kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

নেদারল্যান্ডসে ইসলামের ক্রমবিস্তার

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নেদারল্যান্ডসে ইসলামের ক্রমবিস্তার

নেদারল্যান্ডস উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে অবস্থিত একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশ। সাংবিধানিক রাজতন্ত্র দেশটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর উত্তর-পশ্চিমে সাগর, দক্ষিণে বেলজিয়াম এবং পূর্বে জার্মানি। ১২টি প্রদেশ নিয়ে নেদারল্যান্ডস গঠিত। ভৌগোলিকভাবে দেশটির ২৫ শতাংশ ভূভাগ এবং ২১ শতাংশ জনগণ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে বসবাস করে। ৫০ শতাংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। মোট জনসংখ্যা এক কোটি ৫৬ লাখ।

নেদারল্যান্ডসের অর্থনৈতিক ভিত্তি বেশ মজবুত হওয়ার কারণে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে তার ভূমিকা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শিপিং, মৎস্য, বাণিজ্য এবং ব্যাংকিং হচ্ছে অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। পৃথিবীর ১০টি রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে নেদারল্যান্ডস অন্যতম। প্রধান সরকারি ভাষা ডাচ, তবে ফ্রিসিয়ান ও ইংরেজি ভাষা বেশ জনপ্রিয়। বেশির ভাগ মানুষ রোমান ক্যাথলিক ধর্মমতের অনুসারী খ্রিস্টান। সংখ্যালঘুদের মধ্যে রয়েছে মুসলমান, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে নেদারল্যান্ডসে ইসলামের অগ্রযাত্রা সূচিত হয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে নেদারল্যান্ডসে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচনালগ্নে ডাচ সরকার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষত তুরস্ক, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৭৫৩ মুসলমানকে নেদারল্যান্ডসে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। মুসলমানরা মূলত আমস্টারডাম, রটেরডাম, হেগ ও আটরেস্টে বসবাস করে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বসনিয়া, সুরিনাম, সোমালিয়া, ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে বহু মুসলমান রাজনৈতিক আশ্রয়ে নেদারল্যান্ডসে আসে। তরুণ মুসলমানদের অনেকেই ডাচ মেয়েদের বিয়ে করার ফলে স্থায়ীভাবে ডাচ সমাজের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সুযোগ পায়। ২০০৬ সাল পর্যন্ত দাওয়াত ও তাবলিগি কর্মকাণ্ডের ফলে আট হাজার ৫০০ ডাচ অধিবাসী কোরআন-সুন্নাহর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করে। ২০১০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরো নেদারল্যান্ডসে ৫৫৩টি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ মসজিদ তুর্কিদের অধীনে এবং ১৪০টি মসজিদ মরক্কোবাসী দ্বারা পরিচালিত। সুরিনামি মুসলমানরা ৫০টি মসজিদ পরিচালনা করে থাকে। ইমামদের মধ্যে  বেশির ভাগই মিসরীয়, সিরিয়ান, সুদানি ও সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত। নেদারল্যান্ডসে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। বেশির ভাগ সুন্নি মুসলিম। অল্পসংখ্যক শিয়া ও কাদিয়ানি রয়েছে।

৪৫টি সরকার অনুমোদিত মাদরাসা, প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় মুসলমানরা পরিচালনা করে থাকে।  সেখানে সরকারি পাঠক্রমের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়। রাজনীতিতে মুসলমানরা বেশ সক্রিয়। ১৫০ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সব সময় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব থাকে। ২০০৩ সালের নির্বাচনে ১০ মুসলিম পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ সাল থেকে সৃষ্ট ‘ইসলামফোবিয়া’র ঢেউ নেদারল্যান্ডসেও লাগে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ, অস্থিরতার রেশও কম নয়। মরক্কোর বংশোদূ্ভত ডাচ নাগরিক আহমদ আবু তালিব ২০০৮ সালে রটেরডামের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে গঠিত প্রধানমন্ত্রী বালকেনেন্দের মন্ত্রিসভায় দুজন মুসলিম মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁরা হলেন যথাক্রমে বিচার ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নেবাহাত আল বাইরাক ও আহমদ আবু তালিব।

ডাচ সরকার মুসলমানদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করে না। নাগরিক সুবিধা লাভে মুসলমানদের কোনো বৈষম্যের শিকার হতে হয় না। ভোটাধিকার, ধর্ম অনুশীলন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত। সংখ্যালঘু বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংহতি প্রতিষ্ঠায় সরকার সচেষ্ট। মুসলিম মহিলারা স্কার্ফ ও বোরকা পরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও বাজারে চলাফেরা করতে পারেন। কিছু নিয়ম-কানুন মেনে কোরবানির পশু জবাই করা যায়। মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদানও প্রদান করা হয়। প্রতিবছর মরক্কো ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৫০ জন ইমাম নিয়োগ করা হয়। সরকারি সহযোগিতায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ইমামদের ৬০০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে তাঁরা ডাচ ভাষা ও ডাচ সমাজের নিয়ম-রীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হন।

মসজিদ, মুসলমান ও ইসলামিক স্কুলের অবস্থিতির কারণে পুরো নেদারল্যান্ডসে ইসলামী পরিবেশ বিরাজিত। ডাচ সরকার কয়েদি ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের মধ্যে নৈতিক ও মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আলেম নিয়োগের লক্ষ্যে একটি উপদেষ্টা কমিশন গঠন করে। শিক্ষার উচ্চতর পর্যায়ে ইসলাম, ইসলামিক স্টাডিজ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষা অনুশীলনে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ অধ্যাপকের পদ চালু রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল ডাচ ফ্রিডম পার্টি মনে করে যে ইসলাম বিস্তৃতির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে নেদারল্যান্ডসে মুসলিম জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। উরধহধ ডবংঃ নামক এক লেখিকার প্রকাশিত প্রবন্ধ পুরো ইউরোপে তোলপাড় সৃষ্টি করে। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘ইসলাম কি নেদারল্যান্ডস জয় করে নেবে? (Will Islam conquer the Netherlands?) 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ

ওমরগণি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা