kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

মশা প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা

মুহাম্মদ সাইদুর রহমান

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মশা প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা

বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এডিস মশা বা ডেঙ্গু জীবাণুবাহী মশা। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে এ জীবাণু। অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এ বছরের মাত্রাটা বেশি। হাসপাতালগুলোতে ১৫ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি আছে। মারাও গেছে বেশ কয়েকজন। ছাত্র, শিক্ষক, ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, মেডিক্যালের ডাক্তারসহ বিভিন্ন পেশাজীবী এ জীবাণুতে আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত নতুনভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। সেবাদানে হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন। প্রশাসনিকভাবে মশা মারার কাজ চলছে। দিন যত যাচ্ছে, আতঙ্ক বেড়েই চলছে।

মহান আল্লাহর অসংখ্য সৃষ্ট জীবের একটি হলো এই ছোট মশা। আল্লাহপাক কোরআনে এই ছোট মশাকে উপমা হিসেবে পেশ করেছেন। যাঁরা মুমিন তাঁরা মহান পালনকর্তার উপমাকে সঠিক ও নির্ভুল হিসেবে বিশ্বাস করেন। আর অবিশ্বাসীরা এ উপমা উপস্থাপনে আল্লাহর ইচ্ছা খুঁজে পায় না। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহপাক নিঃসন্দেহে মশা বা তদূর্ধ্ব বস্তু দ্বারা উপমা পেশ করতে লজ্জা বোধ করেন না। বস্তুত যাঁরা মুমিন তাঁরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেন যে তাঁদের পালনকর্তা কর্তৃক উপস্থাপিত এ উপমা সম্পূর্ণ সত্য। আর যারা কাফির তারা বলে, এমন উপমা উপস্থাপনে আল্লাহর উদ্দেশ্যই বা কী ছিল। এর দ্বারা আল্লাহ অনেককে বিপথগামী করেন আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শন করেন। তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা পাপাচারী ছাড়া অন্য কাউকে বিপথগামী করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬)

মশা যে কত ভয়ানক, তা আমরা ইতিহাসের সত্য ঘটনা থেকে জানতে পারি। নমরুদের অনুসারীরা প্রতিনিয়ত প্রতিমাপূজা করত। হজরত ইবরাহিম (আ.) প্রতিমাপূজা অস্বীকার করেন এবং প্রতিমাগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন। এ কারণে নমরুদের আদেশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। নমরুদ নিজেকে খোদা দাবি করে এবং ইবরাহিম (আ.) যে মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেন, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। নমরুদ ও তার বাহিনী মহান আল্লাহকে মারার জন্য আকাশে তীর নিক্ষেপ করে। আল্লাহপাক সামান্য এক মশাবাহিনী দিয়ে নমরুদ ও তার বাহিনীকে শায়েস্তা করেন। একটি মশা নমরুদের নাকে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে কামড় দিতে থাকে। যন্ত্রণা নিরসন করতে পাদুকা দিয়ে বারবার মাথায় আঘাত করে। আবারও মশা বেশি মাত্রায় কামড়াতে থাকলে আঘাত করতে করতে স্বেচ্ছাচারী অবিশ্বাসী কাফির সামান্য এ মশার কামড়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

আমরা ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য ব্যক্তিগত সিকিউরিটি বাড়াই। কিন্তু মশা এমন এক ভয়াবহ জীব, যা থেকে কোনো ধরনের সিকিউরিটির মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার সহজ কোনো উপায় নেই। মাত্র এক সেকেন্ডের একটিমাত্র মশার কামড়ই হতে পারে মৃত্যুর কারণ।

মহান আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন যারা সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। মানবকল্যাণের একমাত্র দিশারি মহাগ্রন্থ কোরআন মজিদে এ মর্মে বলা হয়েছে, ‘আর আল্লাহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন লোকদের ভালোবাসেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১০৮)।

হাদিসেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলা হয়েছে। হজরত আবু মালেক আশয়ারি (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম) কোরআনে কারিম ও রাসুল (সা.)-এর হাদিস অনুসরণ করে আমরা প্রত্যেকে সচেতনতার সঙ্গে আমাদের থাকার জায়গা, অফিস কক্ষ, চলার পথ ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে যেভাবে ইসলামের নির্দেশিত পথে পরিচালিত হতে পারব, ঠিক তেমনি এ জীবাণুবাহী মশার আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারব। চারপাশের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে আমাদের ভূমিকা রাখতে হবে, ঠিক তেমনি পরিশুদ্ধ রাখতে হবে আমাদের নৈতিক চরিত্র। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে পরিশুদ্ধি না থাকলে ডেঙ্গুর মতো নাশকতা অশান্তি বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুণ। ইসলামে যেভাবে বাহ্যিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলা হয়েছে, ঠিক তেমনি আত্মার পরিশুদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সে-ই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।’ (সুরা আশ-শামস, আয়াত : ৯-১০)

এডিস মশা বা ডেঙ্গু জিবাণুবাহী মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে যারা ভর্তি আছে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত রক্তের ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব। রোগীর সেবায় আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সেবার ব্যাপারে হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, হে আদমসন্তান আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে যাওনি। বান্দা বলবে, আপনি তো বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, আমি আপনাকে কিভাবে দেখতে পারি! আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তাকে দেখতে গেলে আমাকে পেতে।’ (মুসলিম)

ডেঙ্গু জীবাণুবাহী মশার ব্যাপারে দেশের গণমানুষকে সচেতন করতে হবে। ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমামরা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররা সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশাসনিকভাবে বছরব্যাপী মশা নিধনের কাজ চালানো যেতে পারে। আমাদের পার্শ্ববর্তী শহরগুলো, বিশেষ করে কলকাতা, চায়না, বেইজিং যে পদ্ধতিতে সফল হয়েছে, সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। যারা অসুস্থ আছে, তাদের শুশ্রূষার পাশাপাশি সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। সুস্থ শরীর ও উন্নত জীবনের জন্য পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি বাড়াতে হবে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। আল্লাহপাক আমাদের এ ধরনের অসুস্থতা থেকে দ্রুত মুক্তি দান করুন। আমিন।

লেখক : ব্যাংকার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা