kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইন্দোনেশিয়ায় দৃঢ় হচ্ছে ইসলামী অর্থনীতির ভিত

আবরার আবদুল্লাহ   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইন্দোনেশিয়ায় দৃঢ় হচ্ছে ইসলামী অর্থনীতির ভিত

অ্যারি আন্টং ইন্দোনেশিয়ার একজন সাবেক ভিডিও পরিচালক। তিনি এমটিভির জন্য কাজ করতেন। জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও তিনি ছিলেন মদপানে অভ্যস্ত। নিয়মিত জিন্স পরতেন এবং রকস্টারদের মতো চুল রাখতেন। কিন্তু অনলাইনে একজন ধর্ম প্রচারক তাঁকে ধর্মীয় জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করেন। ফলে তাঁর অনুভূতি জাগ্রত হয়। তিনি ধর্মীয় জীবনে ফিরে আসেন। শুধু অ্যারি আন্টং নয়, পুরো ইন্দোনেশিয়ায় মুসলমানের ধর্মীয় অনুরাগ বাড়ছে। দৈনন্দিন জীবনে ধর্ম পালনে উৎসাহী হচ্ছে অনেকেই, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পরিবর্তন আসছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়ার সামগ্রিক অর্থব্যবস্থায়।

আন্টংয়ের জীবনযাত্রায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। তিনি দাড়ি রাখেন, সাধারণভাবে চুল কাটেন এবং সাধারণ পোশাক পরেন। আন্টং একটি নতুন পেশা বেছে নিয়েছেন। কয়েকজন তারকার সঙ্গে তিনি শরিয়াহবান্ধব বিনোদনের ব্যবসা শুরু করেছেন; যার মধ্যে আছে মুসলিম সমাজের জনপ্রিয় প্রার্থনাসভার আয়োজন করা। তারকা সহকর্মীদের প্রতি ইঙ্গিত করে আন্টং বলেন, ‘আমরা অনুসারী হওয়ার চেষ্টা করছি। আল্লাহর অনুসারী।’

ধর্মীয় জীবনযাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠা—ক্রমবর্ধমান মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনে যে পরিবর্তন আসছে, তা প্রভাব ফেলছে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতেও। আবাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং পর্যন্ত সব কিছু ঢেলে সাজানোর চাহিদা তৈরি হয়েছে সমাজে। ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারে আন্টং ও তাঁর সহকর্মীদের যৌথভাবে ২০ মিলিয়ন অনুসারী রয়েছে। তারা ইন্দোনেশিয়ায় ‘হিজরি আন্দোলন’-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাদের লক্ষ্য হলো মূলধারার অর্থনীতিতে ইসলামী অর্থনীতিকে আরো বেশি জায়গা করে দেওয়া।

ইন্দোনেশিয়ার ২১৫ মিলিয়ন মুসলিম ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপন্থী। তারা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাববাদে বিশ্বাসী। তবে বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম সমাজে ধর্মীয় অনুরাগ বাড়ছে। অনেক কম্পানি ইসলামিক ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং শুরু করেছে। যেমন—রেস্তোরাঁগুলো হালাল সার্টিফিকেট গ্রহণ করছে, যার অর্থ তারা ইসলামী আইন মান্য করে চলছে। হাসপাতালে হালাল ওষুধ প্রয়োগের দাবি করছে। শ্যাম্পু কম্পানিগুলো বলছে তাদের পণ্য স্কার্ফ ব্যবহারকারীদের জন্য অধিক উপযোগী। এমনকি জাপানের কম্পানি ‘শার্প’ হালাল স্টিকারযুক্ত ফ্রিজ বিক্রি করছে।

নন-প্রফিট শরিয়াহ ইকোনমি সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ইদি সিতিয়াদি বলেন, ‘ধর্মপ্রবণ হয়ে ওঠা মানুষের বড় অংশই যুবক। তারা নিয়মিত উপার্জন করে এবং ইসলামী জীবনযাপনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে তাদের কার্পণ্য নেই। কত টাকা তারা ব্যয় করল, এটি নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। তারা চায় অন্তরের প্রশান্তি।’

জেনারেল সুহার্তের ৩২ বছরের শাসনামলে ইন্দোনেশিয়ার বেশির ভাগ ইসলামী গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান অবদমিত অবস্থায় ছিল। ১৯৯৮ সালে তাঁর পতন হলে ইসলামের পুনর্জাগরণ হয় সেখানে। সাংবিধানিকভাবে ইন্দোনেশিয়া এখনো ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও সর্বত্র ইসলামী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ছে দিন দিন। রাজনীতিতে মুসলিম ভোটারদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ইসলামপন্থী নেতা মারুফ আমিনকে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁর পুনর্নির্বাচনে মুসলিম ভোট নিশ্চিত করতেই তিনি সেটি করেছেন। মারুফ আমিন উলামা কাউন্সিল অব ইন্দোনেশিয়ার চেয়ারম্যান। তাঁর কাউন্সিলটি ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং ও হালাল সার্টিফিকেট প্রবর্তনের পক্ষে কাজ করছে। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ইসলামী অর্থনীতি প্রবর্তনে বিশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

রয়টার্সে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে ইন্দোনেশিয়ানরা হালাল খাবার, পর্যটন, ফ্যাশন ও প্রসাধনীতে ২০১৪ সালে ১৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে, যা ২০১৭ সালে ২১৯ বিলিয়নে উন্নীত হয়। জুন ২০১৯-এর হিসাব মতে, ইসলামী ব্যাংকের মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩৪.২৬ বিলিয়ন ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় ৪৮৬.৯ ট্রিলিয়ন রুপি। গত ৯ বছরের হিসাবে ইসলামী ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধির হার ৩০০ শতাংশ। ৫৮০ বিলিয়ন ডলারে মোট ব্যাংকিং মূলধনের ৬ শতাংশের মালিক ইসলামী ব্যাংকগুলো। হালাল খাবার, আধুনিক ফ্যাশন ও মুসলিমবান্ধব পর্যটন খাতের দ্রুত বিকাশ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ব্যাংক অব ইন্দোনেশিয়ার ডেপুটি গভর্নর দদি বুদি ওয়ালিউ।

তিনি বলেন, ‘ব্যাংক অব ইন্দোনেশিয়া শরিয়াহ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় উত্থান দেখতে পাচ্ছে। বিশেষত সার্টিফায়েড হালাল পণ্য ও হালাল লাইফস্টাইল খাতে।’ তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার জিডিপিতে শরিয়াহ অর্থনীতির অবদান নির্ণয়ের চেষ্টা করেছিল। তবে তা ৪০ শতাংশ হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি; যেমনটি কেউ কেউ দাবি করে।

ইন্দোনেশিয়ার কিছু আবাসন উন্নয়ন কম্পানি মুসলিমদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। যেমন—জাকার্তার অদূরে ‘আজ জিকরা’ প্রকল্প রয়েছে, যেখানে ৪০০ পরিবার বসবাস করতে পারবে; যাদের মুহাম্মদ (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলার সুযোগ দেওয়া হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে। এই প্রকল্পের কেন্দ্রে লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির অনুদানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। প্রকল্পের ভেতর তীর নিক্ষেপ ও ঘোড়দৌড়ের মতো ইসলাম অনুমোদিত খেলাধুলারও ব্যবস্থা রয়েছে।

২০১৪ সালে ইন্দোনেশিয়ান সরকার পণ্য হালাল কি না সেই লেবেল লাগানোর নির্দেশ দেয় কম্পানিগুলোকে। গত বছর সরকার এ ব্যাপারে একটি সময়সীমাও বেঁধে দেয়; যদিও সাত বছর ধরে উৎপাদকরা বলে আসছে, এতে পণ্যের উৎপাদন ও তা বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তবে এখন হালাল পণ্যের বাজারজাতকরণ অর্থনীতির মূলধারার অংশ। গত জুলাইয়ে জাকার্তায় হালাল পণ্যের প্রদর্শনী হয়। এতে কোরিয়ান কসমেটিকস কম্পানি এসওএস বিউটি নারীদের রঙিন হিজাবের অফার দেয়। প্রদর্শনীতে কম্পানির প্রতিনিধি লিসা মুসলিম নারীদের নামাজের আগে অজুর অঙ্গগুলো ঠিকঠাক ধোয়ার বিষয়ে নিশ্চিন্ত করতে এভাবে বোঝাচ্ছিলেন, ‘এটি আপনার লোপকূপগুলো বন্ধ করবে না। সুতরাং অজু করার সময় গোড়ায় পানি পৌঁছবে।’

জাকার্তার ১০ তলা জনপ্রিয় বিপণিকেন্দ্র তামরিন সিটিতে মুসলিম ফ্যাশনের স্টলগুলোর আয়তন দিন দিন বাড়ছে, যা আগে স্থানীয় পোশাক বিক্রেতাদের দখলে ছিল। এখানে আল ফেইথ নামে একটি দোকান চালান ইয়েসি। তিনি বলেন, ‘আগে শুধু ওড়না ও স্কার্ফ বেশি জনপ্রিয় ছিল। এখন পুরো মুখ ঢেকে রাখে এমন নিকাবের চাহিদা বেড়েছে। ফলে দাম ১.৪০ থেকে ১৪ ডলার হয়েছে।’

মিডিয়া কর্নেল ইন্দোনেশিয়া একটি তথ্য পরামর্শক কম্পানি। এর প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইল ফাহমি বলেন, ‘গত ৩০ দিনে হিজরি ও হালালের মতো শব্দগুলোকে সামাজিক মাধ্যমে পাঁচ হাজারেরও বেশিবার মেনশন করা হয়েছে। হয়তো কোনো ইসলামী বক্তব্যে বা কোনো পণ্য বাজারজাত করতে। মানুষের চাহিদা ও প্রবণতা ব্যতীত তা কিছুতেই সম্ভব নয়।’

 

২৭ আগস্ট ২০১৯ রয়টার্সে

প্রকাশিত গিয়াত্রি সুরোয়ো ও তাবিতা দাইয়েলার প্রতিবেদন অবলম্বনে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা