kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চিরায়ত ইসলামী সাহিত্য

‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’

ইতিহাসের আকরগ্রন্থ

মাওলানা মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’

‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ইসলামী ইতিহাসের আকরগ্রন্থ। আরবি ভাষায় রচিত এই বৃহৎ কলেবরের এই কিতাবের প্রসিদ্ধি বিশ্বজুড়ে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাফসিরবিশারদ ও ইতিহাসবেত্তা আবুল ফিদা হাফিজ ইবনে কাসির আদ-দামেস্কি (রহ.) বইটির রচয়িতা। তিনি সংক্ষেপে ইবনে কাসির নামেও পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ ‘তাফসির ইবনে কাসির’ জ্ঞান-পরিমণ্ডলে সমধিক সমাদৃত।

‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে গভীর তত্ত্বীয় জ্ঞান-অভিজ্ঞান, সূক্ষ্ম-নিপুণ বাস্তব-আশ্রিত ইতিহাস রয়েছে। ইসলামী ইতিহাসের দক্ষতা প্রয়াসীদের জন্য গ্রন্থটির পঠন-পাঠন গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বিষয়-বৈচিত্র্যের জন্য অমুসলিম বিদ্বানরাও গ্রন্থটিকে গুরুত্ব দেন। মহান আল্লাহ তাআলার বিশাল সৃষ্টিজগৎ, মানব সৃষ্টিতত্ত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সভ্যতা, নবী-রাসুলদের আগমন-প্রস্থান ও তাঁদের বর্ণোজ্জ্বল জীবনযাপনের সাত-সতেরো বর্ণনা করেছেন। বইটিতে ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও গোছালো ধারণা পাওয়া যায়। ইসলামের ইতিহাস গবেষকদের কাছে গ্রন্থটি মৌলিক ইতিহাসগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামী ইতিহাসের গ্রন্থ হলেও উচ্চ মার্গীয় ভাষা-মাধুর্য ও সাহিত্য-শৈলীর গাঁথুনি এ বইয়ের সৌকর্য। খ্যাতিমান আরবি সাহিত্যিক ও বোদ্ধাদের কাছে এটি বিপুলভাবে প্রশংসিত। অল্লামা ইবনে কাসির ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থটিকে তিন ভাগে বিন্যস্ত করেছেন।

 

প্রথম অংশ : সৃষ্টিজগতের তত্ত্ব-রহস্য

এ পর্বে স্থান পেয়েছে, আসমান-জমিন ও মহাজগতের সৃষ্টির ইতিহাস। আরশ-কুরসি থেকে আসমান-জমিনের মধ্যবর্তী সব কিছুই এতে স্থান পেয়েছে। বিশেষত ফেরেশতা, জিন, শয়তান, পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে আগমন, নবী-রাসুলদের ধারাবাহিক আলোচনা, বনি ইসরাঈলের বর্ণনা, আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘটনাপ্রবাহ ও প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনচরিত ও নবুওয়ত লাভ পর্যন্ত সময়ের ধারাবাহিক ও পরম্পরানির্ভর আলোচনা।

 

দ্বিতীয় অংশ : রাসুল (সা.)-এর ওফাতপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

এ পর্বে স্থান পেয়েছে রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুর পর থেকে ৭৬৮ হিজরি সন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য খলিফা ও রাজা-বাদশাহদের উত্থান-পতন, মনীষীদের বর্ণনা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ ও আলোচনা।

 

তৃতীয় অংশ : লেখক বিশ্লেষণ

এ অংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মুসলিম উম্মাহর সার্বিক অশান্তি, স্খলন ও বিপর্যয়ের নেপথ্য-কারণ, ভবিষ্যতে অনুঘটিতব্য মানবজাতির সংঘাত, বিপর্যয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ফেতনা-ফ্যাসাদ, কিয়ামতের নিদর্শন, পুনরুত্থান, হাশর-নশর, কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ অবস্থা, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ।

মুসলিম বিশ্বে বইটির ব্যাপক চাহিদা সব সময় শীর্ষে। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এটি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ গ্রন্থটির গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলা ভাষায় গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশ করেছে। ১৪ খণ্ডে প্রকাশিত গ্রন্থটির বাংলা নাম ‘ইসলামের ইতিহাস, আদি-অন্ত’।

বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের সুবিধার্থে ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ বাংলায় অনূদিত সম্পূর্ণ গ্রন্থটির অ্যাপসও তৈরি করেছেন বিভিন্ন জ্ঞানানুরাগী। সেখানে বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়গুলো খুব সুন্দর করে সাজানো রয়েছে।

গ্রন্থ রচয়িতার জীবনালেখ্য

আবুল ফিদা হাফিজ ইবনে কাসির আদ-দামেস্কি। তিনি তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বড় আলেম-বিদ্বান ছিলেন। জ্ঞানের প্রখরতার কারণে সমসাময়িকদের মাঝেও ছিলেন অনন্য।

ইবনে কাসিরের জন্ম ৭০১ হিজরিতে। দামেস্কের আল-মাজদাল অঞ্চলে। বাবার মৃত্যুর পর সহোদর ভাই আবদুল ওয়াহবের সঙ্গে দামেস্ক শহরে চলে আসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। বড় ভাই তাঁর লালন-পালন করেন এবং সার্বিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।

 

জ্ঞান অর্জন ও অন্যান্য

ইবনে কাসির (রহ.) ফিকহ অধ্যয়ন করেন বিভিন্নজনের কাছে। তন্মধ্যে শায়খ বুরহান উদ্দিন, ইবরাহিম বিন আবদুর রহমান আল-ফিরাজি ও কামাল উদ্দিন ইবনে কাজি সাহবা অন্যতম। তখনকার দিনের রীতি ছিল কেউ কোনো নির্দিষ্ট ফিকহি মাজহাবে বিশেষজ্ঞ হতে চাইলে ওই মাজহাবের ফিকহের একটি বই মুখস্থ করতে হতো। ৭১৮ হিজরিতে ইবনে কাসির আবু ইসহাক সিরাজির রচিত ‘আত-তামবিহ ফি ফুরুইস শাফিইয়্যাহ’ মুখস্থ করেন। এ ছাড়া তিনি ইবনে হাজাব মালেকির ‘মুখতাসার’ নামক গ্রন্থও মখস্থ করেন।

হাদিসশাস্ত্রের দীক্ষা নেন ইবনে আল-হাজ্জার ও তাঁর সমশ্রেণির মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে। ইবনে কাসিরের শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। ইবনে কাসির ইমাম ইবনে তাইমিয়ার স্নেহভাজন ও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁর অন্যান্য শিক্ষকের মধ্যে মুহাদ্দিস জামাল উদ্দিন ও ইউসুফ আজ-জাকি আল-মিজ্জি অন্যতম। পরে ইবনে কাসির আল-মিজ্জির মেয়েকে বিয়েও করেন।

 

লেখালেখি ও রচনাসম্ভার

ইবনে কাসির সর্বাধিক পরিচিত দুটি কাজের জন্য। তা হলো, তাঁর তাফসিরে ইবনে কাসির ও আলোচ্য ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’। এ ছাড়া জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ইবনে কাসির গ্রন্থ-পুস্তক রচনা করেছেন। তাঁর কিছু কাব্যও রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু রচনা হলো, আস-সিরাহ আন-নববীয়্যাহ, আত-তাকমিলাহ ফি মারিফাতিস সিফাত ওয়দ-দুয়াফায়ি ওয়াল মুজাহিল, জামিউল মুসনাদ,

মুখতাসার উলুম আল-হাদিস, শারহু সহিহুল বুখারি, তাবাকাতুশ-শাফিয়াহ,  রিসালাতুল ইজতিহাদ ফি তালাবিল জিহাদ ইত্যাদি।

ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী ইবনে হাজার আল-আসকালানি বলেন, ‘ইবনে কাসির হাদিসের বিষয়াবলি নিয়ে কাজ করেছেন ভাষ্য ও সনদ (ধারা বর্ণনা) উভয় জায়গাতেই। তাঁর স্মৃতিশক্তি ভালো ছিল। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর বইগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষজন তাঁর মৃত্যুর পরও সেগুলো থেকে উপকৃত হয়।’

ইবনে কাসিরের ছাত্র ইবনে হাজ্জি তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘যখনই তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হতো, আমি তাঁর থেকে আমি উপকৃত হতাম।’

মহান এই জ্ঞানতাপস ৭৭৪ হিজরির ২৬ শাবান ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শিক্ষক ইমাম ইবনে তাইমিয়ার পাশেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁদের রহম করুন।

লেখক : ইমাম ও খতিব

মসজিদুল আবরার

বারইয়ারহাট পৌরসভা, চট্টগ্রাম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা