kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইসলামে সমাজসেবার ধারণা

ড. ইউসুফ আল কারজাভি   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইসলামে সমাজসেবার ধারণা

ইসলামে ইবাদতের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত ও প্রশস্ত। তা মানুষের এমন অনেক কাজকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে, তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম ঘোষণা করেছে, যা তাদের কল্পনায়ও আসে না। মানবকল্যাণে করা সব কাজ ইসলামে ইবাদত হিসেবে গণ্য। শর্ত হলো, তা নিঃস্বার্থ মানবসেবা হতে হবে। সেবক বিশ্বাস করবে আমি এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করব। তার কাছ থেকেই প্রতিদান পাব। সে সুনাম ও সুখ্যাতির আশা করবে না। প্রতিটি এমন কাজ, যা চিন্তিত ব্যক্তির চিন্তা, বিপদগ্রস্তের বিপদ, আহতের ক্ষত, বঞ্চিতের অধিকার, মজলুমের জুলুম, পরাভূত ব্যক্তির পরাজয় দূর করার উদ্দেশ্যে হয়, তা ইবাদত। একইভাবে যে কাজের মাধ্যমে দ্বিনের পথ প্রশস্ত হয়, দরিদ্রের অভাব দূর হয়, পথভ্রান্ত পথিক পথ পায়, অজ্ঞ ব্যক্তির জ্ঞানপ্রাপ্তি হয়, মুসাফির আশ্রয় পায়, সৃষ্টির কষ্ট দূর হয়, মানুষ সহজে রাস্তায় চলতে পারে—এর সবই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে যদি ব্যক্তির নিয়ত বিশুদ্ধ হয়। এর কতগুলোকে আল্লাহ ও রাসুল (সা.) ঈমানের অংশ, কতগুলোকে ইবাদত ও কতগুলোকে পুরস্কারযোগ্য আমল বলেছেন।

সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর কাছে প্রতিদানপ্রাপ্তির একমাত্র মাধ্যম নামাজ, রোজা, জিকির ও দোয়া নয়, ইবাদতের পাশাপাশি মুমিন সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমেও নিজের নেকির পাল্লা ভারী করতে পারে। এসব কাজ শ্রমসাধ্য না হলেও আল্লাহর দরবারে মূল্যবান। পরকালে আল্লাহর দাড়িপাল্লায় ভারী আমল হিসেবে বিবেচিত হবে। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়ে মর্যাদাবান আমলের সংবাদ দেব?’ তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম রা.) বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘মানুষের মাঝে সমঝোতা করে দেওয়া। কেননা মানুষের মধ্যকার বিশৃঙ্খলা ধ্বংসাত্মক।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৭৫০৮)

রোগীর খোঁজখবর নেওয়ার পুরস্কার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে এভাবে বিবৃত হয়েছে, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কোনো রোগীকে দেখতে যায়, আসমানে একজন প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করতে থাকে, তুমি সুখী হও, তোমার পথচলা বরকতময় হোক, জান্নাতে তুমি স্থান লাভ করো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৪১২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের একটি চমৎকার দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, যেখানে মহান স্রষ্টা তাঁর বান্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ ছিলাম তুমি আমার সেবা করোনি। বান্দা বলবে, হে প্রভু, আমি আপনার সেবা কিভাবে করব, আপনি তো জগৎসমূহের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, তুমি জানতে না আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি তার সেবা কেন করোনি? তুমি কি জানতে না, তার সেবা করলে তুমি তার কাছে আমাকে পেতে? হে আদম সন্তান, আমি ক্ষুধার্থ ছিলাম, তুমি আমাকে আহার করাওনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রভু, আপনি জগৎসমূহের প্রতিপালক, আপনাকে আমি কিভাবে খাবার খাওয়াব? আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, তুমি তাকে দাওনি। তুমি কি জানতে না, যদি তুমি তাকে খাওয়াতে, তবে তা আমার কাছে এসে পেতে? হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পান করাওনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রভু, আপনি জগৎসমূহের প্রতিপালক আমি কিভাবে আপনাকে পানি পান করাব? আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিল, তুমি তাকে পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পান করাতে, তবে তুমি তা আমার কাছে এসে পেতে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৪২৬০)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় একটি কাঁটাযুক্ত ডাল পড়ে থাকতে দেখল এবং তা রাস্তা থেকে সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার কাজে সন্তুষ্ট হলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৯)

ইসলাম সমাজসেবামূলক কাজের শুধু প্রশংসা করেনি, বরং মানুষকে সমাজসেবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, উদ্বুদ্ধ করেছে, নির্দেশ দিয়েছে। তাকে মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ঘোষণা করেছে। মুসলিমদের নির্দেশনা দিয়ে বলেছে, তারা যেন সমাজসেবার মাধ্যমে জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। ইসলামে সমাজসেবার ধারণা এত বিস্তৃত, যেকোনো শ্রেণির মানুষের পক্ষে তা করা সম্ভব। ইসলাম সমাজসেবাকে কোনো স্থান বা সময়ের সঙ্গে আবদ্ধ করেনি, তাকে আর্থিক সেবায় সীমাবদ্ধ করেনি, শারীরিক শ্রমে সীমিত করেনি, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিষেবায় সংকুচিত করেনি, বরং ইসলামে সমাজসেবার ধারণা একটি বিস্তৃত প্রাঙ্গণের মতো, যেখানে সব মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে পারবে। ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার অংশ রয়েছে তাতে।

ইসলাম সমাজসেবা, মানবকল্যাণকে মানবিকতা ও মহানুভবতার ওপর ছেড়ে দেয়নি। ইসলামের দৃষ্টিতে তা মানুষের মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘প্রতিদিন মানুষের শরীরের প্রতিটি জোড়ার বিপরীতে সদকা করা আবশ্যক। দুই ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়বিচার করা একটি সদকা, নিজের বাহনে কাউকে বহন করা বা তার পণ্য বহন করা একটি সদকা, ভালো কথা একটি সদকা, নামাজের উদ্দেশ্যে চলা প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সদকা, রাস্তা থেকে কষ্টকর জিনিস সরিয়ে দেওয়া একটি সদকা।’ (সুনানে  বায়হাকি, হাদিস : ৩০৫৭)

একইভাবে হাদিসে এসেছে, মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, বধির ব্যক্তিকে কিছু বুঝিয়ে দেওয়া, অন্ধকে পথ দেখানো, মানুষকে পথ দেখানো, সুপরামর্শ দেওয়া, দুর্বল ব্যক্তির বোঝা বহন করে দেওয়া ইত্যাদি কাজ আল্লাহর কাছে মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত এবং উত্তম দান। এভাবে ইসলাম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার এবং সামাজিক পতন রোধ করার দীক্ষা দিয়েছে। ইসলামী সমাজে মৌলিক অধিকারে সবাই সমান।

ইসলামে সমাজসেবার ধারণা শুধু মানুষেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম পৃথিবীর সব প্রাণের সেবা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে। জীব, জন্তু, পাখি, উদ্ভিদ সব কিছুর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে বলেছে ইসলাম। গোটা সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলাম দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে।

ভাষান্তর : আতাউর রহমান খসরু

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা