kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

যেভাবে খোদাদ্রোহী নমরুদের পতন হয়

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেভাবে খোদাদ্রোহী নমরুদের পতন হয়

১৮৫৩ সালে অস্টেন হেনরি ও জেমস ফার্গুসনের কল্পনায় আঁকা নমরুদের প্রাসাদ। ছবি : সংগৃহীত

নমরুদ ইবরাহিম (আ.)-এর সময়ে পৃথিবীর বাদশাহ ছিল। সে ছিল পৃথিবীর চারজন বড় বড় শাসকের অন্যতম। নমরুদ প্রায় ৪০০ বছর রাজত্ব করেছে। পবিত্র কোরআনে তার সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে সে-ই সর্বপ্রথম রাজমুকুট পরিধান করেছে এবং নিজেকে খোদা দাবি করেছে।

ইতিহাসবিদ ইবনে আসিরের বর্ণনা মতে, নমরুদের বংশপরম্পরা  এমন : নমরুদ বিন কিনআন বিন কুশ বিন হাম বিন নূহ (আ.)।

নমরুদ শব্দটির উৎপত্তি মূলত ‘নমর ও উদ’ বা ‘নমরা ও উদু’ শব্দ দুটি থেকে, যার অর্থ হচ্ছে জাজ্বল্যমান আলো। কারো কারো মতে, আবার এ নামের অর্থ বিদ্রোহী, অর্থাৎ খোদার বিরুদ্ধে দ্রোহিতার কারণে তাকে এ নামে ডাকা হতো। এর আরো একটি অর্থ হলো বাঘিনী। আরবের কিংবদন্তি অনুযায়ী নমরুদকে বাল্যকালে এক বাঘিনী স্তন্য পান করিয়েছিল। ইতিহাসবিদরা নমরুদকে আল-জব্বার বা চরম স্বেচ্ছাচারী হিসেবে বিবেচনা করে। যার স্বেচ্ছাচারিতা তার শক্তি, ক্ষমতা ও দম্ভের প্রকাশভঙ্গি ছিল।

বাইবেল অনুসারে নমরুদ ছিল ‘এক মহাশক্তিধর ব্যক্তি, যে ঈশ্বরকে শিকার করতে চেয়েছিল।’

 

রাজাদের রাজা নমরুদ

নূহ (আ.)-এর মৃত্যুর পরের বছর মিসরে ৪২টি রাজ্যের রাজ্যপতিদের একটি সম্মেলন হয়, যেখানে নমরুদ রাজার রাজা (কিং অব কিংস) উপাধিতে ভূষিত হয়। এই খ্যাতি ও সম্মানের শিখরে পৌঁছে তার মানসিকতার পরিবর্তন আসে এবং নিজেকে দেবতা বলে দাবি করে এবং তার প্রার্থনা করার আদেশ দেয়, আর তখন থেকেই প্রজারা তাকে উপাস্যরূপে তার পূজা ও অর্চনা শুরু করে।

হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ

হজরত ইবরাহিম (আ.) ১০ বছর সবার আড়ালে এক গুহায় বসবাস করতেন। হয়তো নির্জনে বসবাস করার জন্য বাল্যকাল থেকেই হজরত ইবরাহিম (আ.) প্রকৃতি এবং স্রষ্টাকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। অবশেষে তিনি আসল স্রষ্টাকে চিনতে পারেন। আর তাই তাঁর গোত্রের লোকদেরকে দেব-দেবীর অসারত্ব দেখিয়ে দিতে সেসব মূর্তি ভেঙে দেন এবং বলেন যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না, তারা তোমাদের কিভাবে রক্ষা করবে।

এর ফলে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে বন্দি করা হয় এবং নমরুদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘হে ইবরাহিম, তোমার রব কে?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘যিনি এক, যাঁর কোনো শরিক নেই, যিনি আরশের অধিপতি।’

নমরুদ রেগে গিয়ে তার লোকদের বলল, ‘ওকে পুড়িয়ে ফেলো; সাহায্য করো তোমার দেবতাদের, যদি একান্তই তাদের জন্য কিছু করতে চাও।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৬৮)

নমরুদ বলল, ‘একটি অগ্নিকুণ্ড তৈরি করো; আর হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দাও। আর পাহারা দাও যেন তাঁর কোনো সাহায্যকারী তাঁকে সাহায্য করতে না আসে।’

লোকেরা এক জায়গায় লাকড়ি জোগাড় করে সেগুলোতে তেল ও ঘি ঢেলে তাতে অগ্নিসংযোগ করল। সাত দিন পর পূর্ণ অগ্নিকুণ্ড তৈরি হলো, কিন্তু সমস্যা হলো হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য কেউ আগুনের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারছিল না। এ সময় ইবলিস পর্যটকের বেশে সেখানে পৌঁছে চড়কগাছ তৈরির পরামর্শ দিল। তার পরামর্শে একটা চড়কগাছ তৈরি করা হয়। এবং তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়।

