kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নওমুসলিমের কথা

আমি একজন নতুন মুসলিম এখনো শিখছি

—বেন বার্ড

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমি একজন নতুন মুসলিম এখনো শিখছি

বেন বার্ড একজন ফুটবলপ্রেমী ব্রিটিশ যুবক। একসময় ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিডল স্টার্ন স্টাডিজ’ পড়ার সময় মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে তাঁর ভুল ভাঙে। ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন এই যুবক এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে লিভারপুলের ফরোয়ার্ড মোহামেদ সালাহ তাঁকে অনুপ্রাণিত করেন

আমি নটিংহ্যাম ফরেস্টের একজন সমর্থক। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং তার ঘোষণা দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে ফুটবল তারকা মোহামেদ সালাহ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি, সে জন্য কৃতজ্ঞ। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, হাত মেলাতে এবং তাঁকে ‘শুকরান’ (ধন্যবাদ) বলতে আমার ভালো লাগে। আমি মনে করি না, আমার সহকর্মীরা বিশ্বাস করে যে আমি মুসলিম হয়েছি। কারণ, ইসলাম গ্রহণের পর আমার আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। শুধু ইসলাম আমাকে যা দিয়েছে, তা সংযুক্ত হয়েছে। সালাহর কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি। এখন আমার হৃদয় বলছে, আমি ভালো আছি।

আমি এটা ভেবে বিব্রত বোধ করি যে ইসলাম, ইসলামী সংস্কৃতি ও মুসলমানের ব্যাপারে আমার ধারণা ছিল, তারা পশ্চাৎপদ। তারা এমন একটি বিভক্ত জাতি, যারা সময়কে ধারণ করতে পারেনি। ঘরের ভেতর হাতি দেখার মতোই আমি মুসলিমদের ঘৃণার চোখে দেখতাম। যখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিলাম, আমি এমন একজনকে খুঁজছিলাম, যাকে আমার দুর্ভাগ্যের জন্য দোষারোপ করা যায়। তখনই মুসলিমরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এলো। ডানপন্থী গণমাধ্যমে আমার পছন্দনীয় (মুসলিমবিদ্বেষ) বিষয়গুলো প্রচার হতে লাগল। ফলে ইসলাম সম্পর্কে আমার ভীতিকর সব চিন্তা মাথায় এলো। অথচ তখনো আমি কোনো মুসলিমকে চিনি না। অবশেষে লিডস ইউনিভার্সিটিতে ‘মিডল স্টার্ন স্টাডিজ’ ডিগ্রি গ্রহণের সময় সব কিছু বদলে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের একটি ‘গবেষণা প্রকল্প’ সম্পন্ন করতে হয়েছিল। আমি চেয়েছিলাম ভিন্ন কিছু করব। মনে আছে, আমার পরামর্শক শিক্ষক আমাকে বলেন, ‘মোহামেদ সালাহর গানটির ব্যাপারে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি কী?’ তাঁর গানের বিষয়ে আমি সচেতন ছিলাম। গানটি চমৎকার, তবে আমি তাঁকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিনি। ভেবে-চিন্তে আমি গবেষণার জন্য যে প্রশ্নটি চূড়ান্ত করি তা হলো, মোহামেদ সালাহ আল্লাহর একটি দান। তাঁর অবস্থান ও ভূমিকা কি ইসলামভীতির বিরুদ্ধে কাজ করছে, যা উসকে দিচ্ছে মিডিয়া ও রাজনীতিকরা? লিভারপুল সমর্থকদের জন্য ডজির জনপ্রিয় গান ‘গুড এনাফ’-এ একটি লাইন ছিল এমন, ‘যদি সে আরো কয়েকটি স্কোর করে, তবে আমিও মুসলিম হব।’ লাইনটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

আমি একজন সাধারণ শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি বিভিন্ন শহরে ঘুরেছি। নিয়মতান্ত্রিক একটি ছাত্রজীবন কাটিয়েছি। আমার ডিগ্রি প্রথমবার আমাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলাম জানার সুযোগ করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সৌদি আরবের অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে মেশার সুযোগ করে দেয়। আমার ধারণা ছিল, তারা ভয়ংকর মানুষ—সব সময় তরবারি বহন করে। প্রকৃতপক্ষে আমি এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে মিশেছি, তাদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে চমৎকার। আরবদের ব্যাপারে আমি যে ধারণা পোষণ করতাম, তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তবে মোহামেদ সালাহই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর জীবনযাপন ও কথাবার্তা আমাকে মুগ্ধ করে। কয়েক সপ্তাহ আগে একজন লিভারপুল ভক্তের সঙ্গে তাঁর একটি ছবি প্রকাশ করেন। যিনি তাঁর পিছু নেওয়ার কারণে নাকে আঘাত পেয়েছিলেন। এমন কাজ অন্যান্য ফুটবলারের দ্বারাও করা সম্ভব, তবে আপনি নিশ্চয়ই কাজটি সালাহর কাছে প্রত্যাশা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কয়েকজন মিসরীয় শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। যখন তারা বুঝতে পারল, আমি ‘মোহামেদ সালাহ আল্লাহর দান’ শিরোনামে গবেষণা করছি, যা লিভারপুলের আরেকটি গানে রয়েছে। তখন তারা কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে বোঝাল, তারা কী পরিমাণ খুশি হয়েছে এবং সালাহর জন্য তার দেশের জনগণ কী কী করেছে। গত বছর সালাহকে নির্বাচিত করার জন্য এক মিলিয়ন মিসরীয় ভোট দেয়। আমি একজন মিসরীয়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সালাহর প্রতি তারা কেন প্রীত? সালাহ ইসলামের পরিপূর্ণ অনুরাগী এ জন্য? সে উত্তর দেয়, তার বিশ্বাস সালাহ মুসলমানদের জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। তার এই বিশ্বাস আমার বিশ্বাসে অনুরণন সৃষ্টি করে। সালাহ যখন ভালো কিছু করেন, আমি ভাবি, তিনি তাঁর বিশ্বাসের জন্য করছেন। তিনি যখন চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করলেন, আমি বন্ধুদের বলি—এই জয় ছিল ইসলামের জন্য। সালাহ প্রতিটি গোল করার পর সেজদা দেন, যা সারা পৃথিবীতে ইসলামের একান্ত নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। প্রতি সপ্তাহে কত মানুষ প্রিমিয়ার লিগ দেখে? পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। সালাহ তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। তিনি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে একজন মহান খেলোয়াড়। তিনি আমাকে দেখিয়েছেন, সঠিক ধারার ইসলাম স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা নয়। ইসলাম মানুষকে আপন সত্তায় টিকিয়ে রাখে।

মানুষ যখন কোরআন বা ইসলাম সম্পর্কে পড়ে, তখন সে মিডিয়ায় প্রচারিত চিত্র থেকে ভিন্ন কিছু পায়। যা মিডিয়ায় আড়াল করা হয়। আমি একজন নতুন মুসলিম। আমি এখনো শিখছি। আমার জীবনপ্রণালী একটি পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যা খুব সহজ নয়। পুরনো ‘বেন’কে আমি কী বলব? আমি তার পিঠে চাপড় দিয়ে বলব, সত্যি বলতে কি—এমন একজন বিচিত্র মানুষ নিয়ে ভাবা কতই না দুরূহ। তোমার উচিত, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করা। মানুষকে প্রশ্ন করতে শুরু করা। আমরা কি একটি মিশ্র জাতিসত্তা, মিশ্র বিশ্বাস ও মিশ্র সংস্কৃতির সমাজে বাস করি না?

দ্য গার্ডিয়ান থেকে আতাউর রহমান খসরুর অনুবাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা