kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চিকিৎসক থেকে ইসলাম প্রচারক

আমেরিকায় ইসলামভীতি দূর করতে একজন নিনোভির সংগ্রাম

আবরার আবদুল্লাহ   

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমেরিকায় ইসলামভীতি দূর করতে একজন নিনোভির সংগ্রাম

কোনো এক সকালে আমরা ১১ সেপ্টেম্বরের কথা স্মরণ করছিলাম। মুহাম্মদ আন-নিনোভি তখন সবেমাত্র ইলিনিয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করে জর্জিয়া গুইনেক কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছেন। টেলিভিশনের পর্দায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দৃশ্য দেখার পর তিনি প্রচণ্ড রকম ধাক্কা খেলেন। জীবনে প্রথমবার তাঁর মনে নিজের ধর্ম-বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন উঠল। ইসলামের যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি বড় হয়েছেন, তার সঙ্গে টিভিতে দেখানো দৃশ্যের কোনো মিল নেই। নিনোভি বলেন, ‘আমি কল্পনা করতে পারছিলাম না, যে ধর্মের ভিত্তি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও মমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত তার ওপর সন্ত্রাসবাদের দায় চাপানো হবে।’

নিনোভি মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন না। তখন তাঁর বয়স ৩০ বছর এবং তিনি একজন চিকিৎসক। নিনোভি জানতেন, মানুষ লোভ, হিংসা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হয়। তারা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। নিজেদের বক্তব্যে ধর্মের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে ভুলভাবে। তবু নিনোভি তাঁর মন ও চিন্তা থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়টি সরাতে পারছিলেন না। তাঁর ভয় হচ্ছিল, টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে যে আগুন জ্বলছে তা তাঁর পাড়ার মসজিদেও জ্বলতে পারে। নিনোভি ভাবলেন, মানুষের ক্ষোভ ও ভুল ধারণা দূর করতে তাঁকে কিছু করতে হবে। একজন চিকিৎসক হিসেবে সম্ভাবনাময় একটি জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে নেমে পড়লেন ইসলাম ও মুসলমানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার মিশনে। যাত্রা শুরু করলেন দেশের দূর-দূরান্তে। ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে এবং ধর্মের প্রতি, বিশেষত ইসলামের প্রতি মানুষের ভুল ধারণা ভেঙে দিতে শুরু হলো তাঁর নতুন জীবন।

১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আমেরিকার মুসলিমরা মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ে। সন্ত্রাসী হামলার জন্য মার্কিন মুসলিমদেরও দোষারোপ করা হচ্ছিল, অথচ এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না; বরং এই ষড়যন্ত্রের জন্য তারা সংকোচ বোধ করছিল। নিনোভি জানতেন, মার্কিন সমাজের বহু মানুষ মনে করে, ধর্ম দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীতে সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ইসলাম শুধু মানুষের জীবন ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে চায়। সন্ত্রাসের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এই সত্য বোঝার জন্য প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা। আর তা মানুষের সামনে তুলে ধরতে ২০০১ সালে সেই বেদনাদায়ক সকালের পর থেকে প্রতিদিন তিনি কর্মশালা, সেমিনার, ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসবিষয়ক সেমিনার করে আসছেন। যেন মানুষ বুঝতে পারে ইসলাম প্রেম ও নিঃশর্ত সমবেদনার ধর্ম।

২০১৩ সালে নিনোভি ‘দ্য মদিনা ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন। যার অধীনে একটি মসজিদ, একটি সাংস্কৃতিক সেন্টার, একটি সেমিনার হাউস ও একটি স্কুল পরিচালিত হয়। তাঁর ইনস্টিটিউটের প্রধান লক্ষ্য পরবর্তী প্রজন্মকে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির দীক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা। ছয় বছর আগে দুলুথে একটি ক্ষুদ্র ও একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করার পরে এখন তা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে উন্নীত হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরকানাস ও মিলওয়াকি থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এই নেটওয়ার্ক আরো ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নিনোভির। এটাকে এখন একটি আন্দোলনও বলা যেতে পারে। যা মুসলিমদের দৃষ্টি রাজনীতি থেকে আধ্যাত্মিকতার দিয়ে ফেরানোর চেষ্টা করছে। মানবিকতা, মনুষ্যত্ব, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা তাদের মূল স্লোগান।

দীর্ঘ এই আন্দোলনের পর মুহাম্মদ নিনোভির অভিমত হলো, এখনো সমাজে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আমেরিকায় ‘হেইট ক্রাইম’ বেড়েছে বহুগুণ। ১১ সেপ্টেম্বরের পর বর্তমানে মুসলমানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকদের দাবি, দেশে (আমেরিকা) ও বিদেশে মার্কিন স্বার্থে ‘সন্ত্রাসী’ হামলা ও বিভেদমূলক প্রচারণা মার্কিন সমাজে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিবরণ তথ্যানুযায়ী শুধু ২০১৫ সালের শুরুভাগে আমেরিকান মুসলিমদের ওপর শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে মসজিদে অগ্নিসংযোগ, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতকরণ, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী হুমকি। এমনকি এফবিআইয়ের ‘হেইট ক্রাইম’ বিষয়ক সাম্প্রতিক জরিপে অবস্থাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলছেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এই পর্যন্ত ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’-এর পরিমাণ ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। আরব বংশোদ্ভূতদের ওপর হামলার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

জরিপের এই ফলাফলের পরও থেমে যেতে রাজি নন মুহাম্মদ আন-নিনোভি। তিনি ‘সম্প্রীতি ও ভালোবাসা’র বাণী প্রচার করে যেতে দৃঢ়প্রত্যয়ী। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সঠিক শিক্ষা প্রচারের মাধ্যমেই ইসলামের ব্যাপারে ভুল বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া সম্ভব। আমরা চেষ্টা করছি, মানুষ যেন তার স্রষ্টাকে এবং মানুষকে ভালোবাসতে শেখে।’

এজেসি ডটকম অবলম্বনে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা