kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

কাফন-দাফনে মৃত মানুষের সম্মান

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কাফন-দাফনে মৃত মানুষের সম্মান

এমন অনেক বিষয় আছে, যেসব কারণে মানুষ অন্য সৃষ্ট জীবের চেয়ে আলাদা। যেমন—গঠনাকৃতি, সম্মান ও মর্যাদা। আর বিবেক-বুদ্ধি তো এমন একটি বিষয়, যার সমতুল্য আর কিছুই নেই। এই বিবেকই একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। পক্ষান্তরে অবিবেচক ও বিবেকহীনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে একজন মানবরূপীও পশুর কাতারে শামিল হয়ে যায়। বিবেক-বুদ্ধির কারণেই মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আদম সন্তানকে দেওয়া এ মর্যাদা তাদের জীবিত অবস্থায় যেমন রয়েছে, মৃত্যুর পরও এ মর্যাদা তার প্রাপ্য। তাই ইসলাম যেভাবে জীবিত মানুষকে সম্মান করতে বলেছে, একইভাবে মৃত ব্যক্তির সঙ্গেও মর্যাদাহানিকর কোনো আচরণ প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের মৃতদের দোষ-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা কোরো না। বরং তাদের ভালো বিষয়গুলো আলোচনা করো।’ (তিরমিজি : ৩/২৩৮)

মৃত মানুষদের মর্যাদা রক্ষায় ইসলাম যেসব পন্থা অবলম্বন করতে বলেছে, তার অন্যতম হলো কাফন-দাফন।

কাফন-দাফনের মাধ্যমেই মৃত মানুষের সম্মান যথাযথভাবে রক্ষা করা যায়।

সাধারণত মুসলমানদের লাশ কোনো হাসপাতালে দেওয়া হয় না। তাদের আগুনে পুড়ে ফেলা হয় না। কিংবা পুঁতে রাখা হয় না। বা বিশেষ অবস্থা ছাড়া কবরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় না। বরং মুসলমানদের লাশ সসম্মানে কবরস্থ করা হয়। এর কারণ হলো—

১. কবরে দাফন করার দ্বারা মৃত ব্যক্তিকে আবৃত করা হয়, আর জীবিতদের পক্ষে এটা কোনো কঠিন কাজ নয়। পানি ও বাতাসে মৃত ব্যক্তিকে রাখা হলে চোখ ও নাকের কষ্ট হবে। অর্থাৎ দুর্গন্ধের কারণে নাক দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যাবে আর চোখের আকৃতি দেখে ঘৃণা সৃষ্টি হবে। আগুনে জ্বালালে কিছুদিন পর্যন্ত তো দুর্গন্ধ আসে না এবং ঘৃণা সৃষ্টি হয় না; কিন্তু জ্বালানোর সময়ের ভয়ানক চিত্র প্রজ্বলনকারী ও আশপাশে অবস্থানকারীদের কাছে ভীতিকর হয়ে ওঠে। এরপর বাতাস নষ্ট হওয়ার কারণে পানি নষ্ট হওয়া এবং রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মানবসৃষ্টির মূলধাতু নষ্ট হওয়ার যে ক্ষতি তা তো রয়েছেই। কিন্তু দাফন করার ক্ষেত্রে এ ক্ষতিগুলো পরিলক্ষিত হয় না। বরং দেহের জোড়াগুলো খুলে যাওয়ার কারণে মৃতদেহের মূল চার ধাতু নিজ নিজ স্থানে পৌঁছে যায়। আর মাটি, পানি, বাতাস ও আগুন যে পরিমাণ ছিল, সে পরিমাণই সর্বদা থাকে।

২. কল্যাণকামী পিতা যখন সফরে বের হয়, তখন আদরের সন্তানকে মমতাময়ী মায়ের কাছে রেখে যায়— মায়ের সতিনের কাছে অর্পণ করে না। যদি বিষয়টা এমনই হয়, তখন উপযোগী হলো মাটির দেহকে মাটির মধ্যে অর্পণ করা—আগুনের কাছে নয়। প্রতিপালনের ক্ষেত্রে রুহের উদাহরণ পিতার মতো। পিতা চলে যাওয়ার পর আগুনে অর্পণ করা অন্যায়। কেননা সে হলো তার শত্রু। মাটি মায়ের অনুরূপ। কেননা দেহের বেশির ভাগই তার থেকে সৃষ্টি। মোটকথা, মাটির দেহের জন্য রুহ প্রতিপালকস্বরূপ। তার প্রতিপালন ও হেফাজত করার দৃশ্য প্রকাশ্য। আর ভূপৃষ্ঠ তার জন্য মমতাময়ী মায়ের মতো। মাটি থেকে এর সৃষ্টি হওয়া এ কথার স্পষ্ট সাক্ষী। এতএব, রুহ (ঊর্ধ্বজগতে) চলে যাওয়ার সময় যদি এ মাটির দেহকে জমিনে দাফন না করে আগুনে অর্পণ করা হয়, তাহলে বিষয়টা এ রকম হলো যে নিজ আদরের সন্তানকে মায়ের কাছে না রেখে মায়ের সতিনের কাছে অর্পণ করা হলো।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক হিসেবে পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা তো স্পষ্টই। কিন্তু চিন্তা করলে বোঝা যাবে, সমস্ত বনি আদমের মধ্যে পরস্পর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। কেননা সবাই এক মাতা-পিতার সন্তান। পরস্পরের এ সম্পর্কের ফল হলো, একে অন্যের কল্যাণকামী, হেফাজতকারী। জীবিত অবস্থায় এ বিষয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই, মৃত্যুর পরও কেউ চায় না যে, মৃতকে কোনো আত্মীয় পৃথক করে দিতে। এ কারণেই তো লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় খুব বেশি পরিমাণ ক্রন্দন করে এবং জানাজায় ওঠানোর সময় প্রচণ্ড বেদনাদায়ক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় অপারগ হয়ে যদি পাশে রাখতে হয়, তাহলে ভালোবাসার দাবি হলো, তাকে আগুনে না জ্বালানো। তবে হ্যাঁ, বাহ্যিক অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করে উত্তম পোশাক পরিধান করিয়ে হেফাজতের সঙ্গে একদিকে রেখে দেবে, এতে কোনো ক্ষতি নেই।

মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার হেকমত

মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার সঙ্গেও তার মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি জড়িত। জীবিত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মৃত অবস্থায়ও গোসল দেওয়া হয়। কেননা সে নিজে জীবিত থাকতে এভাবে গোসল করত, আর গোসল প্রদানকারীও এভাবে গোসল করে। মৃত ব্যক্তির সম্মানার্থে বরইপাতা পানিতে ঢেলে গোসল করানো হয়, এর চেয়ে উত্তম গোসলের পদ্ধতি আর নেই। কেননা অসুস্থ থাকাবস্থায় বেশির ভাগ সময় শরীর ময়লাযুক্ত হয়ে যায়। ফলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আর ডান দিক থেকে শুরু করার হুকুম এ জন্য দেওয়া হয়েছে যে মৃত ব্যক্তির গোসল জীবিত অবস্থার অনুরূপ। তা ছাড়া ডান অঙ্গের মর্যাদা বেশি। তাই ডান দিক থেকে শুরু করা হয়।

মৃত ব্যক্তিকে কর্পূর লাগানোর তাৎপর্য

মৃত ব্যক্তিকে কর্পূর লাগানোর কারণসমূহ—

১. যে বস্তুতে কর্পূর লাগানো হয়, সেটা দ্রুত নষ্ট হয় না।

২. কোনো কষ্টদায়ক প্রাণী কাছে আসে না।

৩. কর্পূরের গন্ধে ভূমিতে সৃষ্ট কীটপতঙ্গ দূর হয়ে যায়। কর্পূর মৃত ব্যক্তির সাত অঙ্গে তথা যেগুলো দ্বারা সিজদা করে সেগুলোতে লাগানো হয়। আর তা হলো কপাল, দুই হাঁটু, দুই পা, দুই হাত। এ অঙ্গসমূহে লাগানোর কারণ হলো, এগুলো দ্বারা সিজদা করা হতো। এগুলোর বেশি মর্যাদা বোঝানোর জন্য এগুলোর মধ্যে কর্পূর লাগানো হয়।

৪. শরীরের সব কার্যক্রম এ অঙ্গগুলো দ্বারা সংঘটিত হয়, এগুলোর ওপর কর্পূর লাগানোর ফলে সব অঙ্গ যেন এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

[আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) রচিত ‘আহকামে ইসলাম আকল কি নজর মে’ থেকে পরিমার্জিত অনুবাদ]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা