kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

মুসলিম পরিবার

সন্তানের জন্য আল-কোরআনের উপহার

আবরার আবদুল্লাহ   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্তানের জন্য আল-কোরআনের উপহার

মা-বাবার সযত্ন প্রতিপালনে মানুষ হয়ে ওঠে সন্তান। পরিণত হয় দেশ ও জাতির সম্পদে। ইসলাম সন্তান প্রতিপালনে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে আল্লাহ সন্তানের প্রতি মমত্ব, উত্তম প্রতিপালনের দৃষ্টান্ত ও সন্তানের প্রতি মা-বাবার করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সুরা লোকমানে একজন দরদি পিতার জবানিতে সন্তানের জন্য কিছু অমূল্য উপদেশ দেওয়া হয়েছে। কোরআনবিশারদরা তা মুসলিম শিশুদের জন্য শ্রেষ্ঠতর উপহার হিসেবে অবহিত করেছেন। কোরআনের বিবরণীতে ‘লোকমান সন্তানকে উপদেশ স্বরূপ বলল’—

এক. আল্লাহর সঙ্গে শিরক কোরো না : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে পুত্র! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না। নিশ্চয়ই শিরক অনেক বড় জুলুম।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৩)

মানুষ শুধু মূর্তিপূজার মতো বিষয়কে শিরক মনে করে। তবে বোদ্ধা আলেমরা বলেন, ইসলামে শিরকের ধারণা অনেক বিস্তৃত। যেমন একজন খেলাপাগল মানুষ যখন আল্লাহর ভালোবাসার ওপর খেলাকে প্রাধান্য দেয় এবং খেলার জন্য কাউকে ভালোবাসে আবার খেলার জন্য ঘৃণা করে, তবে সে প্রকারান্তে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করল। আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা ক্ষুণ্ন হয় এবং তাতে সৃষ্টির অংশ বেড়ে যায়—এমন সব কাজ শিরকের পরিধিভুক্ত। ঈমান নষ্ট করে এমন কাজই শুধু শিরক নয়, বরং ঈমানের সৌন্দর্য নষ্ট করে এমন কাজও শিরক।

দুই. মা-বাবার সেবা করো : আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মানুষকে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়া হয় দুই বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করো। আমার কাছেই তো ফিরে আসবে।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৪)

পৃথিবীতে সন্তানের মানুষের প্রতি মা-বাবার যে অনুগ্রহ তার দাবি হচ্ছে, তাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা। এ আয়াতে মানুষকে মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মা-বাবার নির্দেশ ইসলামবিরোধী না হলে তা মান্য করা আবশ্যক। আর ইসলামবিরোধী নির্দেশ দিলেও তাদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিন. হৃদয়ে আল্লাহ স্মরণ জাগ্রত রেখো : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে পুত্র, যদি তা (পাপ-পুণ্য) হয় সরিষার দানার সমান এবং তা থাকে পাথরের ভেতর অথবা আসমান জমিনের যে কোনো স্থানে, আল্লাহ তা উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী।’ (সুরা লোকমান, আয়াত ১৬)

কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে আল্লাহর মুরাকাবা বা ধ্যানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সে যেন এ কথা সর্বদা স্মরণ রাখে, আল্লাহর কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই গোপন নয়, সব গোপনীয়তা ও রহস্য সম্পর্কে তিনি অবগত। তিনি বান্দার অতি নিকটে। বান্দার ছোট-বড় সব কাজ তিনি দেখেন এবং কিয়ামতের দিন তা তিনি উপস্থিত করবেন।

চার. নামাজ আদায় করো : লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে বলেন, ‘হে পুত্র! নামাজ আদায় করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৭)

ঈমানের পর নামাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হাদিসের বর্ণনা মতে, নামাজ মুমিন ও অবিশ্বাসীদের মাঝে পার্থক্যকারী। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব হবে। মানুষের মন ও জীবন, ব্যক্তি ও সমাজে নামাজের প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক।

পাঁচ. মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো : লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘হে পুত্র!...সৎ কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৭)

সামাজিক কল্যাণ-চিন্তা ইসলামী জীবনব্যবস্থার সৌন্দর্য। সামাজিক কল্যাণের জায়গা থেকেই ইসলাম মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে বলেছে, যেন সামাজিক পরিবেশ মনুষ্যত্বের উপযোগী থাকে। যাতে কল্যাণের ধারাগুলো বিনষ্ট না হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে, যদি সে তাতে সক্ষম না হয় তবে সে যেন মুখে প্রতিবাদ করে, যদি সে তাতেও সক্ষম না হয় তবে সে যেন মনে মনে তার প্রতিকার চিন্তা করে। আর এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৯)

ছয়. বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে : তিনি আরো বলেন, ‘হে পুত্র!...তোমার ওপর আসা বিপদে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এগুলো দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৭)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিপদে মুমিনদের ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়েছেন। বিশেষত দ্বিনের কাজ করার সময় মানুষের কটু কথা ও অসহনশীল আচরণে ধৈর্য ধারণ করতে হবে, যা নবী (আ.)-এর বৈশিষ্ট্য। তাঁরা মন্দ আচরণের পরিবর্তে ভালো ব্যবহার করতেন। শত্রুর সঙ্গেও কোমলতর আচরণ করতেন।

সাত. জীবনে বিনম্র হও : ইরশাদ হয়েছে, ‘অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না, পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। চলাফেরায় তুমি সংযত হও এবং স্বর নিচু রাখো। নিশ্চয়ই আওয়াজের ভেতর গাধার আওয়াজই সবচেয়ে শ্রুতিকটু।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৮-১৯)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা উচিত নয়, যাতে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ পায় এবং এমনভাবে চলাফেরা করা উচিত নয়, যাতে অহমিকা প্রকাশ পায়। বরং মানুষের জীবন এমন হবে যাতে তার ভেতর বিনয় প্রকাশ পায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা