kalerkantho

সন্ত্রাস মুসলমানের কাজ নয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্ত্রাস মুসলমানের কাজ নয়

দুনিয়াজুড়ে চলমান অশান্তি ও সন্ত্রাসবাদের মূলে লোভ-লালসা। এই লোভ-লালসা মানুষকে হায়েনা বানিয়ে তোলে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নিমেষে ধ্বংস করে দিতে পারে ছোট্ট একটি লালসার বারুদ। যার বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে হাজার হাজার মানুষ। মানুষের লোভের আবার প্রকারভেদ আছে। কারো সম্পদের লোভ, কারো ক্ষমতার লোভ, কারো নারীর লোভ, কারো মাদকের লোভ, কারো ঘুষের লোভ। যার প্রভাবে মানুষ মানুষকে হত্যা করে ফেলে। চুরি ডাকাতি ছিনতাই করে। কেউ রাষ্ট্রের গোপন তথ্য বিদেশে পাচার করে। আবার কেউ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার ঘৃণ্য কাজেও লিপ্ত হয়ে যায়। কেউ সামান্য কিছু টাকার জন্য এতিমের সম্পদও গ্রাস করে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার লোভে মিথ্যা অপবাদ চড়িয়ে দেয় অন্যের ঘাড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় উম্মতকে এ ধরনের সব ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে নবী (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবিরা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, ১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, ২. জাদু ৩. আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা, ৪. সুদ খাওয়া, ৫. এতিমের সম্পদ গ্রাস করা, ৬. রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ৭. সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মুমিনাদের অপবাদ দেওয়া। (বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)

পবিত্র কোরআনে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও খুনখারাবির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘কেউ যদি কাউকে হত্যা করে এবং তা অন্য কাউকে হত্যা করার কারণে কিংবা পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তারের কারণে না হয়, তবে সে যেন গোটা মানবতাকে হত্যা করল।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩২)

মহান আল্লাহর এই বাণী প্রমাণ করে যে যারা নিজেদের হীন স্বার্থে মানুষ হত্যা করে, রাষ্ট্রে ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তারা শুধু দেশ ও জাতিরই শত্রু নয় বরং গোটা মানবতার শত্রু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমানকে হত্যা করা পুরো দুনিয়া ধ্বংস করার নামান্তর।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৩৯৫)

যেসব সন্ত্রাসী হাজার হাজার মানুষকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় তাদের পাপের পরিমাণ কেমন হবে, তা এই হাদিস দ্বারা কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

তাই ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে নিজেদের মধ্যে মারামারি-হানাহানি, গুম, খুন, লুণ্ঠন করা কোনো মানুষের জন্যই শুভকর নয়। বরং এসব কর্মকাণ্ড নিজেদের ধ্বংস ও অনন্তকাল জাহান্নামের লাকড়ি হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। আর যে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন কিংবা জুলুমের বশবর্তী হয়ে এরূপ করবে, তাকে খুব শিগগিরই আগুনে দগ্ধ করব।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯-৩০)

তা ছাড়া মহানবী (সা.) নিজেদের মধ্যে পরস্পর হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হওয়াকে কুফরি বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার পরে তোমরা পরস্পরকে হত্যা করে কুফরির দিকে ফিরে যেও না।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৬৬৬৮)

গুম, খুন, সন্ত্রাস, বর্বরতা জাহেলি যুগের কাফিরদের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে প্রিয় উম্মতদের সতর্ক করেছেন। এ ধরনের কাজ মানুষের ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। যে ঈমান ছাড়া কারো মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না। মুমিন থাকা অবস্থায় কোনো চোর চুরি করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ মদ্যপান করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ হত্যা করে না।

ইকরিমা (রহ.) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর থেকে ঈমান কিভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়? তিনি বললেন, এভাবে। আর আঙুলগুলো পরস্পর জড়ালেন, এরপর আঙুলগুলো বের করলেন। যদি সে তাওবা করে তবে আগের অবস্থায় এভাবে ফিরে আসে। এই বলে আঙুলগুলো আবার পরস্পর জড়ালেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৯)

উপরোক্ত আয়াত ও হাদিসগুলো প্রমাণ করে, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। কোনো প্রকৃত মুসলমান সন্ত্রাস করতে পারে না। নিজেদের হীন স্বার্থে নিজেরা নিজেদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া কোনো মুসলমানের কাজ হতে পারে না। আহনাফ ইবনে কায়স (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (সিফফিনের যুদ্ধে) এক ব্যক্তিকে [আলী (রা.)-কে] সাহায্য করতে যাচ্ছিলাম। আবু বক্কর (রা.)-এর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি বলেন, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘আমি এ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে যাচ্ছি।’ তিনি বললেন, ‘ফিরে যাও। কারণ আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, দুজন মুসলমান তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হলে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে যাবে।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ হত্যাকারী (তো অপরাধী), কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি বললেন, ‘(নিশ্চয়ই) সেও তার সাথিকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১)

দুনিয়াতে কোনো সন্ত্রাসীই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। সবাইকেই একদিন মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। হিসাব দিতে হবে পুরো হায়াতের। ভোগ করতে হবে কৃতকর্মের শাস্তি। মানুষের কোনো কাজই আল্লাহর ইলমের বাইরে নয়। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত আল্লাহকে ভয় করা। ক্ষমতার বলে দুনিয়ার আদালত কারো কোনোভাবে পার পাওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর আদালত থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ নেই।

 

মন্তব্য