মহান আল্লাহ আগুনকে নির্দেশ দেন—‘হে অগ্নি, তুমি হজরত ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৬৯)

হজরত ইবরাহিম (আ.) ৪০ দিন পর্যন্ত অগ্নিকুণ্ডে ছিলেন। আল্লাহর হুকুমে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় অগ্নিকুণ্ড থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

 

আল্লাহকে হত্যার ব্যর্থ প্রয়াস

মহান আল্লাহকে হত্যার উদ্দেশ্যে নমরুদ ও তার সেনাপতি প্রস্তুত হয়ে সিন্দুকে আরোহণ করে ঊর্ধ্বপানে উড়ে চলল। ঊর্ধ্ব আকাশে যখন পৌঁছাল, অর্থাৎ যেখান থেকে আকাশ বা পৃথিবীর কিছুই আর দেখা যায় না। এরপর নমরুদ তীর নিক্ষেপ করার প্রস্তুত নিল। তারপর একের পর এক তারা তীর ওপরের দিকে নিক্ষেপ করল। সে সময় মহান আল্লাহ হজরত জিবরাইল (আ.)-কে বলেন, ‘আমার এই বান্দা যেন নিরাশ না হয়।’

মহান আল্লাহর কথা শুনে হজরত জিবরাইল (আ.) তীরের মাথায় রক্ত লাগিয়ে তা ফেরত পাঠাল, যাতে নমরুদ বুঝতে পারে যে সে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর খোদাকে ‘হত্যা’ করতে পেরেছে। তীর নিক্ষেপ শেষ হলে নমরুদ পৃথিবীর বুকে ফিরে আসে।

মাটিতে অবতরণ করার পর নমরুদের রক্ষীরা নিক্ষিপ্ত তীরগুলো কুড়িয়ে নিয়ে এলো। যেগুলো পাওয়া গেল তার সবই ছিল রক্তরঞ্জিত। নমরুদ রক্তমাখা তীরগুলো দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলে উঠল, ‘নিশ্চয়ই আমরা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর খোদা এবং স্বর্গের বাসিন্দাদের হত্যা করতে সমর্থ হয়েছি এবং তার সাক্ষ্য বহন করে তীরে লেগে থাকা রক্তই।’

 

নমরুদের ভয়ংকর মৃত্যু

নমরুদ আল্লাহর বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিল। হজরত ইবরাহিম (আ.) দূরে আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন। দূরে কালো রঙের একটা মেঘ দেখা যাচ্ছিল, যখন সেটা কাছে চলে এলো, লাখ লাখ মশার গুনগুন শব্দে ময়দান মুখরিত হলো। কিন্তু নমরুদ অবজ্ঞার সুরে বলল, এ তো মশা! তুচ্ছ প্রাণী, তা-ও আবার নিরস্ত্র। এ সময়ের মধ্যে প্রত্যেক সৈন্যের মাথার ওপর মশা অবস্থান নিল। অতঃপর তাদের বুঝে ওঠার আগেই মশাগুলো তাদের নাক দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করল। তারপর দংশন করা শুরু করল। সৈন্যদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তীরন্দাজরা ঊর্ধ্বে তীর নিক্ষেপ আর পদাতিক সেনারা নিজেদের চারপাশে অন্ধের মতো তরবারি চালাল, যার ফলে একে অপরকে নিজেদের অজান্তেই আহত বা নিহত করে ফেলল।

মশার সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে নমরুদ পালিয়ে প্রাসাদে চলে এলো। এ সময় একটি দুর্বল লেংড়া মশা তাকে তাড়া করল এবং কিছুক্ষণ মাথার চারপাশে ঘুরে নাসিকাপথে মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ল। এরপর মগজে দংশন করা শুরু করল। নমরুদ যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উন্মাদের মতো প্রাসাদে প্রবেশ করল এবং যন্ত্রণায় দিশাহারা হয়ে পাদুকা খুলে নিজের মাথায় আঘাত করতে শুরু করল। অবশেষে মাথায় মৃদু আঘাত করার জন্য একজন সার্বক্ষণিক কর্মচারী নিযুক্ত করল নমরুদ।

সুদীর্ঘ ৪০ বছর তাকে এই দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল। অবশেষে মাথার আঘাতের ব্যথায় নমরুদের মৃত্যু হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির, পৃষ্ঠা. ৬৮৬)

নমরুদকে নিয়ে আরবি ভাষায় একটি বই রয়েছে। সেখানে তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। বইটির নাম ‘আল-মালিকুন নামরুদ : আওয়ালু জাবাবারাতিল আরদ্বি অর্থাৎ বাদশাহ নমরুদ, যিনি পৃথিবীর প্রথম স্বৈরশাসক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা