kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিদায় হজের ভাষণে মানবতার জয়গান

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদায় হজে রাসুল (সা.) তিনটি ভাষণ প্রদান করেছিলেন। এক. আরাফাতের ময়দানে। দুই. কোরবানির দিন—মিনায়। তিন. আইয়ামে তাশরিকের মধ্যবর্তী স্থান—মিনায়। ভাষণগুলোর মানবাধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব, ইনশাআল্লাহ।

 

সাম্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবৈষম্যহীন  সমাজ প্রতিষ্ঠা

ধর্ম, জাতি, বর্ণবৈষম্যের কারণে হারিয়ে যায় মানবিক মূল্যবোধ। শুরু হয় হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি। আজকের বিশ্বে তা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এসবের অবসানকল্পে মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের রব একজন। তোমাদের আদি পিতা একজন। প্রত্যেকেই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির তৈরি। আল্লাহ তাআলা পারস্পরিক পরিচিতির সুবিধার্থে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে তোমাদের বিভক্ত করেছেন। আরবের ওপর যেমন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি অনারবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই আরবের। একইভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের আর কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হলো তাকওয়া।’

 

দেশের প্রত্যেক নাগরিকের  নিরাপত্তা বিধান

পৃথিবীর সর্বত্র আজ হত্যা, লুণ্ঠন, ছিনতাই, সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। ভূলুণ্ঠিত মানবতা নিভৃতে কাঁদছে। মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) বলেন, ‘হে লোক সকল, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্মান, তোমাদের সম্পদ পরস্পরের জন্য চিরতরে হারাম করা হলো—যেমন আজকের এই দিন, এই মাস, এই শহরে রক্তপাত করা হারাম বা নিষিদ্ধ।’

 

ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক  বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা

বর্তমান সমাজে অপরাধী শক্তিশালী হওয়ার দরুন, ঘুষের বিনিময়ে অথবা স্বজনপ্রীতি করে নিরীহ ব্যক্তির ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আছে। ইসলাম এটিকে গর্হিত ও অন্যায় হিসেবে দেখেছে। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, ‘শুনে রাখো, অপরাধীর দায়িত্ব শুধুই তার ওপর বর্তাবে। পিতা তার পুত্রের জন্য আর পুত্র তার পিতার অপরাধের জন্য দায়ী নয়।’

 

নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক

নারীদের অধিকার রক্ষায় মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী, নারীদের প্রতি নির্মম ব্যবহার করার সময় তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা তাদের আল্লাহর জমিনে গ্রহণ করেছ এবং তাঁরই কলেমার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে তোমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জেনে রেখো, তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপর তাদেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং তাদের সার্বিক কল্যাণ সাধনের বিষয়ে তোমরা আমার অসিয়ত (অন্তিম উপদেশ) গ্রহণ করো।’

 

শ্রেষ্ঠতম শ্রমনীতি ঘোষণা

বর্তমান বিশ্বে শ্রমিক সমস্যা সবচেয়ে আলোচিত সমস্যা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাসুল (সা.) শ্রমনীতি ঘোষণা করেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে—এটিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শ্রমনীতি। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের অধীনদের সম্পর্কে সতর্ক হও। তারা তোমাদের ভাই। তোমরা নিজেরা যা খাও, তা তাদের খাওয়াবে। তোমরা নিজেরা যা পরিধান করো, তা তাদের পরিধান করাবে। তাদের ওপর সাধ্যাতিরিক্ত শ্রমের বোঝা চাপিয়ে দেবে না। যদি কোনো কারণে চাপিয়ে দিতে হয়, তবে তুমিও তাতে অংশীদার হও।’

 

সব বর্বরতা নিষিদ্ধ

মানবসভ্যতা, নৈতিকতাবিরোধী সব অপকর্ম, রক্তপাত, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষের আগুন পৃথিবী থেকে চিরতরে নির্বাপিত করার জন্য মহানবী (সা.) ঘোষণা দেন, ‘শুনে রাখো, জাহেলি ও বর্বর যুগের সব প্রথা আজ আমার পায়ের নিচে পদদলিত। জাহেলি যুগের রক্তের দাবিও আজ থেকে রহিত করা হলো।’

 

সুদবিহীন অর্থনীতি প্রণয়ন

পুঁজিবাদী সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার জাঁতাকলে পিষ্ট আজকের মানবসমাজ। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চিরতরে মূলোৎপাটন করে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহানবী (সা.) বলেন, ‘জাহেলি যুগের সুদব্যবস্থা রহিত করা হলো। এ পর্যায়ে সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা হজরত আব্বাসের সুদ মাফ করে দিলাম আর সেই সঙ্গে গোটা সুদব্যবস্থা আজ থেকে রহিত করা হলো।’

 

অন্যের অর্থ আত্মসাৎ নিষিদ্ধ

শক্তিমত্তা ও ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে কারো সম্পদ গ্রাস করা গর্হিত অপরাধ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না; সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না; সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না। আর কোনো মুসলমানের ধন-সম্পত্তি থেকে তার সম্মতি ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়।’

 

আদর্শিক দ্বন্দ্ব্বে পরমতসহিষ্ণু হতে হবে

প্রত্যেক জাতি ও ধর্মাবলম্বীর রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ। বহুধাবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় বহু দল-উপদল ও নানা মতের মানুষ থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংঘাত ও বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই। মহানবী (সা.) বলেন, ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও সংঘাতের পথ বেছে নিয়ো না। এই বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে।’

 

ভবিষ্যৎ আগত সমস্যার সমাধান

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আর রাসুল (সা.) হলেন শেষ নবী। তাই সমস্যাসংকুল পৃথিবীতে ইসলাম নিত্যনতুন যুগজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে পারে। তারই সমাধানকল্পে মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যত দিন তোমরা এ দুটি জিনিস আঁকড়ে থাকবে তত দিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটি বস্তু হলো আল্লাহর বাণী কোরআন ও রাসুলের সুন্নাহ বা হাদিস।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা