kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সভ্যতার অপার বিস্ময় মিসরের পিরামিড

মোস্তফা কামাল গাজী

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সভ্যতার অপার বিস্ময় মিসরের পিরামিড

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মিসরের নীল নদের তীরে গড়ে উঠেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ এক সভ্যতা, যাদের হাতে তৈরি হয়েছিল আধুনিক যুগের বিস্ময় পিরামিড। প্রাচীন সভ্যতার সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম মিসরের পিরামিডগুলো। পাঁচ হাজার বছর পরও এর রহস্য অনাবৃত। তাই মানুষের কৌতূহলেরও যেন শেষ নেই একে ঘিরে। কালের সাক্ষী হয়ে পিরামিডগুলো টিকে আছে যুগ যুগ ধরে। পিরামিডের কিছু রহস্যময় গল্প তুলে ধরা হলো।

 

পিরামিড

পিরামিড হলো এক প্রকার জ্যামিতিক আকৃতি, যার বাইরের তলগুলো ত্রিভুজাকার, যা একটি শীর্ষবিন্দুতে মিলিত হয়। পিরামিড একটি বহুভুজাকৃতি ভূমির ওপর অবস্থিত। বহুভুজের ওপর অবস্থিত যে ঘনবস্তুর একটি শীর্ষবিন্দু থাকে এবং যার পার্শ্বতলগুলোর প্রতিটি ত্রিভুজাকার।

 

পিরামিড নির্মাণের কারণ

প্রাচীন মিসরীয়দের ধর্মবিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুনর্জন্মে বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করত, মৃত্যুপরবর্তী জগতেও প্রয়োজন হবে ধন, দৌলত ও অন্যান্য জাগতিক বিষয়ের। তাই রাজা ও রানিদের মৃত্যুর পর মৃতদেহের সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হতো সোনা, রুপা ও মূল্যবান রত্নাদি। তাদের দেহকে মমি বানিয়ে সংরক্ষণ করা হতো এবং তাদের সব দাস-দাসীকে হত্যা করা হতো, যাতে পরকালে তাদের সেবার অভাব না হয়। এই সমাধিসৌধ বা পিরামিডে মৃতদেহগুলোকে সমাহিত করার আগে মমি তৈরি করা হতো। মমি তৈরি করার পেছনে ছিল এক অভিনব পদ্ধতি। মমিগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা হতো, যাতে সেগুলো পচে-গলে নষ্ট না হয়ে যায়।

কিন্তু সমস্যা ছিল, এই মমি ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী একটি নিরাপদ স্থানে না রাখলে চুরি হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। তাই পিরামড তৈরির আগে নির্মাণ করা হতো ট্রপিজয়েড আকৃতির মাস্তাবা নামক সমাধি। প্রাচীনকালে মাস্তাবায় রডের ব্যবহার ছিল না। সেকারণে এই মাস্তাবাগুলো বেশি উঁচু বানানো ছিল অসম্ভব। কালক্রমে এই মাস্তাবাগুলোর পরিবর্তে স্টেপ পিরামিডের ডিজাইন জনপ্রিয় হতে লাগল। এর পেছনের মূল কারণ পিরামিডের জ্যামিতিক গঠন। সাধারণত বিল্ডিংয়ের পুরো ওজন তার ভিতের ওপর পড়ে। তাই উচ্চতা যত বেশি হবে ভিত হতে হবে তত শক্ত। পিরামিডের ক্ষেত্রফল উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেতে থাকে। পিরামিডের ভিত্তির ক্ষেত্রফল ওপরের স্তরগুলোর চেয়ে বেশি হওয়ায় এর ওপর চাপও পড়ে কম এবং স্থাপনাটি শক্তিশালী হয়। তাই অনেক উঁচু সমাধি নির্মাণের একমাত্র রাস্তা ছিল পিরামিড শেপের ডিজাইন গ্রহণ করা।

প্রথম দিকের পিরামিডগুলো ছিল অমসৃণ স্টেপ পিরামড, যেগুলো মিসরের প্রথম তিন রাজবংশের আমলে নির্মিত হতো। তবে চতুর্থ রাজবংশের সময় থেকে নির্মাণ শুরু হলো প্রকৃত পিরামিড আকৃতির সমাধি।

 

গিজার গ্রেট পিরামিড

মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মৃত নগরী আল গিজা। এখানে নির্মিত হয়েছে বড় তিনটি পিরামিড। এগুলো হলো যথাক্রমে ফেরাউন খুফু, তাঁর ছেলে ফেরাউন খেফ্রে এবং খেফ্রের ছেলে মেনকাউরের পিরামিড। তাঁরা সবাই ছিলেন মিসরের চতুর্থ রাজবংশের রাজা। তবে এই তিনটি তো বটেই, মিসরের সব কটি পিরামিডের মধ্যে ফেরাউন খুফুর পিরামিড হলো সবচেয়ে উঁচু এবং আকারে সবচেয়ে বড়। এ কারণে ফেরাউন খুফুর পিরামিডটি গিজার গ্রেট পিরামিড নামেও পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬০ সালে ফেরাউন খুফু নিজে এই পিরামিড নির্মাণ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ষড়বিংশ শতক থেকে চতুদর্শ শতক পর্যন্ত প্রায় সুদীর্ঘ চার হাজার বছর এটিই ছিল মানব সৃষ্ট সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা। ১৮৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার নির্মাণের পর এটি তার গৌরব হারায়। এই পিরামিডের পাথরের গায়ে মূল্যবান লাইমস্টোন প্লাস্টার করা ছিল। পরে অন্য রাজারা নিজেদের পিরামিড নির্মাণের সময় এখান থেকে লাইমস্টোন নিয়ে নিজেদের সমাধিসৌধে লাগাতে শুরু করেন। এই পিরামিডের তিনটি কক্ষ রয়েছে। একটি বেইসমেন্টে আর বাকি দুটি ছিল যথাক্রমে রানি ও রাজার সমাধি কক্ষ। বেইসমেন্টের মতো যে খালি জায়গা ছিল, ধারণা করা হয় পরজগতে প্রজারা ফেরাউনদের সঙ্গে দেখা করতে এলে এখানে বসবে। এগুলোতে ঢোকার জন্য পেরোতে হয় অনেক গোলকধাঁধা। একসময় খুফুর পিরামিডের চূড়ায় যাওয়ার অনুমতি থাকলেও এখন নেই। এতে পর্যটক এবং পিরামিড উভয়েরই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

গিজার গ্রেট পিরামিডের প্রকৃত উচ্চতা ৪৮১ ফুট হলেও বর্তমান উচ্চতা ৪৫৫ ফুট। পিরামিডের ভূমি বর্গাকৃতির এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয় দিকেই ৭৫৬ ফুট। পাথরের বড় বড় চাঁই দিয়ে বানানো স্থাপনাটি আসলে কিভাবে তৈরি করা হয়েছিল, সেটি আজও গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়ের ব্যাপার। আরো অবাক করা বিষয়টি হলো, এটি নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল বড় বড় পাথরের ২৩ লাখ চাঁইয়ের। একেকটি পাথরের চাঁইয়ের ভর ছিল গড়ে কমপক্ষে দুই থেকে ১৫ টন। এমনকি কিছু চাঁইয়ের ভর ৫০ টনেরও বেশি ছিল। চাঁইগুলোর বেশির ভাগই ছিল লাইমস্টোনের। গুণে-মানে অনন্য এই লাইমস্টোনগুলো আনা হতো তুরা অঞ্চল থেকে। নীল নদের পূর্ব তীর থেকে জলপথে নিয়ে আসা হতো এগুলো।

অনেকে মনে করে, ভারী পাথরের ব্লকগুলো মরুভূমির মধ্য দিয়ে অদ্ভুত এক কলের (স্লেড) মাধ্যমে ঠেলে স্থানান্তর করা হতো। আর এ জন্য মরুভূমির নির্দিষ্ট পথে স্লেডের সামনে শুকনো বালুগুলোকে প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে নেওয়া হতো। এভাবেই তারা বিশালাকার একেকটি পিরামিড নির্মাণে সক্ষম হয়। তবে এগুলো মানুষের কাল্পনিক কথা। প্রকৃতভাবে পিরামিডগুলো আসলে কিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, আজও তা অজানা। এ কারণেই এখনো মানুষের কাছে অপার রহস্যের নাম পিরামিড।

২০১৮ সাল পর্যন্ত মিসরে প্রায় ১০০ পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে। পিরামিডগুলোর মাঝখানের অনেক চলাচলের রাস্তা এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। এগুলোর দেয়ালে রয়েছে নানা ধরনের খোদাই করা প্রতীক ও ছবি। একসময় ধন-রত্নের প্রাচুর্য ছিল পিরামিডগুলো। পিরামিড তৈরির পর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এর দরজাগুলো সিল করে দেওয়া হতো এবং সমাধির ধন-রত্ন রক্ষার জন্য তখনকার মিসরের শ্রেষ্ঠ আর্কিটেক্টের মাধ্যমে চোরদের ধোঁকা দেওয়ার উপযোগী বিভিন্ন ডিজাইন করা হতো। মাঝেমধ্যে ভেতরের রাস্তাগুলো বন্ধ করার জন্য বিশাল ও মজবুত গ্রানাইটের প্লাগ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এত কিছুর পরও চোর-ডাকাতরা ঠিকই নিজস্ব পদ্ধতিতে সমাধির পথ খুঁজে বের করে ধন-রত্ন নিয়ে যেত।

চোররা যেমন ধন-রত্নের আশায় ফেরাউনদের সমাধি খুঁজে বেড়াত, তেমনি গবেষকরা গুপ্তধনের আশায় হন্য হয়ে সমাধিগুলোতে চষে বেড়াতেন। উনিশ শতাব্দীতে এসে ইউরোপীয়রাও এ গুপ্তধনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের হতাশ হতে হয়েছিল। কারণ তাদের অভিযানের আগেই চোর-ডাকাতরা সমাধিগুলো রত্নশূন্য করে ফেলেছিল।

 

গ্রেড পিরামিডের শ্রমিক সংখ্যা

গিজার গ্রেট পিরামিড নির্মাণ করতে ঠিক কতজন শ্রমিক লেগেছিল সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে জনসংখ্যা ও খাদ্য সরবরাহ পর্যালোচনা এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র একত্র করে গবেষকরা একটি ধারণায় উপনীত হতে পেরেছেন। তা হলো, চার হাজার থেকে ছয় হাজার পাথর খোদাইয়ে দক্ষ রাজমিস্ত্রি একটানা প্রায় ২০ বছর সময় ধরে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছিল।

এ ছাড়া দাস, যুদ্ধবন্দি ও অন্যান্য শ্রমিক তো ছিলই। শ্রমিক ও মিস্ত্রিদের খাবার বাবদ প্রতিদিন দুই লাখ পিস রুটি ও এক লাখ পিস পেঁয়াজের প্রয়োজন হতো। পিরামিডের আশপাশে ছিল শ্রমিকদের থাকার জায়গা। এই উদ্দেশ্যে সেখানে গড়ে উঠেছিল কয়েকটি গ্রাম।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা