kalerkantho

হজের পর যেমন জীবন চাই

মো. আমিনুর রহমান

১৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হজের পর যেমন জীবন চাই

হজ ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। হজের মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার উপযোগী বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে। হজের আনুষ্ঠানিকতা ব্যক্তির মধ্যে তীব্র দায়িত্বানুভূতির সৃষ্টি করে এবং ঈমান বলিষ্ঠ করে। ফলে তিনি হজপূর্ব অবস্থার চেয়ে মুমিন হিসেবে অনেক বেশি কার্যক্রম চালাতে পারেন।

সাধারণভাবে মনে করা হয়, দুনিয়ার ঝামেলা মুক্ত হয়ে হজে যাওয়া দরকার। তাই অনেকে বৃদ্ধ বয়সে হজে যান। হজ থেকে এসে জগত্সংসারে সময় দিতে চান না। কেউ কেউ দুনিয়াবিমুখ হন। অনেকে হজ থেকে ফিরে এসে হালাল-হারাম বাছবিচার না করে আগের মতো চলতে থাকেন। হজের প্রস্তুতির আগে হজযাত্রী অবশ্যই ‘রাফাস’—অশ্লীলতা, ‘ফুসুক’—পাপাচার ও ‘জিদাল’—ঝগড়া-বিবাদ হতে পবিত্র থেকে ‘তাকওয়া’ অর্জনের অনুশীলন করবেন। (সূত্র-সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৭) তাকওয়াকে পাথেয় করে রওনা হবেন। হজে ‘মাবরুর’ (কবুল হজ)-এর জন্য যেমন তাকওয়ার প্রস্তুতি দরকার, তেমনি সফল হজযাত্রী হজ-পরবর্তী জীবনে সর্বাত্মকভাবে ইসলামের অনুসারী হবেন—এটাই স্বাভাবিক। ‘হাজি’ তকমা নিয়ে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০৩-২০৬) আমরা হজব্রত পালনের অন্যতম স্লোগান ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি নিয়ে একটু ভেবে নিই। ‘হাজির হে আল্লাহ, তোমার দুয়ারে হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, নিশ্চিতভাবে সব প্রশংসা তোমার, সব নিয়ামত তোমার থেকে, সার্বভৌমত্ব একান্তভাবে তোমারই এবং সব ধরনের শিরকি ও অপবিত্রতা থেকে তুমি বিমুক্ত।’

এভাবে আবেগজড়িত কণ্ঠে হজব্রত পালনকারী শিরকি, কুফরি সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে একান্তভাবে কোরআন-সুন্নাহর জীবনে ফিরে আসেন (তওবা করে) এবং আল্লাহর যেকোনো ডাকে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারে সদাপ্রস্তুত থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন।

হজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আরাফাতে অবস্থান, তাওয়াফে জিয়ারতসহ বাস্তব নিদর্শন এবং রাসুল (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত পূতপবিত্র স্থানগুলো প্রত্যক্ষ করার ফলে হাজিদের চিন্তাচেতনা, চরিত্র ও কর্ম এবং জীবন-বৈশিষ্ট্যে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে বাধ্য। শয়তানকে কঙ্কর মারার মাধ্যমে তাঁর মধ্যকার তাবৎ শয়তানি শক্তি দূর হয়। প্রসিদ্ধ হাদিসের ভাষায়, ‘হজ শেষে নিষ্পাপ শিশু হয়ে ফিরে আসেন।’ নিজেকে আল্লাহর রঙে রঙিন করে নেন। ‘আল্লাহর পরম স্নেহশীল’ বান্দায় পরিণত হন, যা মৃত্যুকাল পর্যন্ত কখনো মুছে যায় না।

সাফা-মারওয়ায় সায়ি তাঁর মনে দৃঢ় আশা এবং মহান আল্লাহর রহমতের শাশ্বত প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে। সায়ি স্মরণ করিয়ে দেয়, আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে প্রচুর চেষ্টা ও মেহনতের প্রয়োজন হয়। নিশ্চিন্তে বসে না থেকে ছোটাছুটি করলে আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়া যায়।

শয়তানের সর্বগ্রাসী আক্রমণের মোকাবেলার জন্য ঈমানদারদের পরম ধৈর্য ও বিশুদ্ধ নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে, কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীল মানুষের সঙ্গে থাকেন। (২:১৫৩) ইসলামের এ কার্যক্রম করতে গিয়ে বাতিল শক্তির মোকাবেলায় চূড়ান্তভাবে কিছু মুমিনকে জীবন বিসর্জন দিতে হতে পারে। (২:১৫৪) আল্লাহর রাস্তায় কার্যক্রমরত থাকা বাকিদের পরীক্ষা করা হবে ভয়ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার (কখনো) জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতি সাধন করে। (২:২৫৫) আর সত্যিকার মুমিনরা বিপদ-মুসিবতে আপতিত হলেও কোনো পরোয়া করে না; বরং তারা বলবে, আমরা তো আল্লাহরই জন্য আর নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁর দিকে ফিরে যাব। (২:১৫৬) এই পরীক্ষায় যারা টিকে থাকবে, সেই অটল বিশ্বাসীরা আল্লাহর সমগ্র অনুগ্রহ, রহমত ও হিদায়াত প্রাপ্ত। (২:১৫৭) এভাবে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ঈমানি পরীক্ষা পাসের অপূর্ব সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। অতঃপর ২:১৫৮ নম্বর আয়াতে সাফা-মারওয়া ‘সায়ি’কে জীবন্ত নিদর্শন বলা হয়েছে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা, শিশুপুত্র ইসমাঈল আর মা হাজেরার শুষ্ক মরুপ্রান্তরে ক্ষুধার জ্বালা, প্রাণনাশের আশঙ্কা নিয়ে কী পরীক্ষাই না দিতে হয়েছে! সাফা-মারওয়ার সায়ি প্রতিটি হাজি ও প্রতিটি ওমরাহকারীকে বর্তমানেও ২:১৫১-১৫৭ আয়াতে বর্ণিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে এবং ‘তাগুতি’ শক্তির মোকাবেলায় অগ্নিপরীক্ষায় টিকে থাকতে নির্দেশ দেয় এবং সাফল্যের সুসংবাদপ্রাপ্তিতে উৎসাহিত করে।

সায়ির নির্দেশসংক্রান্ত ২:১৫৮ আয়াতের পরবর্তী ২:১৫৯-১৬৩ আয়াতগুলোর সারসংক্ষেপ হচ্ছে, যারা আল্লাহর সুস্পষ্ট পথনির্দেশ গোপন করবে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত, ফেরেশতাদের অভিসম্পাত এবং মানুষের অভিসম্পাত! তারা চিরন্তনভাবে অভিশপ্ত জীবনে থাকবে, যার শাস্তি কখনো কম করা হবে না। কিন্তু যারা তওবা করে ২:১৫১-১৫২ আয়াতে বর্ণিত কার্যক্রমে ফিরে আসবে এবং নিজেকে সংশোধন করে সত্যকে সুস্পষ্টভাবে অন্যের কাছে তুলে ধরবে, তাদের তওবা কবুল করা হবে। আর আল্লাহ ছাড়া কোনো ‘ইলাহ’ বিধানদাতা নেই। যারা তাঁর হুকুম মেনে চলে, মহান আল্লাহ তাদের জন্য ‘রহমানুর রহিম’।

 

সম্মানিত হজযাত্রীগণ! এই আয়াতগুলো থেকে হজ-পরবর্তী জীবনচিত্র কী হবে তা অবশ্যই নির্ধারণ করতে সক্ষম হবেন, ইনশাআল্লাহ।

হজ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ প্রতিনিধি সম্মেলন। যেকোনো সম্মেলন থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মীরা উৎসাহিত হয়, তাদের করণীয় সঙ্গে করে নিয়ে আসে এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালায়। ফলে হজ থেকে ফিরে দুনিয়াবিমুখ হওয়া, পাপ কাজ করা হজের শিক্ষার পরিপন্থী। হজ-পরবর্তী জীবনে মৌলিক ইবাদত-বন্দেগি আরো মজবুতির সঙ্গে পালন করা দরকার। হজের জন্য হালাল সম্পদ বাঞ্ছনীয়, অন্যথায় হজ কবুল হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ পূতপবিত্র। তিনি পবিত্র সম্পদ ছাড়া অন্য কিছু কবুল করেন না।’ অতএব হজ-পরবর্তী সময়ে হারাম উপার্জন থেকে পবিত্র থেকে হালাল উপার্জন জরুরি। হজের পর মুসলিম সমাজে পরস্পরের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরিতে কাজ করা আবশ্যক। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিভ্রান্তি ও অনৈক্যের কারণগুলো হজের নিদর্শনের পরিপন্থী।

লেখক : এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

[email protected]

মন্তব্য