kalerkantho

গিলাফে মোড়ানো কাবার কথকতা

সৈয়দ আশফাক হাসান   

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গিলাফে মোড়ানো কাবার কথকতা

‘কিসওয়া’ পবিত্র কাবাঘরের আলোমণ্ডিত অংশ। বাংলাভাষীরা যাকে গিলাফ বলে। গিলাফ বললে সাধারণ কাবাঘরের কালো আচ্ছাদন বোঝানো হয়। কিন্তু এরও যে বিভিন্ন অংশ রয়েছে এবং প্রতিটি অংশের জন্য পৃথক নাম রয়েছে, তা অনেকেই জানে না। কাবার গিলাফ তৈরি, তা সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও পরিবর্তনকে যুগ যুগ ধরে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আল্লাহর নির্দেশে কাবাঘর নির্মাণের পর হজরত ইবরাহিম (আ.) ফিলিস্তিনে ফিরে যান। তাঁর সুযোগ্য সন্তান হজরত ইসমাঈল (আ.) ও তাঁর বংশধররা পরবর্তী সময়ে এই ঘরের সংরক্ষণ ও সেবার দায়িত্ব পালন করে।

কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, রাসুল (সা.)-এর পিতৃপুরুষ একজন আদনান এই সৌভাগ্যের অংশীদার হতে পেরেছিলেন। ইয়েমেনের তুব্বা গোত্রের অধিপতি কাবাঘরের দরজা ও তালা-চাবি নির্মাণ করে দেন। তিনি কিসওয়াও তৈরি করে দিতেন, যা আল-খাসাফ (এক ধরনের মোটা) কাপড় দিয়ে তৈরি হতো। পরবর্তী সময়ে আল-মোয়াফা, আল-মিলা ও আল-ওয়াসিল কাবাঘরকে চামড়া এবং অন্য কিছু দিয়ে আবৃত করার চেষ্টা করেন। তুব্বার পর আরো অনেক গোত্র এই দায়িত্ব পালন করে। তারা একে ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবেই তা করত। কিসওয়া যেহেতু পরিবর্তন করতে হতো, তাই কোনো এক গোত্রের পক্ষে এককভাবে এই দায়িত্ব পালন করা বেশ কষ্টকর ছিল। এ ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর চতুর্থ ঊর্ধ্বতন পুরুষ কুসাই বিন কিলাব অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি কোরাইশদের অন্তর্গত বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারকে কিসওয়ার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি সিদ্ধান্ত দেন কিসওয়া তৈরির খরচ সব গোত্রের লোক সমানভাবে প্রদান করবে। তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই কিসওয়া তৈরি হতো।

আবু রাবিয়া আবদুল্লাহ বিন আমর আল মাখজুমি নামে একজন ধনাঢ্য কুরাইশ ছিলেন। তিনি নিয়ম করলেন এক বছর তিনি একা কিসওয়া দেবেন এবং পরবর্তী বছর কোরাইশদের বাকি গোত্র মিলে কিসওয়া দেবে। এ জন্য তাঁকে ‘সমতুল্য’ বলে ডাকা হতো। কারণ তাঁর মহানুভবতা সমগ্র গোত্রের সমতুল্য ছিল।

যাঁরা কিসওয়া প্রদান করেছেন তাঁদের একজন নাতিলা বিনতে জানাব। রাসুল (সা.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ও আব্বাস (রা.)-এর মা। আব্বাস (রা.) হারিয়ে গেলে তিনি মানত করেন যে ছেলেকে ফিরে পেলে তিনি নিজ হাতে কাবার গিলাফ তৈরি করে দেবেন। আল্লাহর দয়ায় ছেলে ফিরে আসেন এবং তিনি তাঁর মানত পূরণ করেন। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র নারী, যিনি নিজ হাতে একাকী কাবার গিলাফ তৈরি করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কিসওয়া তৈরিতে ইয়েমেনি কাপড় ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে চার খলিফা মিসরীয় কাপড় ব্যবহার করেন। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত তা বলবৎ ছিল। বর্তমানে সৌদি আরবেই এই কিসওয়া বানানো হয়।

কিসওয়া পাঁচ ধাপে বানানো হয়। প্রথমে কাঁচা রেশম উপাদানকে সাবান মিশ্রিত গরম পানিতে ২৪ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখা হয়। এতে রেশমের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। এরপর তা কালো অথবা সবুজ রঙে ডোবানো হয়। তা নির্ভর করে কোন পাশের বা কাবার কোন অংশের কিসওয়া তার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে সেলাইয়ের জন্য যে সুতা ব্যবহার করা হবে, তা-ও এতে দেওয়া হয়, যাতে কাপড় ও সুতার রং একই হয়। কাপড় ও সুতা প্রস্তুত হওয়ার পর শুরু হয় বুননের কাজ। প্রথম দিকে পুরোটাই হাতে বোনা হতো। তবে বর্তমানে এই অংশটুকু মেশিনের সাহায্যে বোনা হয়। হাতের কাজটুকু শেষাংশে থাকে।

হাতের কাজ শেষ হওয়ার পর কাপড়ের ওপর পবিত্র কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি প্রিন্ট করা হয়। চতুর্থ অংশটিই হচ্ছে সবচেয়ে দীর্ঘ আর কষ্টকর। এই ধাপে এসে সব লেখা সোনা-রুপা মিশ্রিত সুতা দিয়ে লেখা হয়। প্রথমে হলুদ ও সাদা সুতা দিয়ে ‘লেখার অংশের ভিত্তি’ তৈরি করা হয়। এর ওপর সোনা-রুপার তার বা সুতা দিয়ে একে আবৃত করা হয়। কাপড় থেকে এর উচ্চতা প্রায় দুই সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। আর এ জন্যই এটি মেশিনের সাহায্যে করা সম্ভব নয়। এরপর বিভিন্ন অংশ জোড়া দেওয়া হয়।

প্রতিবছর কিসওয়া তৈরিতে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এতে ৬৭০ কেজি বিশুদ্ধ সিল্ক, ৭২০ কেজি রং ও এসিড ব্যবহার করা হয়। কিসওয়ার ৪৭টি অংশ আলাদাভাবে তৈরি হয়ে থাকে। একেক অংশ ১৪ মিটার লম্বা ও ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া হয়ে থাকে। পুরো কিসওয়ার ক্ষেত্রফল ৬৫০ বর্গমিটার। প্রতি পাশে সুরা ইখলাস স্বর্ণাক্ষরে খচিত থাকে। বাকি আয়াতের অংশগুলো তার নিচে বোনা হয়। প্রায় ১২০ কেজি সোনা-রুপা ব্যবহার করা হয়। সোনা-রুপার মিশ্রণের অনুপাত ৪ঃ১।

একটি কিসওয়া তৈরি করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। তৈরি হওয়ার পর (হজের এক মাস আগেই) কাবার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবারের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়। পুরনো কিসওয়াটি ছোট ছোট অংশে কেটে বিভিন্ন দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। রাসুল (সা.)-এর আমল থেকেই এটি এভাবে বণ্টিত হয়ে আসছে।

এটি ১৫৬৬-৭৪ শতকের একটি হিজাম। হিজাম হলো কাবার ওপর দিকের একটি চওড়া বেল্ট, যা সাধারণত প্রায় ২১ ফুট দীর্ঘ। কাবাঘরের চারপাশেই তা থাকে। এটি রুপা ও রুপার প্রলেপ দেওয়া তারের সাহায্যে তৈরি করা হয়। প্রথম দিকে এটি আলাদাই তৈরি হতো এবং এই অংশে কোনো পরিবর্তন হতো না। ষোলো শতকে এই হিজামের লাল অংশে লেখা আছে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের নাম, যিনি এটি প্রদান করেছিলেন। মাঝের কালো অংশে সুরা আলে ইমরানের একটি আয়াত লেখা আছে। এর অর্থ ‘মানবজাতির প্রথম গৃহ, যা সবার জন্য দেওয়া হয়েছে।’

সাধারণত কাবার চার কোণে থাকে। উনিশ শতকে এই অংশকে অনেকে ‘সামাদিয়া’ বলত। কারণ এতে ‘আল্লাহু সামাদ’ খচিত থাকত। অনেকে এই অংশকে কারদাশিয়া নামেও অভিহিত করত।

উনিশ শতকে তৈরি মাকামে ইবরাহিমের আচ্ছাদনের একাংশ, যদিও বর্তমানে মাকামে ইবরাহিম সম্পূর্ণ কাচ ও সোনা দিয়ে তৈরি ঘর দিয়ে ঢাকা। তবে আগে জায়গাটি এমন কাপড়েই ঢাকা থাকত। এতে কোরআনের আয়াতের পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর বংশক্রম পাওয়া যায়। হজরত হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখিত।

একে সিরাত বা বুরুক বলা হয়। এটি শরিফের দরজার আচ্ছাদন। মাঝের কালো চৌকোনা ঘরে উসমানীয় সুলতান আবদুল মজিদের (১৮৩৯-৬১) নাম রয়েছে। এটি দারুল কিসওয়া, মিসরে তৈরি।

কাবার দরজার ভেতরের অংশের আচ্ছাদন। এটি সবুজ রেশমের তৈরি; যার ওপর লাল আর সোনালি সুতার কারুকাজ। লেখা থেকে জানা যায়, এটি সুলতান আবদুল্লাহর (১৮৭৬-১৯০৯) আদেশে উসমানীয় গভর্নর আব্বাস হিলমি খেদিভ (১৮৭৪-১৯৩১) কর্তৃক প্রদানকৃত।

 

 

মন্তব্য