kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

জাহেলি যুগ পেরিয়ে নয়ারূপে জুয়া

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জাহেলি যুগ পেরিয়ে নয়ারূপে জুয়া

বর্তমানে আমাদের দেশে বহুল আলোচিত একটি শব্দ ‘ক্যাসিনো’। অনেকে আগে এর নাম শুনলেও সেখানে ঠিক কী হয়, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নেই বেশির ভাগ মানুষেরই। তবে সেখানে যা-ই হোক তা যে ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ, সেটা সবারই জানা। যেহেতু এই ব্যাধি আমাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে রাখা আমাদের সবার জন্যই জরুরি। সমাজে গড়ে তোলা প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা।

ক্যাসিনো, ইতালীয় শব্দ ‘ক্যাসা’ থেকে এর উৎপত্তি। এর অর্থ ঘর। ক্যাসিনো বলতে সাধারণত ছোট ভিলা, গ্রীষ্মকালীন ঘর কিংবা সামাজিক ক্লাবকে বোঝানো হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সামাজিক ক্লাবগুলো হয়ে ওঠে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের তীর্থভূমিতে।

১৯ শতকের দিকে ক্যাসিনো বলতে এমন সব ভবনকে বোঝানো হতো যেখানে আনন্দদায়ক কাজকর্ম হতো। পাপাচারের এই আখড়াগুলোতে থাকত নাচ, গান, জুয়া ও ক্রীড়ার ব্যবস্থা। আধুনিক দিনে ইতালিতে বিভিন্ন অর্থে তারা ক্যাসিনো ব্যবহার করে। যেমন পতিতালয় (ক্যাসা চুইসাও বলে, যার অর্থ বন্ধ বাড়ি) ও শব্দপূর্ণ পরিবেশ। তারা জুয়ার আসর বোঝাতে ভিন্ন উচ্চারণে ক্যাসিনো বলে। এই জুয়ার ঘরগুলোকে দেখলে মনে হবে যেন জাহান্নামের টিকিট কাউন্টার।

জুয়া ইসলামী শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সর্বপ্রথম কোন সমাজে জুয়ার উৎপত্তি হয়েছিল তা সবারই অজানা। ইতিহাসের প্রায় সব সমাজেই কোনো না কোনোরূপে জুয়ার প্রচলন ছিল। জাহেলি যুগে আরবেও জুয়ার প্রচলন ছিল। যাকে বলা হতো ‘আজলাম’। এর মাধ্যমে তারা ভাগ্য নির্ধারণী জুয়া খেলত। যাতে ১০ ব্যক্তি শরিক হয়ে একটি উট জবাই করত। অতঃপর এর মাংস সমান ১০ ভাগে ভাগ করার পরিবর্তে তা দ্বারা জুয়া খেলা হতো। ১০টি শরের সাতটিতে বিভিন্ন অংশের চিহ্ন অবিকৃত থাকত। অবশিষ্ট তিনটি শর অংশবিহীন সাদা থাকত। এই শরগুলোকে তূণীর মধ্যে রেখে খুব নাড়াচাড়া করে নিয়ে প্রত্যেক অংশীদারের জন্য একটি করে শর বের করা হতো। যত অংশবিশিষ্ট শর যার নামে হতো, সে তত অংশের অধিকারী হতো এবং যার নামে অংশবিহীন শর হতো, সে বঞ্চিত হতো। (তাফসিরে কুরতুবি)

প্রাচীন গ্রিক, রোমান থেকে নেপোলিয়নের ফ্রান্স থেকে বর্তমান বাংলাদেশ—সব খানেই জুয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন বাঁশঝাড়েও একসময় ছেঁচড়া জুয়াড়িদের দেখা মিলত। ভিআইপি জুয়াড়িরা খেলত নিজেদের বাগানবাড়ি কিংবা হোটেলকক্ষে। এখন তাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে ক্যাসিনো।

ইউরোপের ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীর সর্বপ্রথম ক্যাসিনো নির্মিত হয় ইতালিতে। ১৬৩৮ সালে ভেনিস শহরে রিডোট্ট নামে এক ক্যাসিনো তৈরি করা হয়েছিল। ওই সময়কার জ্ঞানী লোকদের পরামর্শে এটি তৈরি করা হয়। আর এর উদ্দেশ্য ছিল কার্নিভাল সিজনে সচরাচর হওয়া জুয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা। তবে সামাজিক অবক্ষয়ের কথা ভেবে ১৭৭৪ সালে সেই শহরের প্রধান এটি বন্ধ করে দেন।

বর্তমান বিশ্বের ক্যাসিনোগুলো সাজানো হয় অনেক বড় পরিসরে। কয়েকটি ফ্লোর ও কয়েক লাখ বর্গফুটে বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই ক্যাসিনোতে থাকে শত শত ভিডিও গেমসদৃশ ক্যাসিনো স্লট, পোকার, ব্ল্যাক জ্যাক, রোলেট, ক্র্যাপসসহ নানা রকম বিচিত্র খেলা। সাধারণত ক্র্যাপস গেমের সামনেই নাকি বেশি ভিড় থাকে। বড় একটা টেবিলের ওপর অনেকগুলো ঘর। আগ্রহী ব্যক্তিরা পছন্দমতো ঘরে বাজি ধরেন। তিনটি লুডুর ডাইস টেবিলের ওপর ছুড়ে মারা হয়। যাঁরা বাজি ধরেন, সবাই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকেন। এরপর ডাইসগুলোতে যে যে সংখ্যা ওঠে, সে অনুযায়ী কয়েকটি ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। বাজির টাকার কেউ দ্বিগুণ, কেউ চার গুণ ফিরে পায়। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বেশির ভাগ বাজিগরের। যার ফলে দুশ্চিন্তায় পড়ে তারা প্রচুর নেশা করে। কেউ কেউ আবার হতাশায় পিষ্ট হয়ে আত্মহত্যাও করে বসে।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা বোঝাই যাচ্ছে, এই ক্যাসিনোগুলো মানুষকে উম্মাদ করে দেয়। তাদের নীতি-নৈতিকতা কেড়ে নেয়। ফলে তারা আল্লাহকে ভুলে এই শয়তানি মরীচিকায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দেয়। যারা এগুলো করে, তারা অল্প পুঁজিতে বেশি রুজির আশায়ই এগুলো করে। কিন্তু জুয়ার মাধ্যমে সফলতা অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ধরনের খেলাগুলো মানুষের দুনিয়া-আখিরাত উভয় জাহানের জন্যই ক্ষতিকর। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ ধরনের সব কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা-বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না?’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৯০-৯১)

উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ যে কয়টি বিষয় বর্জন করার নির্দেশ দিয়েছেন, এর বেশির ভাগই ক্যাসিনোর প্রাণ। একটি ক্যাসিনো মদ, জুয়া, নারী, ভাগ্যনির্ধারক তীর ছাড়া কখনোই জমবে না। আমাদের দেশে সদ্য বন্ধ করে দেওয়া ক্যাসিনোগুলোতে জুয়া, মদ ও গান-বাজনার ব্যবস্থা ছিল। অথচ এগুলো জঘন্য হারাম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মদ পান, জুয়া খেলা ও ঢোল-তবলাকে হারাম করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নেশা সৃষ্টিকারী সব বস্তুই হারাম।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৮৫)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, তিন প্রকার লোকের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। ১. সদা মদ পানকারী। ২. পিতা-মাতার অবাধ্য। ৩. দাইয়ুস। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৫৩৭২)। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, ক্যাসিনোতে যাতায়াতকারী জুয়াড়িদের মধ্যে এই তিনটি ত্রুটিই পাওয়া যায়। অন্যদিকে ক্যাসিনোতে আসা জুয়াড়িদের মনোরঞ্জনের জন্য নারীরাও ছাড় পায়নি। কারণ হাদিসের ভাষায় দাইয়ুস বলা হয়, যেসব নারী বেপর্দা চলাফেলা করে, পুরুষের সংস্রবে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করে তাদের মনোরঞ্জন করে, বিভিন্ন অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয়। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে যারা তাদের পরিবারের নারীদের এমন উগ্র চলাফেরায় বাধা দেয় না তাদেরও দাইয়ুস বলা হয়। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুক। আমিন।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা