kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

ইতিহাস

কোথায় ছিল নুহ (আ.)-এর ঘরবসতি

আতাউর রহমান খসরু   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কোথায় ছিল নুহ (আ.)-এর ঘরবসতি

যে কয়েকটি মহাবৈপ্লবিক ঘটনা মানব ইতিহাসের গতিধারা পাল্টে দিয়েছিল, নুহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবন এর অন্যতম। এই ঘটনা ছিল মানবজাতির জন্য একটি দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা। যা পৃথিবীতে এক নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। আল কোরআনের একাধিক স্থানে নুহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনের বর্ণনা এসেছে। পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থেও গুরুত্বের সঙ্গে নুহ (আ.) মহাপ্লাবনের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। কোরআনের বর্ণনা মতে, নুহ (আ.)-এর জাতি আল্লাহ ও তাঁর নবীর প্রতি সীমাহীন ঔদ্ধত্য প্রকাশ করায় আল্লাহ তাদের সমূলে ধ্বংস করেন। তার আগে তিনি নুহ (আ.)-কে প্রকাণ্ড এক নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন। নুহ (আ.)-এর জাতি নৌকা তৈরিসহ মুমিনদের প্রস্তুতি দেখে হাসাহাসি করে এবং তাতে বাধা প্রদানের চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ অবাধ্যদের ডুবিয়ে হত্যা করেন এবং মুমিনদের রক্ষা করেন। মুমিনদের সঙ্গে পশু-পাখিদেরও আল্লাহ রক্ষা করেন। অবিশ্বাসীদের দলভুক্ত হওয়ায় নুহ (আ.)-এর এক সন্তানও মহাপ্লাবনে মারা যায়।

নুহ (আ.) ও তাঁর জাতি

আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের ভেতর প্রথম রাসুল নুহ (আ.)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সর্বপ্রথম শরিয়ত দান করেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, কেয়ামতে দিশাহারা মানুষ নুহ (আ.)-কে বলবে, আপনি পৃথিবীতে প্রেরিত প্রথম রাসুল। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪৩১২)

আবু উমামা (রা.)-এর বর্ণনা মতে, আদম (আ.)-এর আগমনের এক হাজার বছর পর নুহ (আ.)-এর আগমন হয়। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ১৪/৪০)। ঐতিহাসিকদের মতে, নুহ (আ.)-এর জাতির নাম ছিল রাসিব। তারাই পৃথিবীতে প্রথম শিরক ও মূর্তিপূজার প্রচলন করে। আধুনিক যুগের ইতিহাস গবেষকদের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব দুই থেকে চার হাজার বছর আগে নুহ (আ.)-এর আগমন হয়।

কোথায় ছিল নুহ (আ.)-এর বসতি

নুহ (আ.)-এর জাতি ঠিক কোন স্থানে বসবাস করত সে ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে কোরআনের একটি আয়াত থেকে ধারণা পাওয়া যায়, নুহ (আ.)-এর জাতি বর্তমান ইরাকের মসুলের নিকটবর্তী কোনো এলাকায় বসবাস করত। পবিত্র কোরআনের সে আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলা হলো, হে জমিন তোমার পানি চুষে নাও, হে আসমান তুমি ক্ষান্ত হও। পানি (প্রচণ্ড ঢেউ) প্রশমিত হলো। আল্লাহর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো। নৌকা জুদি পর্বতে স্থির হলো। বলা হলো, অত্যাচারী সম্প্রদায় কতই না দূরে।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪০)

জুদি পর্বতের তুর্কি নাম কুদি বা কুর্দি। ইরাক, ইরান, তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই পর্বতমালা। সেই হিসাবে কোরআনের ব্যাখ্যাকার ও বেশির ভাগ ঐতিহাসিকের মত নুহ (আ.)-এর জাতি উত্তর ইরাকে বসবাস করত। যার বর্তমান নাম মসুল। তবে আধুনিক যুগের কোনো ঐতিহাসিকের দাবি, নুহ (আ.)-এর জাতি তুরস্কে বসবাস করত। কেননা তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নুহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার দাবি করছে দেশটি। ব্যাবিলনের প্রাচীন নিদর্শনাবলিতে বাইবেলপূর্ব যেসব প্রাচীন শিলালিপি ও প্রস্তরফলক পাওয়া গেছে, সেসব থেকেও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। বলা হয়, ইরাকের মসুল নগরীর আশপাশেই তাদের আবাসস্থল ছিল। মসুলের উত্তরে ইবনে ওমর (রা.) দ্বীপের আশপাশে ও আর্মেনিয়া সীমান্তে অবস্থিত আরারাত পর্বতের ধারে নুহ (আ.)-এর বিভিন্ন নিদর্শন এখনো চিহ্নিত করা হয়। নখচিওয়ানের অধিবাসীদের মধ্যে আজও এ কথা প্রচলিত আছে যে এ শহরের ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন নুহ (আ.)। (সিরাতে সরওয়ারে আলম)

নুহ (আ.)-এর জাতির পরিণতি

আল্লাহ অবাধ্যতায় নিমজ্জিত এই জাতিকে আল্লাহ সমূলে ধ্বংস করেন। তাদের পরিণতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি নুহকে তার জাতির নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে ৫০ বছরের কম এক হাজার বছর অবস্থান করে। অতঃপর মহাপ্লাবন তাদের গ্রাস করে; কারণ, তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ১৪)

এই মহাপ্লাবনের পর অবশিষ্ট মুমিনদের মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুন সভ্যতার সূচনা হয়। আল্লাহ তাআলা এই সম্পর্কে বলেন, ‘নুহ আমাকে আহ্বান করেছিল। আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী। তাকে ও তার পরিবারবর্গকে আমি উদ্ধার করেছিলাম মহা সংকট থেকে। তার বংশধরদের আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশপরম্পরায়। আমি তা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি।’ (সুরা : সাফ্ফাত, আয়াত : ৭৫-৭৮)

পবিত্র কোরআনে নুহ (আ.) ছাড়া একাধিক নবী (আ.) ও তাঁদের জাতির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এসব ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্যও আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নবীদের সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো আমি এ জন্য বর্ণনা করছি, যেন তার মাধ্যমে আমি আপনার হৃদয়কে দৃঢ় করতে পারি। এতে আপনার কাছে সত্য স্পষ্ট হয়েছে। আর মুমিনদের জন্য তাতে রয়েছে উপদেশ ও আমার স্মরণ।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১২০)

আল্লাহ তাআলা আমাদের উপদেশ গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা