kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হিজরি নববর্ষ ১৪৪১

ইতিহাসের পথপরিক্রমায় হিজরি সন

মুফতি তাজুল ইসলাম   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



ইতিহাসের পথপরিক্রমায় হিজরি সন

তারিখ শব্দটি আরবি। এর প্রচলিত অর্থ ইতিহাস, বছরের নির্দিষ্ট দিনের হিসাব। আল্লামা ইবনে মানজুর (রহ.) তাঁর বিখ্যাত আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরবে’ লিখেছেন, তারিখ হলো—সময়কে নির্দিষ্ট করা, সময়ের চিত্র তুলে ধরা, সময়ের ঘটনাপ্রবাহকে শব্দবদ্ধ করা। আল্লামা আইনি (রহ.) লিখেছেন, সায়দাভি (রহ.) বলেছেন, ‘তারিখ’ শব্দটি ‘আরখুন’ থেকে উদ্ভূত; যার অর্থ নবজাতক, সদ্য প্রসূত শিশু। ইতিহাসের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য হলো নবজাতকের জন্মের মতো ইতিহাসও সৃজিত হয়, রচিত হয়। একের পর এক সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো ইতিহাসের ধারা চলমান, প্রবহমান।

কেউ কেউ বলেছেন, ‘তারিখ’ শব্দটি অনারবি। ‘মা’ ও ‘রোজ’ থেকে পরিবর্তন করে একে আরবিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এর অর্থ : দিন, মাস, বছরের হিসাব।

উল্লিখিত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সংখ্যা গণনা, হিসাব সংরক্ষণের সঙ্গে ইতিহাসের সখ্য অনেক গভীর। সন-তারিখ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনচরিত রচনা, সময়ের আলোচনা-পর্যালোচনা সন-তারিখ ছাড়া সম্ভব নয়। যদিও এটি ইতিহাস রচনার মূল উদ্দেশ্য নয়, তবু সন-তারিখ প্রথা ইতিহাসের অনুষঙ্গ হয়ে আছে সেই আদিকাল থেকে। ফলে ইতিহাস বোঝাতে ‘তারিখ’ শব্দটিকেই ব্যবহার করা হয়।

 

তারিখ গণনার সূচনা যেভাবে হলো

তারিখ গণনার সূচনা কিভাবে হলো, কবে থেকে হলো, বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্নভাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। ‘আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা’ গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে এসেছে—

ইসলাম আসার আগে আরবের সমষ্টিগত কোনো তারিখ ছিল না। সে সময় তারা প্রসিদ্ধ ঘটনা অবলম্বনে বছর, মাস গণনা করত। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তানরা কাবা শরিফ নির্মিত হওয়ার আগে তাঁর আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা অবলম্বনে তারিখ নির্ধারণ করত। কাবা শরিফ নির্মাণের পর তাঁরা বিক্ষিপ্ত হওয়া পর্যন্ত এর আলোকেই সাল গণনা করতেন। তারপর বনু ইসমাঈলের যারা হেজাজের তেহামা অঞ্চল থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যেত, তখন সেই গোত্র বেরিয়ে যাওয়ার দিন থেকে তারিখ গণনা করত। যারা তেহামাতে রয়ে যেত তারা বনি জায়েদ গোত্রের জুহাইনা, নাহদ ও সাদের চলে যাওয়ার দিন থেকে সাল গণনা করত। কাব বিন লুআইয়ের মৃত্যু পর্যন্ত এ ধারা চলমান ছিল। পরে তাঁর মৃত্যুর দিন থেকে নতুনভাবে সাল গণনা শুরু হয়। এটি চলতে থাকে হস্তী বাহিনীর ঘটনা পর্যন্ত। হজরত ওমর (রা.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করার আগ পর্যন্ত আরবে ‘হস্তীবর্ষ’ই প্রচলিত ছিল। (আল-কামেল লিইবনিল আসির : ১/৯)

বনু ইসমাঈল ছাড়া আরবের অন্য লোকেরা নিজেদের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে উপলক্ষ করে বর্ষ গণনা করত। যেমন—বাসুস, দাহেস, গাবরা, ইয়াওমু জি-কার, হরবুল ফুজ্জার ইত্যাদি ঐতিহাসিক যুদ্ধের দিন থেকে নতুন নতুন বর্ষ গণনার সূত্রপাত করত। এ তো গেল আরবদের সাল গণনার বর্ণনা। গোটা বিশ্বের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, পৃথিবীতে মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে বর্ষপঞ্জি গণনা শুরু করা হয়। আদি পিতা আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমনের দিন থেকে সাল গণনা শুরু। এ ধারা চলতে থাকে হজরত নুহ (আ.)-এর মহাপ্রলয় পর্যন্ত। এরপর মহাপ্রলয় থেকে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরি করা হয়। এটা চলতে থাকে ইবরাহিম (আ.) অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। এ বর্ষপঞ্জি চলতে থাকে ইউসুফ (আ.) মিসরে শাসনকর্তা নিযুক্ত হওয়া পর্যন্ত। সে ঘটনা থেকে শুরু হয় নতুন বর্ষ গণনা। এটি চলতে থাকে মুসা (আ.) মিসর ত্যাগের ঘটনা পর্যন্ত। সেটি চলতে থাকে দাউদ (আ.)-এর শাসনামল পর্যন্ত। সেটি চলতে থাকে সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বকাল পর্যন্ত। সেটি চলতে থাকে হজরত ঈসা (আ.)-এর যুগ পর্যন্ত। ঈসা (আ.)-এর জন্ম থেকে নতুন বর্ষ গণনা শুরু হয়। আরবের হিময়ার গোত্র তাবাবিয়াহ (ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিন) থেকে, প্রাচীন আরবের গাসসান গোত্র বাঁধ নির্মাণের দিন থেকে সাল গণনা করে। সানআ অধিবাসীরা হাবশিদের ইয়েমেন আক্রমণের দিন থেকে বর্ষ গণনা শুরু করে। তারপর তারা পারস্যদের জয়লাভের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাল গণনা করে। (আল-ইলান, লিস সাখাভি : ১৪৬-১৪৭)

পারসিকরা তাদের রাষ্ট্রনায়কদের চার স্তরে বিন্যস্ত করে সাল গণনা করত। রোমানরা পারসিকদের কাছে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত দারা ইবনে দারা নিহত হওয়ার দিন থেকে সাল গণনা করত। কিবতিরা মিসরের রানি কিলইয়ুবাতরাকে রুখতে বুখতে নছর কর্তৃক সাহায্য করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাল গণনা করত। ইহুদিরা বায়তুল মাকদিসে হামলা এবং এটি তাদের হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাকে উপলক্ষ করে বর্ষ গণনা করে। খ্রিস্টানরা হজরত ঈসা (আ.)-কে আসমানে উত্তোলনের ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে খ্রিস্টবর্ষ পালন করে। (আল মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা : ১০/২৮ ‘তারিখ’)

 

মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক হিজরত

হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের ইতিহাসেও সবচেয়ে তাৎপর্যবহ, সুদূরপ্রসারী ঘটনা এটি। জোসেফ হেল যথার্থই বলেছেন, Hijrat is the greatest Turning point in the Vistory History of Islam অর্থাৎ হিজরত ইসলামের গতিপথ পরিবর্তনকারী মহান ঘটনা। এটি দ্বিন ও মানবতার বৃহত্তম স্বার্থে ত্যাগ, বিসর্জনের এক সাহসী পদক্ষেপ।

হিজরত শব্দের আভিধানিক অর্থ ত্যাগ করা, বর্জন করা। আর পরিভাষায় হিজরত বলতে কোনো কারণে নিজের দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া।

মক্কার কাফিররা মুসলমান ও মুসলমানদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সামাজিকভাবে বয়কট করাসহ সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন করে ইসলামের আওয়াজ স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। অঙ্কুরেই ইসলাম নামের বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। হাতে গোনা যে কয়জন সাহাবি ঈমান এনেছিলেন, তাঁরা কেউই কাফিরদের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে রেহাই পাননি। কোনো কোনো সাহাবি দৈহিকভাবে এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যে ইতিহাসে এর নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দিয়ে, কখনো বা প্রচণ্ড উত্তপ্ত মরুভূমির পাথর-বালিতে টানাহেঁচড়া করে সাহাবিদের তারা অতিষ্ঠ করে তোলে। নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা দিন দিন চরম থেকে চরমতর হচ্ছিল। দৈহিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন খোদ মহানবী (সা.)। একপর্যায়ে মক্কার কাফিররা এই মহামানবকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুনভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বোনে।

জাতীয় সমস্যাবলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ও শলাপরামর্শ করার জন্য ‘দারুণ নদওয়া’ নামে মক্কার কাফিরদের একটি জায়গা নির্দিষ্ট ছিল। সেখানে প্রতিটি গোত্রের প্রধান ব্যক্তিরা জমায়েত হতো। শীর্ষস্থানীয় কাফিররা তাদের ‘দারুণ নদওয়া’ বা ‘মন্ত্রণাগৃহে’ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কর্মকৌশল ঠিক করতে পরামর্শসভার আয়োজন করে। কেউ কেউ পরামর্শ দিল, মুহাম্মদ (সা.)-কে শৃঙ্খলিত করে কোনো ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখা উচিত। কিন্তু অন্যরা মতামত দিল যে মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গী-সাথিরা হয়তো আমাদের কাছ থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং এর ফলে আমাদের পরাজয়ও ঘটতে পারে। তাই ওই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা হলো। কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিল, তাঁকে নির্বাসিত করা উচিত। কিন্তু তিনি যেখানে যাবেন, সেখানেই তাঁর অনুগামী বাড়তে থাকবে এবং আন্দোলনও যথারীতি সামনে অগ্রসর হবে—এ আশঙ্কায় ওই পরামর্শও নাকচ করা হলো। অবশেষে আবু জাহেল পরামর্শ দিল, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক মনোনীত করা হবে, তারা সবাই একসঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ওপর হামলা করবে এবং তাঁকে হত্যা করে ফেলবে। এর ফলে তাঁর রক্তপণ সব গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর সবার সঙ্গে একাকী লড়াই করা হাশিমি গোত্রের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না। এ অভিমত সবাই পছন্দ করল এবং শেষ পর্যন্ত এ কাজের জন্য একটি রাতও নির্দিষ্ট করা হলো। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, কাফিররা তোমাকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য কিংবা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করে। তারা চক্রান্ত করে; আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৩০)

কিন্তু তাদের সব পরিকল্পনা আল্লাহ নস্যাৎ করে দেন। রাতেই আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে এই চক্রান্তের কথা তাঁর রাসুলকে জানিয়ে দিলেন। হিজরতের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ বাড়িতে আপন চাচাতো ভাই হজরত আলী (রা.)-কে নিজ বিছানায় রেখে আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) মদিনার পথে রওনা হন। রওনা হওয়ার মুহূর্তে বাইতুল্লাহর দিকে করুণ দৃষ্টিতে নবীজি বলেন, ‘হে মক্কা! খোদার কসম, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শহর, আমার প্রতিপালকের কাছেও বেশি পছন্দের শহর তুমি। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনো বের হতাম না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৯২৫)

মদিনায় সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। মহানবী (সা.) সাহাবাদের হিজরতের দুই মাস পর রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার হিজরত করেন। হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আবু বকর (রা.) ও তাঁর গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা ও পথনির্দেশক আবদুল্লাহ ইবনে আরিকত দুয়ালিও ছিলেন। তিনি বায়আতে আকাবার তিন মাস পর ২৭ সফর বৃহস্পতিবার রওনা দেন। তিন দিন গোপন থাকার পর সোমবার প্রথম রবিউল আউয়াল আবার রওনা দেন। সোমবার ১২ রবিউল আউয়ালে তিনি কুবায় পৌঁছেন। ১৪ দিন থাকার পর মসজিদে কুবা প্রতিষ্ঠা করে তিনি মদিনায় দিনদুপুরে পৌঁছেন। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় যাওয়ার পর মক্কার দুর্বল ও অক্ষম ছাড়া সবার ওপর হিজরত করা ফরজ ছিল। এটি তখন ঈমানের শর্ত ছিল। এই হিজরতকে কেন্দ্র করেই হজরত উমর (রা.)-এর আমলে ১৭ হিজরিতে হিজরি সনের কার্যক্রম চালু হয়েছে।

 

হিজরি সন প্রচলনে ওমর (রা.)-এর অবদান

হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। কেন একটি নতুন সন গণনা প্রথা চালু করতে হলো—এ নিয়ে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। আল্লামা আইনির বিবরণ দেখুন : হিজরি সন প্রণয়নের কারণ নিয়ে মতবিরোধ আছে। ইবনে সমরকন্দি বলেন, হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে চিঠি লিখেছেন যে আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অনেক ফরমান আসে; কিন্তু তাতে তারিখ লেখা থাকে না। সুতরাং সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সন গণনার ব্যবস্থা করুন। তারপর ওমর (রা.) হিজরি সনের গোড়াপত্তন করেন। আল্লামা ইবনুল আসির (রহ.) ‘আল কামিল ফিত তারিখে’ এটিকে প্রসিদ্ধতম ও বিশুদ্ধতম অভিমত বলে আখ্যায়িত করেছেন। (আল কামিল ফিত তারিখ, খণ্ড ১, পৃ. ৮)

আল্লামা আইনি (রহ.) তারপর লিখেছেন, আবুল ইকজান বলেছেন, হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে একটি দলিল পেশ করা হয়, যেখানে শুধু শাবান মাসের কথা লেখা হয়। তিনি বলেন, এটি কোন শাবান! এ বছরের শাবান, নাকি আগামী বছরের শাবান? তারপর হিজরি সন প্রবর্তন করা হয়। ইতিহাসবিদ আল্লামা শিবলী নোমানি (রহ.) এ অভিমতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (আল ফারুক, পৃষ্ঠা ১৯৫)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন হজরত ওমর (রা.) সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি পরামর্শসভার আহ্বান করেন। সভায় হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত থেকে সন গণনার প্রস্তাব দেন। হজরত তালহা (রা.) নবুয়তের বছর থেকে সন গণনার অভিমত ব্যক্ত করেন। হজরত আলী (রা.) হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বর্ষ গণনার প্রস্তাব দেন। তারপর তাঁরা সবাই আলী (রা.)-এর প্রস্তাবে ঐকমত্য পোষণ করেন। এরপর কোন মাস থেকে শুরু হবে—এ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) রজব থেকে শুরু করার প্রস্তাব দেন। কেননা এটি চারটি সম্মানিত মাসের মধ্যে প্রথমে আসে। হজরত তালহা (রা.) রমজান থেকে শুরু করার কথা বলেন। কেননা এটি উম্মতের মাস। হজরত আলী (রা.) ও উসমান (রা.) মহররম থেকে শুরু করার পরামর্শ দেন। (উমদাতুল কারি : ১৭/৬৬)

 

বর্ষ গণনা হিজরত ও মহররম থেকে কেন?

বর্ষ গণনার ক্ষেত্রে হিজরতের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ কী? অথচ মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তিসহ আরো একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে সন গণনা শুরু করা যেত। এ প্রশ্নের উত্তর আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) এভাবে দিয়েছেন : সুহাইলি (রহ.) এ বিষয়ে রহস্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম সন গণনার বিষয়ে হিজরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন সুরা তাওবার ১০৮ নম্বর আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে। এই ‘প্রথম দিন’ ব্যাপক নয়। এটি রহস্যাবৃত। এটি সেই দিন, যেদিন ইসলামের বিশ্বজয়ের সূচনা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিরাপদে, নির্ভয়ে নিজ প্রভুর ইবাদত করেছেন। মসজিদে কোবার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। ফলে সেদিন থেকে সন গণনার বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম মতৈক্যে পৌঁছেছেন। (ফতহুল বারি : ৭/২৬৮)

তিনি আরো বলেছেন, মহানবী (সা.)-এর জন্ম, নবুয়ত, হিজরত ও ওফাত—এ চারটির মাধ্যমে সন গণনা করা যেত। কিন্তু জন্ম ও নবুয়তের সন নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য আছে, আর মৃত্যু শোকের স্মারক। তাই অগত্যা হিজরতের মাধ্যমেই সন গণনা শুরু করা হয়।

মহররম থেকে হিজরি সন গণনা শুরু করার কারণ হলো, আল্লামা সালমান মনসুরপুরি লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ৫৩ বছর বয়সে নবুয়তের চতুর্দশ বছর ৮ রবিউল আউয়াল, সোমবার কোবা নগরীতে অবতরণ করেছেন। ইংরেজি হিসাবে যা ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ সাল। (রহমাতুল্লিল আলামিন : ১/১০২)

মহানবী (সা.)-এর হিজরত হয়েছে রবিউল আউয়াল মাসে। তাহলে হিজরি বর্ষ মহররম মাস থেকে কেন শুরু করা হয়? এ প্রশ্নের জবাবে আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, অতঃপর তারা হিজরত থেকেই সন গণনা শুরু করল। আর মহররমকে প্রথম মাস হিসেবে স্বীকৃতি দিল। কেননা তৎকালীন আরবে মহররমই প্রথম মাস হিসেবে পরিচিত ছিল। জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে বিঘ্ন না হয়, সে জন্য এটিকে পরিবর্তন করা হয়নি। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৫১৩)

আল্লামা ইবনে হাজর (রহ.) লিখেছেন, রবিউল আউয়ালকে বাদ দিয়ে মহররম থেকে সন গণনা শুরু করা হয়েছে। কেননা হিজরতের সূচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে মহররম থেকে। আর আকাবার দ্বিতীয় শপথও হয়েছে মধ্য জিলহজে। আর আকাবার দ্বিতীয় শপথ হিজরতকে ত্বরান্বিত করে। আর এ ভগ্ন মাসের পর নতুন চাঁদ উদিত হয়েছে মহররম মাসে। তাই একে দিয়েই বছর গণনা শুরু করা হয়েছে। আমার জানামতে, এটি দৃঢ়তম অভিমত। (ফতহুল বারি : ৭/২৬৮)

আল্লামা শাওকানি (রহ.)-এর মতে, মাসগুলোর এই ধারাবাহিকতা আল্লাহ প্রদত্ত। তিনি লিখেছেন,

এ বিষয়ে আল্লামা বগভির বর্ণনাও অনুরূপ। (তাফসিরে বগভি : ২/৩৪৫, সুরা তাওবা : ৩৬ দ্রষ্টব্য)

 

চান্দ্রমাসের কিছু দুর্লভ তথ্য

আল্লামা রশিদ রেজা (রহ.) লিখেছেন, চান্দ্রমাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, শহরে-গ্রামে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত লোকজন স্বচক্ষে তা অবলোকন করতে পারে। এর জন্য ধর্মীয় কিংবা জাগতিক জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। সরকারেরও হস্তক্ষেপ চলে না এখানে। (তাফসিরে মানার : ১০/৩৫৮)

চান্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষ থেকে দ্রুত ফুরিয়ে যায়। উভয়ের মধ্যে ব্যবধান ১০.৮৯ দিন। প্রতি ৩৩ চান্দ্রবর্ষ ৩২  সৌরবর্ষের সমান। চান্দ্রবর্ষ বছরের সব ঋতুতে ঘূর্ণায়মান থাকে। এটি ৩২.৫ বছরে পূর্ণতা লাভ করে। কেউ ৩২-৩৩ বছর রোজা রাখলে বছরের সব ঋতুতে রোজা রাখার সুযোগ পায়।

আর হিজরি সন দিয়ে সর্বপ্রথম তারিখ লিখেছেন হজরত ইআলা বিন উমাইয়া (রা.) (উমদাতুল কারি : ১৭/৬৬)

আরবি বর্ষ ৩১ দিনের হয় না। আল্লামা মাগরিভি (রহ.) লিখেছেন, আরবি মাস লাগাতার চার মাস ৩০ দিন হতে পারে, এর বেশি নয়। আর ২৯ দিনে মাস হিসাবে চাঁদ একাধারে তিন মাস হতে পারে। (আল ইয়াওয়াকিতুল আসরিয়া : ১৪৯)

জাফর সাদিক (রহ.) থেকে বর্ণিত, কোনো রমজানের পঞ্চম তারিখ পরের রমজানের প্রথম তারিখ হয়। (প্রাগুক্ত : ১৪২)

১২০৫ সাল, ৬০০ হিজরিতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি (রহ.) বঙ্গ বিজয় করে হিজরি সন চালু করেন। ৯৬৩ হিজরি, ১৫৫৮ সালে সম্রাট আকবর ফসলি সন বা বঙ্গাব্দ চালু করা পর্যন্ত মোট ৩৬৩ বছর ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম হিজরি সন মোতাবেক পরিচালিত হয়।

 

চাঁদ ও সূর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইবাদত

চাঁদের অবস্থান ঐকমত্যভাবে প্রথম আসমানের নিচে। চাঁদ আর পৃথিবীর মাঝখানে দূরত্ব এক হিসাব মতে ৩৮ হাজার ৮৫০ মাইল। এই দূরত্ব পাড়ি দিতে যে সময় লাগার কথা সে সময়ে পুরো পৃথিবীকে ৯ বার ঘুরে আসা সম্ভব অথবা পৃথিবী আর চাঁদের মাঝখানের যে ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে ৩০টি পৃথিবীকে অনায়াসে ভরে রাখা যাবে। মনে রাখতে হবে, চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ।

চাঁদের হিসাব মতে, যদি ছয় চাঁদ ৩০ দিনে ও ছয় চাঁদ ২৯ দিনে হয়, তখন চান্দ্রবর্ষ ৩৫৪ দিনে হবে। সাধারণত চান্দ্রবর্ষ ৩৫৪ দিনেই হয়। আবার কখনো যদি সাত চাঁদ ৩০ দিনে ও পাঁচ চাঁদ ২৯ দিনে হয়ে থাকে, তখন চান্দ্রবর্ষ হবে ৩৫৫ দিনে। আবার কখনো যদি সাত চাঁদ ২৯ দিনে ও পাঁচ চাঁদ ৩০ দিনে হয়, তখন চান্দ্রবর্ষ হবে ৩৫৩ দিনে। (মাজমাউল আনহার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭০, জামেউর রুমুজ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪৭)

ইংরেজি বছরের মতো চান্দ্রবর্ষের লিপিয়ারের ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। একটি প্রচলিত কথা আছে যে দুই চাঁদ একসঙ্গে ৩০ দিনে হয় না এবং দুই চাঁদ একসঙ্গে ২৯ দিনেও হয় না—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ইবাদত হলো—১. নামাজ, ২. সাহরি, ৩. ইফতার ইত্যাদি।

চাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত ইবাদত হলো—১. তাকরিরে তাশরিক, ২. শবেবরাত, ৩. শবেমেরাজ, ৪. রোজা, ৫. শবেকদর, ৬. ঈদুল ফিতর, ৭. আরাফার দিনের রোজা, ৮. ঈদুল আজহা, ৯. আশুরার রোজা, ১০. রাসুল (সা.)-এর জন্মদিন, ১১. হজ পালন, ১২. নারীদের হায়েজ-নিফাসের মাসয়ালা, ১৩. ইদ্দত পালন, ১৪. তালাক দেওয়া ইত্যাদি।

 

হিজরি ক্যালেন্ডার ছাড়া অন্য ক্যালেন্ডার অনুসরণের বিধান

হিজরি সন মুসলমানদের সাল। মুসলমানদের উচিত এর অনুসরণ করা। এ ক্ষেত্রে উদাসীনতা কাম্য নয়। উম্মতের ওপর এর খোঁজখবর রাখা ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ কেউ কেউ এর খবরাখবর রাখলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সবাই যদি এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখায়, তাহলে প্রত্যেকেই গুনাহগার হবে। তবে প্রয়োজনে অন্য ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা অবৈধ নয়। বিশেষত খ্রিস্টাব্দ ও বঙ্গাব্দ বাংলাদেশে অনুসরণ করা হয়। এগুলোর অনুসরণে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা নেই। খ্রিস্টবর্ষ খ্রিস্টানদের হাতে প্রবর্তিত হয়েছে বলে একে হারাম বলার সুযোগ নেই। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সূর্য, চন্দ্র উভয়কে হিসাব-নিকাশ ও বর্ষ গণনার জন্য সৃষ্টি করেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি সূর্যকে উজ্জ্বল আলোকময় করেছেন। আর চন্দ্রকে করেছেন স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারী। তারপর এর জন্য মানজিল স্থির করেছেন, যাতে তোমরা বছরগুলোর সংখ্যা ও হিসাব জানতে পারো।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, সূর্যের উদয়-অস্তের মাধ্যমে দিবসকে জানা যায়। চাঁদের আসা-যাওয়ার মাধ্যমে মাস ও বছর চেনা যায়। (ইবনে কাসির : ৪/২১৭)

উল্লিখিত আয়াতের সমপর্যায়ের বক্তব্য দেখা যায় সুরা আনআমের ৯৬ নম্বর আয়াতে, সুরা রহমানের ৫ নম্বর আয়াতে এবং সুরা বনি ইসরাঈলের ১২ নম্বর আয়াতে। একই সঙ্গে এসব আয়াতের মাধ্যমে মহাকাশবিদ্যা অর্জনে উৎসাহিত করা হয়েছে।

সাধারণ লেনদেনের ক্ষেত্রে হিজরি সন ছাড়া অন্য সাল অনুসরণের বিষয়ে ফোকাহায়ে কেরামের অভিমত নিম্নরূপ : চার মাজহাব অনুসারেই ক্রেতা-বিক্রেতা যখন লেনদেনের ক্ষেত্রে হিজরি তারিখ ছাড়া অন্য তারিখ ব্যবহার করে তখন সময় নির্ধারণ সংক্রান্ত জটিলতা কেটে যাবে। বেচাকেনাও শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো, সে তারিখের ব্যবহার তাদের জানা থাকতে হবে। (আল মাউজুয়া : ১০/২৯)

তা ছাড়া ফিকাহশাস্ত্রের কিতাবগুলোতে পারসিকদের ব্যবহৃত দিবস ‘নাইরুজ’ ও ‘মেহেরজান’ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা এসেছে। এসবই হিজরি ক্যালেন্ডার ছাড়া অন্য ক্যালেন্ডার অনুসরণের বৈধতার প্রমাণ বহন করে।


 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা