kalerkantho

ভীতিকর স্বপ্ন দেখলে করণীয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভীতিকর স্বপ্ন দেখলে করণীয়

স্বপ্ন মানুষের ওই মানসিক অবস্থাকে বলে, যার মাধ্যমে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবচেতনভাবে অনুভব করে থাকে। কিন্তু ঘটনাগুলো কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় বাস্তব বলেই মনে হয়। বেশির ভাগ সময় দ্রষ্টা নিজে সেই ঘটনায় অংশগ্রহণ করছে বলে মনে করতে থাকে। কখনো কখনো পুরনো অভিজ্ঞতার টুকরা টুকরা স্মৃতি কল্পনায় বিভিন্নভাবে জুড়ে ও পরিবর্তিত হয়ে সম্ভব-অসম্ভব সব ঘটনার রূপ নেয়। স্বপ্ন সম্বন্ধে অনেক দর্শন, বিজ্ঞান, কাহিনি ইত্যাদি আছে।

কারো মতে এটি মানসিক চাপ থেকে আসে। কেউ বলে, শারীরিক ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটলে সে অনুযায়ী স্বপ্নরা কল্পনায় ভেসে ওঠে। কেউ ভাবে, সারা দিন মনে যা কল্পনা করে তার প্রভাবে রাতে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন আধুনিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি বিষয়। আবার অনেকে স্বপ্ন না দেখেও বলে এটি আমার স্বপ্ন ছিল। অথবা আমার জীবনের স্বপ্ন এ রকম ছিল না। মানে, মনের আশা, পরিকল্পনা। তাই স্বপ্নের অর্থ এখানে রূপক।

তবে সব ভীত্তিহীন বলে স্বপ্ন উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কিছু স্বপ্নের মাহাত্ম্য রয়েছে। কখনো কখনো স্বপ্নের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিভিন্ন সুসংবাদ দিয়ে থাকেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসুলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে সত্যে পরিণত করে দিয়েছেন। তোমরা ইনশাআল্লাহ নিরাপদে তোমাদের মাথা মুণ্ডন করে এবং চুল ছেঁটে নির্ভয়ে আল-মাসজিদুল হারামে অবশ্যই প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ জেনেছেন যা তোমরা জানতে না। সুতরাং এ ছাড়া তিনি দিলেন এক নিকটবর্তী বিজয়।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত : ২৭)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, সময় যখন কাছাকাছি হবে তখন মুসলিমের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না এবং যে যত সত্যবাদী হবে তার স্বপ্নও তত সত্য হবে। স্বপ্ন তিন প্রকার—

(ক) উত্তম স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ।

(খ) ভীতিপ্রদ স্বপ্ন, যা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।

(গ) যা মানুষ চিন্তা-ভাবনা ও ধারণা অনুপাতে দেখে থাকে।

যে ব্যক্তি কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখবে, তার উচিত ঘুম থেকে জেগে নামাজ আদায় করা এবং ওই স্বপ্ন সম্বন্ধে কারো সঙ্গে আলাপ না করা। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আমি স্বপ্নে পায়ে শিকল লাগানো দেখতে পাওয়াকে পছন্দ করি, তবে গলায় শিকল লাগানো দেখাকে অপছন্দ করি। স্বপ্নে শিকল দেখার তাৎপর্য হলো, দ্বিনের ওপর অবিচল থাকা। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) বলেন, ‘সময় যখন কাছাকাছি হবে’ অর্থাৎ যখন রাত ও দিনের দৈর্ঘ্য সমান হবে।” (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০১৯)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে ও খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯৯৫)

ভালো স্বপ্ন যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, তাই সে ক্ষেত্রে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কিন্তু খারাপ/ভীতিকর স্বপ্ন দেখলে আমরা ভীষণ চিন্তায় পড়ে যাই। মনোবল হারিয়ে ফেলি। কিন্তু এতে ভয় না পেয়ে কিছু আমলের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। নিচে হাদিসের আলোকে তেমন কিছু করণীয় আমল তুলে ধরা হলো—

বাঁ দিকে তিনবার থুতু ফেলা

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কেউ যদি এমন কিছু দেখে, যা সে অপছন্দ করে, সে যেন বাঁ দিকে তিনবার থুতু ফেলে এবং শয়তান থেকে আশ্রয় চায়। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না। আর শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯৯৫)

অর্থাৎ কেউ যদি স্বপ্নযোগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেন, তবে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কেই দেখেছেন।

আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া

উপরোক্ত হাদিসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বাঁ দিকে তিনবার থুতু ফেলার পাশাপাশি মহান আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার হুকুম দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৯৯৫) কোনো কোনো হাদিসে তিনবার আশ্রয় চাওয়ার কথাও উল্লেখ আছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯০৯)

পাশ পরিবর্তন করে শোয়া

ঘুমের মধ্যে কোনো খারাপ/ভীতিকর স্বপ্ন দেখলে দিক পরিবর্তন করে শোবার হুকুমও দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। হজরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। অতএব তোমাদের কেউ স্বপ্নে অপছন্দনীয় কিছু দেখলে সে যেন তার বাঁ দিকে তিনবার থুতু ফেলে, আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে তিনবার আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং যে পাশে শোয়া ছিল তা পরিবর্তন করে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯০৯)

ঘুম থেকে জেগে নামাজ পড়া

ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলে ঘুম থেকে জেগে নামাজে লিপ্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০১৯)

স্বপ্নটি গোপন রাখা

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে লোক স্বপ্নযোগে আমাকে দেখল, সে নিশ্চয়ই আমাকে (স্বপ্নে) দেখল। কারণ শয়তানের পক্ষে আমার আকৃতি ধারণ করা অসম্ভব।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খারাপ স্বপ্ন দেখে সে যেন ঘুমের মধ্যে তার সঙ্গে শয়তানের চক্রান্তের সংবাদ কাউকে না দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৮১৬)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা