kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মুমিনের হেমন্ত-ভাবনা

মোস্তফা কামাল গাজী   

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুমিনের হেমন্ত-ভাবনা

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ছয়টি ঋতুই ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত হয় আমাদের মাঝে। প্রতিটি ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজে চারপাশের প্রকৃতি। শরতের শুভ্রতা ছাপিয়ে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে শান্ত-কোমল হেমন্তকাল। কার্তিক-অগ্রহায়ণ এ দুই মাস হেমন্তকাল। এই সময় চারপাশে বিরাজ করে শুধু সজীবতার ছায়া। প্রকৃতি নতুনরূপে সাজতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ডালি নিয়ে সৌন্দর্যের মহড়া দেয় চারপাশের প্রকৃতি। কুহেলিবিন্দুর টুপটাপ ঝরে পড়ার ছন্দ আর মৃদু শীতলতা জানান দিয়ে যায় ঋতুর পালাবদলের খবর। প্রতিটি প্রাণে জেগে ওঠে চাঞ্চল্যের শিহরণ। নিষ্কলুষ, প্রাণবন্ত আর কুয়াশায় জড়ানো হেমন্তের ভোর বিমুগ্ধ করে প্রতিটি মন। সকালের প্রথম রোদের বর্ণচ্ছটায় গাছের পাতাগুলো যেন হেসে ওঠে। সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করে। ধানক্ষেতের আলপথে চলতে গেলে পা দুটো ভিজিয়ে দেয়। গ্রামের দূর-দূরান্ত পর্যন্ত হলদে ধানের শীষ হাতছানি দিয়ে ডেকে যায়। বিস্তৃত সোনালি ধানের মাঠ হেমন্তের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও রূপ। শরতে বেড়ে ওঠা কচি আমন-আউশ ধান হেমন্তে পেকে সোনালি রূপ ধারণ করে। কৃষকের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ধান কাটার ধুম পড়ে মাঠে মাঠে। ক্ষেতে বেগুন, মুলা, ফুলকপিসহ নানা ধরনের সবজির সমারোহ ঘটে। এগুলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি অসামান্য নিয়ামত। এসব নিয়ামতের মধ্যে মুমিন ব্যক্তি কুদরত দেখতে পায়। এসব থেকে পরকালের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালার ভার স্থাপন করেছি এবং তাতে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উদ্গত করেছি। এটা জ্ঞান আহরণ ও স্মরণ করার মতো ব্যাপার—প্রত্যেক অনুরাগী বান্দার জন্য। আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা বাগান ও শস্য উদ্গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয় এবং লম্বমান খর্জূর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জূর, বান্দার জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ৬-১১)

আল্লাহর এই রিজিক ঘরে তুলতে কুয়াশাভেজা ভোরেই কৃষকরা কাজে নেমে পড়ে। তাদের হাত-পা আর কাস্তের স্পর্শে জেগে ওঠে সোনালি ধানের শীষ। খুব ভোরে কিষানিরা ঢেঁকিতে চাল ভানার কাজ শুরু করে দেয়। এর পরই শুরু হয় বাংলার ঐতিহ্যের নবান্ন উৎসব।

একসময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্তকাল দিয়ে। সম্রাট আকবর বাংলা পঞ্জিকা তৈরির সময় অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

হেমন্তে চোখ-জুড়ানো মন-মাতানো বাহারি ফুলের সৌন্দর্যে সাজে অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতি। ফুলের সৌরভে সুরভিত হয়ে ওঠে চারপাশ। গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, শাপলা, পদ্ম, কামিনী, হিমঝুরিসহ নাম-না-জানা হরেক রকম ফুল এই ঋতুতে ফোটে। খালবিল, নদীনালা আর বিলজুড়ে দেখা যায় সাদা-লাল শাপলা আর পদ্মফুলের মেলা। হলুদ সরষে ফুলে ভরে ওঠে ডাঙার ক্ষেতগুলো। দেখলে মনে হয় যেন নিপুণ হাতের আঁচড়ে গড়ে ওঠা কোনো হলদে ক্যানভাস।

হেমন্তের ব্যস্ত দুপুরে মাঠ থেকে সোনালি ফসল ঘরে আনার দৃশ্য, ছোট ছেলে-মেয়েদের মেতে ওঠা ডাংগুলি, গোল্লাছুট আর বউছি খেলা, শেষ বিকেলের রাঙানো শিল্পিত দৃশ্য দাগ কেটে যায় কবিদের মনে। তাইতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে আজকের অনেক কবিও এই হেমন্তকে নিয়ে লিখেছেন এবং লিখে যাচ্ছেন।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় হেমন্তের শিশিরভেজা হিমেল বাতাসের অনুভূতি আর সকালের কাঁচা রোদের উষ্ণ পরশের কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘হেমন্তের ঐ শিশির নাওয়া হিমেল হাওয়া, সেই নাচনে উঠল মেতে/টইটম্বুর ঝিলের জলে/ফাটা রোদের মানিক জ্বলে/চন্দ্র ঘুমায় গগন তলে/সাদা মেঘের আঁচল পেতে।’

হেমন্তের শেষের দিকে বেশ শীত পড়ে। রাত হয় অনেক দীর্ঘ। শেষরাতের দিকে আল্লাহপ্রেমীদের ঘুম ভেঙে যায়। তাহাজ্জুদের জন্য জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যান তাঁরা। গ্রীষ্মকালে রাত ছোট থাকায় অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন না। হেমন্তে রাত দীর্ঘ হতে শুরু করায় তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সুযোগ এটি। যাঁরা নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করেন, কোরআন তাঁদের মুত্তাকি বলে অভিহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুত্তাকিরা বাগ-বাগিচায় এবং ঝরনার আনন্দ উপভোগ করতে থাকবে এবং যে নিয়ামত তাদের পরোয়ারদিগার তাদের দিতে থাকবেন, সেগুলো তারা গ্রহণ করবে। নিঃসন্দেহে তারা এর আগে (দুনিয়ার জীবনে) বড় পুণ্যবান ছিল। তারা রাতের খুব অল্প অংশেই ঘুমাত এবং শেষরাতে ইস্তেগফার করত।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৫-১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘রাতের শেষ সময়ে মহান আল্লাহ দুনিয়ার দিকে অবতীর্ণ হন এবং বলেন, ডাকার জন্য কেউ আছে কি, যার ডাক আমি শুনব; চাওয়ার জন্য কেউ আছে কি, যাকে আমি দেব; গুনাহ মাফ চাওয়ার কেউ আছে কি, যার গুনাহ আমি মাফ করব?’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩২৮)

যেভাবে হৈমন্তী ছোঁয়ায় সজীব হয়ে ওঠে গ্রামবাংলা, তেমনি ঈমানদারের তনু-মন পুলকিত হয় ইবাদত ও স্রষ্টার স্মরণে।

লেখক : শিক্ষক

জামিয়াতু ইলয়াস আল ইসলামিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা