kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঈমান জাগানিয়া গল্প

আল্লাহর ফায়সালা অবধারিত

ড. আবদুর রহমান আল-আরেফি

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আল্লাহর ফায়সালা অবধারিত

উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। যিনি দ্বিনের জন্য সর্বদা কাজ করেছেন। বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভে জিহাদ করেছেন ও অগ্নিপূজারি সাম্রাজ্যের আগুন নিভিয়েছিলেন। ফলে কাফিররা তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে থাকে। আবু লুলু নামে পারস্যের এক অগ্নিপূজারি তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শত্রুতার আগুনে জ্বলছিল। সে ছিল এক গোলাম। মদিনায় ছুতার ও কামারের কাজ করত। গম পেষার জাঁতাকল তৈরিতে পারদর্শী ছিল সে। জাঁতাকল হলো প্রশস্ত দুটি পাথরের চাকা, যার একটি অন্যটির ওপর রাখা হয়। এ দুটির মাঝখানে রাখা হয় দানা। এরপর হাতের সাহায্যে তা ঘোরানো হয় এবং দানা চূর্ণ হয়। এই গোলাম উমর (রা.) থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ সন্ধান করছিল। একদিন পথে উমর (রা.)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি শুনেছি তুমি নাকি বলে থাকো যে আমি ইচ্ছা করলে এমন জাঁতাকল তৈরি করতে পারব, যা বাতাসের সাহায্যে ঘুরবে।

তখন সে চোয়াল শক্ত করে উমর (রা.)-এর দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আপনার জন্য এমন এক জাঁতাকল তৈরি করব, যা পূর্ব-পশ্চিমের লোকদের আলোচনার বিষয়বস্তু হবে।

উমর (রা.) তাঁর সঙ্গীকে বলেন, এই গোলাম আমাকে হুমকি দিয়ে গেল।

লোকটি গিয়ে দুই মাখাবিশিষ্ট একটি খঞ্জর তৈরি করল, যার হাতল হলো মধ্যখানে। সুতরাং সে যদি এক মাথা দিয়েও আঘাত করে, লক্ষ্য ভেদ করবে, যদি অন্য মাথা দিয়ে আঘাত করে, তথাপি লক্ষ্য ভেদ করবে। তদুপরি সে তা বিষের পাত্রে ভিজিয়ে রাখে। যাতে এর আঘাতে মারা না গেলেও বিষক্রিয়ায় মারা যায়। এরপর রাতের অন্ধকারে সে মসজিদে এসে ওত পেতে বসে থাকে। উমর (রা.) মসজিদে এলেন। যথারীতি কাতার সোজা করালেন। ইকামত হলো। উমর (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে তাকবিরে তাহরিমা বলে সালাত শুরু করেন। কেরাত শুরু করামাত্র আবু লুলু বেরিয়ে এলো। চোখের পলকে সে তাঁর শরীরে তিনটি আঘাত করল। যার একটি তাঁর বুকে, দ্বিতীয়টি তাঁর পাঁজরে এবং তৃতীয়টি তাঁর নাভির নিচে লাগল। উমর (রা.) চিৎকার দিয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়লেন। তখন তিনি বারবার এই আয়াত পড়ছিলেন—‘আর আল্লাহর ফায়সালা অবধারিত।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৮)

আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) সামনে গিয়ে সালাত শেষ করেন। এদিকে গোলাম তার ছুরি দিয়ে মুসল্লিদের কাতার চিরতে সামনের দিকে ছুটতে থাকল এবং ডান-বামের মুসলমানদের আঘাত করতে থাকল। এভাবে সে ১৩ জনকে আঘাত করে। যাদের সাতজনই মারা যায়। পরিশেষে খঞ্জর উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, যে-ই আমার কাছে আসবে, তাকেই আঘাত করব। তখন এক ব্যক্তি তার দিকে অগ্রসর হয়ে একটি মোটা চাদর নিক্ষেপ করল। আবু লুলু তাতে ঘায়েল হয়ে যায়। সে ধরা পড়ে যাচ্ছে এটা বুঝতে পেরে আত্মহত্যা করে।

উমর (রা.)-কে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকজন কাঁদতে কাঁদতে তাঁর পিছু নেয়। উমর (রা.) সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত অবচেতন রইলেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর তিনি আশপাশের লোকদের দিকে তাকিয়ে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন করেন, তা হলো, লোকেরা কি সালাত পড়ে ফেলেছে?

তারা বলল, জি।

তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া। যে ব্যক্তি সালাত ছেড়ে দেয়, সে মুসলমানই নয়।

এরপর তিনি পানি আনতে বলেন ও অজু করেন। তিনি সালাত পড়ার জন্য দাঁড়াতে চেষ্টা করেন; কিন্তু পারেননি। তিনি পুত্র আবদুল্লাহর হাত ধরে পেছনে বসালেন এবং তার দিকে হেলান দিয়ে বসলেন। এদিকে যখন থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলো, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমি তাঁর জখমে হাত রাখি, কিন্তু রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছিল না। তাই পাগড়ি দিয়ে তাঁর জখমের স্থান বেঁধে দিই। এরপর তিনি ফজরের সালাত আদায় করেন।

সালাতের পর বলেন, হে ইবনে আব্বাস! খোঁজ নিয়ে জানো তো, কে আমার ওপর আক্রমণ করেছে?

তিনি বলেন, অগ্নিপূজারি গোলাম আপনার ওপর আক্রমণ করেছে। আপনার সঙ্গে আরো একটি দলকে সে আঘাত করেছে, এরপর সেও আত্মহত্যা করেছে।

উমর (রা.) বলেন, সব প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমার শাহাদাত এমন কোনো ব্যক্তির হাতে রাখেননি, যে ইসলামের দাবিদার।

এরপর ডাক্তার আসে। ডাক্তার বুঝে ফেলল যে আঘাত তাঁর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। তিনি বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি অসিয়ত করুন। আমার ধারণা আজ-কালের মধ্যেই আপনি ইন্তেকাল করবেন।

উমর (রা.) বলেন, তুমি সত্য বলেছ। যদি অন্য কিছু বলতে, তাহলে আমি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি যদি সারা দুনিয়ার মালিক হতাম, তাহলে শুধু আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়াবহতা থেকে বাঁচার জন্য আমি তা মুক্তিপণ হিসেবে পেশ করতাম।

তখন ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আপনি এ কথা বলছেন কেন! আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। মহানবী (সা.) কি এই দোয়া করেননি যে আল্লাহ তাআলা যেন আপনার মাধ্যমে দ্বিন ও মুসলমানদের শক্তিশালী করেন, যখন মুসলমানরা ছিল মক্কায় আশঙ্কাজনক অবস্থায়; তখন আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আপনার ইসলাম গ্রহণ করা ছিল গৌরবের বিষয়। আপনি যখন হিজরত করেছেন, তখন আপনার হিজরত ছিল উন্মুক্ত হিজরত।

অতঃপর এমন কোনো রণাঙ্গন ছিল না, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত হয়েছেন, অথচ আপনি উপস্থিত ছিলেন না। এরপর তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন এমতাবস্থায় যে তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। এরপর খলিফা হলেন আবু বকর (রা.)। তিনিও দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, এমতাবস্থায় যে তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। তারপর আপনি সর্বোত্তমভাবে খলিফা নিযুক্ত হলেন। আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বহু নগরী স্থাপন করেছেন, আপনার মাধ্যমে মুসলমানদের দিকে সম্পদের প্রবাহ ঘটিয়েছেন এবং শত্রুদের বিতাড়িত করেছেন। পরিশেষে আল্লাহ আপনাকে শাহাদাতের সুমহান মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং এটা আপনার জন্য আনন্দের বিষয়।

উমর (রা.) বলেন, আমাকে বসিয়ে দাও। বসার পর ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলেন, তুমি কথাগুলো আবার বলো। ইবনে আব্বাস (রা.) উপরিউক্ত কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করার পর তিনি বলেন, নিশ্চয়ই প্রতারিত সে-ই, যে তোমাদের ধোঁকায় পড়বে। কিয়ামতের দিন তুমি কি আমার পক্ষে এ বিষয়ে আল্লাহর সামনে সাক্ষী দেবে?

ইবনে আব্বাস বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই দেব।

উমর (রা.) আনন্দিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহ! সব প্রশংসা আপনার জন্যই। এরপর জনগণ দলে দলে আসতে লাগল এবং তাঁকে বিদায় জানাতে লাগল।

 

(আরববিশ্বের প্রখ্যাত বক্তা ও লেখক ড. আবদুর রহমান আল-আরেফির লেখা থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা