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ গাজীপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা