kalerkantho

কোরবানির সূচনা ও নির্দেশনা

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কোরবানির সূচনা ও নির্দেশনা

‘কোরবানি’ শব্দটি আরবি কুরবুন শব্দ থেকে গঠিত। এর অর্থ নৈকট্য লাভ করা, নিকটবর্তী হওয়া, কাছে যাওয়া, ঘনিষ্ঠ হওয়া; যে কাজের মাধ্যমে বান্দা স্বীয় প্রভুর নিকটবর্তী হয় এবং তাঁর নৈকট্যতা অর্জিত হয়, তাকে কোরবানি বলে।

 

কোরবানির সূচনা

কোরবানির সূচনা করেন হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল ও কাবিল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর তাদের আদমের দুই পুত্রের কাহিনি শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কোরবানি করল, একজনের কোরবানি কবুল হলো, অপরজনের কোরবানি কবুল হলো না।’ (সুরা : আল মায়েদা, আয়াত : ২৭)

যখন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও বংশবিস্তার শুরু হয় তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা—এরূপ যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। এরূপে ৪০ জোড়া সন্তান মা হাওয়া (আ.) প্রসব করেন। আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে এক গর্ভের পুত্রের সঙ্গে অন্য গর্ভের কন্যার বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। অন্য কোনো মানুষ না থাকায় এটিই ছিল শরয়ি বিধান। এ প্রথা ও নীতি অনুযায়ী হজরত আদম (আ.) বিয়ের বয়সে উপনীত হলে হাবিলের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন কাবিলের সঙ্গে জন্মগ্রহণ করা কন্যা আকলিমার সঙ্গে। আকলিমা ছিলেন পরমা সুন্দরী। আর কাবিলের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করলেন হাবিলের সঙ্গে জন্মগ্রহণ করা কন্যার সঙ্গে। তিনি ছিলেন সুশ্রী ও কদাকার। কিন্তু কাবিল এ বিয়েতে সম্মত হলেন না। তখন হজরত আদম (আ.) উভয়কে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যার কোরবানি গৃহীত হবে সে-ই আকলিমার পাণি গ্রহণ করবে।’ তৎকালে কোরবানি গৃহীত হওয়ার নিদর্শন ছিল আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে কোরবানিকে ভস্মীভূত করা। হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি কোরবানি করলেন। কাবিল কৃষিকাজ করতেন। তিনি কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কোরবানি করার জন্য পেশ করলেন। আল্লাহ তাআলা হাবিলের কোরবানি কবুল করলেন। আকাশ থেকে একখণ্ড আগুন এসে হাবিলের কোরবানি জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু কাবিলের কোরবানিকে আগুন স্পর্শই করেনি।

সর্বযুগে কোরবানি

সব নবী-রাসুলের যুগে কোরবানির প্রচলন ছিল। তবে রীতিনীতি ছিল ভিন্নতর। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানির নিয়ম নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা (জীবিকা হিসেবে) আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৪)

নামাজের সঙ্গে কোরবানির নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে নামাজের  সঙ্গে কোরবানির নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন, ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ুন ও কোরবানি করুন। আরো ইরশাদ করেন, হে রাসুল! আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি এবং আমার জীবন-মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬২)

আল্লাহ প্রেমের অনুপম নিদর্শন

নবী-রাসুলদের মধ্যে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্থান শীর্ষে। তাঁর উপনাম আবুল আম্বিয়া—নবীদের আদি পিতা, আবুল মিল্লাত—মুসলমানদের জাতির পিতা। সাতজন ছাড়া সব নবী-রাসুল তাঁর বংশ থেকে এসেছেন। তিনিই মুসলমান নামটি প্রথম রেখেছেন। ইবরাহিম শব্দটি সুরিয়ানি শব্দ। অর্থ আবে রাহিম—দয়ালু পিতা। শিশুদের প্রতি দয়ালু ছিলেন বলে এ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। জান্নাতে তিনি ও তাঁর স্ত্রী সারা মুমিনদের অপ্রাপ্ত বয়সে মৃত শিশুদের দায়িত্বশীল হবেন। (তাফসিরে কুরতুবি : প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৭৩)

দয়াময় আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় একই সময়ে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে ফিলিস্তিনে ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় নবী করে প্রেরণ করেন। একই সময় তাঁর ভাই হারানের পুত্র লুত (আ.)-কে জর্দান ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নবী করে প্রেরণ করেন। লুত (আ.)-এর জাতি তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেনি, বরং তারা নানা রকম অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা কয়েকজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাঁরা লুত (আ.)-কে তাঁর কওমের শাস্তির সংবাদ দিয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে গমন করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বয়স তখন ৮৬ বছর। তাঁর কোনো সন্তান না থাকায় সদা আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করতেন, ‘হে আমার রব! আমাকে কোনো নেক সন্তান দান করুন।’ (সুরা : আস-সাফফাত, আয়াত : ১০০) আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করে ফেরেশতাদের অবহিত করলেন যে তোমার একটি সন্তান হবে। যেমন আল্লাহর বাণী : ‘অতঃপর আমি তাঁকে এক ধৈর্যশীল পুত্রসন্তানের সুসংবাদ দান করলাম।’ (সুরা : আস-সাফফাত, আয়াত : ১০১) বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে পুত্রসন্তান দান করেন। তাঁর নাম রাখেন ইসমাঈল। পিতৃ-মাতৃস্নেহে ইসমাঈল (আ.) ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন। তখনই আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে পরীক্ষা করার ইচ্ছা করেন, ‘সে কি তার পুত্রকে বেশি ভালোবাসে, নাকি আমাকে ভালোবাসে।’

হজরত ইবরাহিম (আ.) ক্রমাগত তিন রাত স্বপ্নে দেখেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আদেশ হচ্ছে, ‘তুমি ওই পাহাড়ে যাও এবং তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানি করো।’ হজরত ইবরাহিম (আ.) উট কোরবানি করলেন; কিন্তু তার পরও একই স্বপ্ন দেখছেন, ‘তোমার প্রিয় জিনিস কোরবানি করো।’ অতঃপর তিনি বুঝতে পারলেন যে আল্লাহ তাআলা আমার ছেলেকেই কোরবানি করতে বলছেন। নবীদের স্বপ্নও অহি। তাই তিনি পুত্রকে কোরবানি করার ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। আল্লাহ তাআলা ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেন, ‘অতঃপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন পিতা তাকে বলল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বলো? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আমাকে আপনি ধৈর্যশীল পাবেন। অতঃপর যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম স্বীয় পুত্রকে জবেহ করার জন্য কাত করে শায়িত করল এবং তখনই আমি তাকে উদ্দেশ করে বললাম, হে ইবরাহিম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যি পালন করেছ। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা।’ (সুরা : আস-সাফফাত, আয়াত : ১০২-১০৭)

এ ধরায় কি এমন কোনো পিতা আছেন, যিনি তাঁর হৃদয়ের ধন পুত্রকে নিজ হাতে জবেহ করতে পারেন? কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর প্রেমে এতই উদ্বুদ্ধ ও পাগলপারা ছিলেন যে কঠিনতর আদেশ স্বেচ্ছায় হাসিমুখে বরণ করে নিতে ত্রুটি করেননি। তাঁর এ স্মৃতি চার হাজার বছর পরও বহাল রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে।

 

কোরবানির শিক্ষা

কোরবানির শিক্ষা হলো অন্যায়, অবিচার ও আল্লাহ তাআলার মর্জির পরিপন্থী সব কার্যকলাপ পরিহার করা এবং তাঁর নির্দেশ পালনে সচেষ্ট হওয়া। তাঁর নির্দেশ পালনকে সব কিছুর ওপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেওয়া। তাঁর নির্দেশের সামনে সব কিছুকে তুচ্ছ মনে করা। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তিনি স্নেহের পুত্রকে কোরবানি করতে একটুও দ্বিধা বোধ করেননি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.) কোরবান হওয়ার জন্য অকুণ্ঠচিত্তে রাজি হয়ে গিয়েছেন। পিতা-পুত্র নজির স্থাপন করেছেন কিভাবে স্রষ্টাকে ভালোবাসতে হয় এবং কিভাবে স্রষ্টার নির্দেশ পালন করতে হয়। পিতা-পুত্রের এই ভালোবাসা ও ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন এবং তাঁদের স্মৃতিকে মুসলমানদের জন্য আবশ্যিক করে দিয়েছেন। অবশ্যই হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.) আল্লাহ-প্রেমিকদের উত্তম আদর্শ।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেন

মন্তব্য