kalerkantho

পরার্থপরতা মুসলিম সমাজের সৌন্দর্য

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা   

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পরার্থপরতা মুসলিম সমাজের সৌন্দর্য

স্বার্থচিন্তা সামাজিক অশান্তির অন্যতম কারণ। স্বার্থচিন্তা থেকে মানুষ অন্যের অধিকার নষ্ট করে। বিপরীতে পরার্থপরতা সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে। সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির পথ বন্ধ করে, শান্তি ও স্থিতির পথ সুগম করে। ইসলাম মানুষকে পরার্থপরতার শিক্ষা দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। পরার্থপরতাই একটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়, পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে। রাসুলে আকরাম (সা.) হিজরত করার পর মদিনায় যে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, তার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল পরার্থপরতা। ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দের এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই সহায়-শক্তিহীন নিঃস্বপ্রায় একটি সমাজ দ্রুততম সময়ে সমগ্র আরবের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। আল কোরআনে মহান আল্লাহ সাহাবিদের পরার্থপরতার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘যারা মুহাজিরদের আগমনের আগে মদিনায় বসবাস করছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, সে জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)

অগ্রাধিকারের বিষয়ে ইসলাম বাহ্যিক দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং তাকে ঈমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। যেন তা লৌকিকতাসর্বস্ব আচারে পরিণত না হয়ে মানুষের আত্মিক ও চারিত্রিক সৌন্দর্যে রূপ নেয়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৫)

হাফেজ ইবনে হাজার আস্কালানি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘ঈমানের দাবি হলো মুমিন অপর মুমিনের সার্বিক কল্যাণ কামনা করবে। এটা যেমন উপকারী লাভের ক্ষেত্রে, তেমনি অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রেও। ঠিক নিজের ব্যাপারে যেমনটি সে কামনা করে।’ (ফাতহুল বারি : ১/৭৪)

মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিদের জীবনচরিত পাঠ করলে পরার্থপরতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ তাঁকে বলেন, ‘হে আবু জর! তোমাকে আমার দুর্বল মনে হচ্ছে। আমি নিজের জন্য যা পছন্দ করি, তোমার জন্যও তা-ই পছন্দ করি। অবশ্যই যেন তুমি নেতৃত্ব গ্রহণ না করো এবং তুমি যেন এতিমের সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক না হও (প্রত্যাশা বা চাওয়া অর্থে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮২৬)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন, ‘আমি যখন কোরআনের কোনো আয়াত বিষয়ে কিছু জানি, তখন আমি প্রত্যাশা করি আমি যা জানি সবাই তা জানুক।’

মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসি (রহ.) একবার গাধা বিক্রি করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, তুমি এটা তোমার নিজের জন্য পছন্দ করবে? তিনি উত্তরে বললেন, আমি যদি নিজের জন্য এটা পছন্দ না করতাম, তবে তা বিক্রি করতাম না।

একটি বিষয়ে অবশ্যই লক্ষণীয়, তা হলো পরার্থপরতার অর্থ নিজে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া নয়। নিজেকে বা নিজের পরিবারকে কষ্টের ভেতর ফেলে অন্যের উপকার করার নির্দেশ ইসলাম দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে তেমনটিই বোঝা যায়। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সফরে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি কাফেলায় উপস্থিত হলো এবং ডানে-বাঁয়ে তাকাতে শুরু করল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তির কাছে দুপুরের খাবারের অতিরিক্ত কিছু আছে, সে যেন তা যার দুপুরের খাবার নেই তাকে দেয় এবং যার কাছে অতিরিক্ত পাথেয় আছে, সে যেন তা যার পাথেয় নেই তাকে দেয়।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন ধরনের জিনিসের কথা বললেন। এমনকি আমরা বুঝলাম অতিরিক্ত জিনিসে আমাদের কোনো অধিকার নেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩২৫৮)

হাদিসবিশারদরা উল্লিখিত হাদিসগুলোর সমন্বয়ে বলেন, পরার্থপরতা হবে মুমিনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। মুমিন অন্যকে অগ্রাধিকার দেবে। অন্যের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে তার সাধ্য অনুযায়ী। যদি কখনো সে সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়, তবে নিজের অপারগতার জন্য ব্যথিত হবে এবং তার ভাইয়ের কল্যাণের জন্য দোয়া করবে।

 

লেখক : সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিসি), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

 

 

মন্তব্য