kalerkantho

চীনের সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি?

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



চীনের সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি?

পৃথিবীর প্রাচীন সভ্য জনপদ বলে পরিচিত একটি দেশ চীন। ইসলামের উষালগ্নেও বিদ্যা অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাওয়ার নির্দেশনার বাণী সর্বজনবিদিত। সেই সূত্রে তৎকালীন কিছু ধর্ম প্রচারক জ্ঞানপিপাসু চীনের পথে অগ্রসর হওয়ার ইতিহাসও বহুল প্রচারিত একটি বিষয়। আর এরই ক্রমধারায় চীনের মুসলিম কর্মতৎপরতার অনুসন্ধানে দেখা যায় যে চীনের শানসি প্রদেশের রাজধানী জিয়ান, যা চীনের ইতিহাসে প্রাচীনতম চারটি নগরীর একটি। চীনাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই জিয়ান নগরী ছিল একসময় মুসলমানদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যে ভরপুর। তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো জিয়ান নগরীর প্রাচীনতম মসজিদ জিয়ান গ্রেট মসজিদ, যাকে ইংরেজিতে

The Great Mosque of Xi’an  বলা হয়; যাতে এখনো সেখানকার ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায় দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ নানা সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সমবেত হয়ে থাকে। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই চিনের ইতিহাসে প্রথম মসজিদ, যা মহানবী (সা.)-এর তিরোধানের এক শতাব্দী পরই খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে ৭৪২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছিল। [তথ্যসূত্র : Liu, Zhiping (1985). Zhongguo Yisilanjiao jianzhu [Islamic architecture in China]

এই বিস্ময়কর স্থাপনা এখন চীনের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও স্বীকৃত, যদিও বর্তমানে চীনে ৩৯ হাজারের বেশি মসজিদ রয়েছে; যার ২৫ হাজারই অবস্থিত জিনজিয়াং প্রদেশে আর বাকিগুলো রয়েছে সারা দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। [তথ্যসূত্র :Chinese Youth Daily, 2009-07-17]

বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এই মসজিদ ঘিরে রয়েছে পাঁচটি বিশাল চত্বর। গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি সুবিশাল দৃষ্টিনন্দন ভবন; যার সর্বমোট আয়তন প্রায় ১২ হাজার স্কয়ার মিটার।

চীনের মুসলিম সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন এই মসজিদ জিয়ান নগরীর ৩০ হুয়াজো লেনে[30 Huajue Lane] অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনতা একে হুয়াজো মসজিদ বলে সম্বোধন করে থাকে। আবার কেউ কেউ একে Great Eastern Mosque নামেও সম্বোধন করে থাকে। [তথ্যসূত্র :Egyptian Journal of Archaeological and Restoration Studies ‘EJARS’.] ঐতিহাসিক এই স্থাপনা ১৯৫৬ সালে শানসি প্রদেশ কর্তৃপক্ষ তাদের ঐতিহাসিক ও প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনস্বরূপ

Historical and Cultural Site Protected at the Shaanxi Province Level  সংরক্ষণের ঘোষণা দেয়। পরে ১৯৮৮ সালে চীনারা জাতীয়ভাবে একে Major Historical and Cultural Site Protected at the National Level হিসেবে ঘোষণা দেয়।

বর্তমানে মসজিদটির পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন আঙিনার প্রতিটিতে রয়েছে একটি করে স্মৃতিলিপি ফলক; যাতে মসজিদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিবরণ রয়েছে। মসজিদের নানা প্রান্তে রয়েছে চায়না ও আরবি ভাষায় নানা শিলালিপি ও ক্যালিগ্রাফি।

মসজিদটির মৌলিক আদি ভবন ছয়টি স্তম্ভের ওপর নির্মিত। এতে স্থাপন করা হয়েছিল পাঁচটি দরজা। মসজিদের চারপাশে রয়েছে পাথরের দেয়াল আর তাতে নানা ধরনের প্রস্তর ও কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে অঙ্কিত করা হয়েছে চায়নিজ আর অ্যারাবিক ভাষার ক্যালিগ্রাফি। সামগ্রিকভাবে মসজিদটির স্থাপত্যরূপ চীনের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে ইসলামিক কারুকার্যকে সংমিশ্রণ করে এক অসাধারণ শৈল্পিক রূপ দান করেছে, যা বিশ্বময় প্রাচীন সভ্যতার সন্ধানপিয়াসি মানুষের আগ্রহ আর চিত্তাকর্ষণের প্রধান কারণ। মসজিদের তৃতীয় আঙিনায় রয়েছে

‘Examining the Heart Tower’ নামের একটি চমকপ্রদ টাওয়ার, যা একসময় মসজিদের মিনার হিসেবে ব্যবহৃত হতো; যেখান থেকে প্রতিনিয়ত  পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য ভেসে আসত সুমধুর আজানের ধ্বনি, যদিও বর্তমানে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় টাওয়ারটি মিনার বা আজানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না। [তথ্যসূত্র : China’s Earliest Mosques, Journal of the Society of Architectural Historians, 67]

লেখক : পরিচালক, তামিরুল উম্মাহ মহিলা মাদরাসা, ভাটারা, ঢাকা

 

মন্তব্য