kalerkantho

পুরো সম্পদের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয়

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পুরো সম্পদের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয়

আবু দাহদাহ সাবেত বিন দাহদাহ (রা.)-এর এক বিস্ময়কর ঘটনা আছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে এসেছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মদিনার আনসারের এক এতিম কিশোরের একটি বাগান ছিল। বাগানটি অন্য লোকের বাগানের সঙ্গে লাগানো ছিল। সীমানা দেওয়ার জন্য ছেলেটি একটি দেয়াল নির্মাণ করতে চাইল। কিন্তু দেয়াল দিতে গিয়ে একটি খেজুরগাছ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তখন কিশোর ওই লোকের কাছে যায়। তাকে বলে, আপনার বাগানে অনেক খেজুরগাছ আছে। এই গাছটি আমাকে দিলে আপনার কোনো সমস্যা হবে না। গাছটি আপনার; কিন্তু তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছটি আমার হলে দেয়াল সোজা করে উত্তোলন করা যাবে। তাই আপনি তা আমাকে দিয়ে দিন। সে বলল, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে খেজুরগাছ দিতে পারব না। ছেলেটি বলল, গাছটি আমাকে দিলে আপনার কোনো সমস্যা নেই। নতুবা তা আমার কাছে বিক্রি করুন। সে বলল, আমি এর কিছুই করতে পারব না। ছেলেটি বলল, তাহলে দেয়াল সোজা করে উত্তোলন করব না? সে বলল, এটা তোমার বিষয়। আমি তা জানি না।

এতিম কিশোর রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার বাগান অমুকের বাগানের পাশে। আমি বাগানের মাঝে একটি দেয়াল দিতে শুরু করি। মাঝখানে একটি খেজুরগাছ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেয়াল সোজা রাখতে চাইলে এটি আমার অংশে রাখতে হবে। কিন্তু এটি আমার পাশের লোকের। আমি তার কাছে এটি চেয়েছি। কিন্তু সে তা দিতে চাচ্ছে না। হে আল্লাহর রাসুল, আপনি একটু সুপারিশ করুন, যেন সে তা দিয়ে দেয়।

রাসুল (সা.) বললেন, তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে আসো। ছেলেটি সেই লোকের কাছে গিয়ে বলে, রাসুল (সা.) আপনাকে ডাকছেন। সে এলে রাসুল (সা.) তাকে বললেন, এই ছেলের বাগানের পাশে তোমার বাগান। সে চাচ্ছে, সীমানার জন্য একটি দেয়াল করবে। কিন্তু তোমার খেজুরগাছ দেয়ালের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লোকটি বলল, হ্যাঁ। রাসুল (সা.) বলেন, খেজুরগাছটি তোমার ভাইকে দিয়ে দাও। সে বলল, না, আমি পারব না। রাসুল (সা.) আবার বলেন, খেজুরগাছটি তোমার ভাইকে দিয়ে দাও। সে বলল, না, আমি পারব না। রাসুল (সা.) আবার বলেন, খেজুরগাছটি তোমার ভাইকে দিয়ে দাও। এর পরিবর্তে জান্নাতে তোমার জন্য একটি খেজুরগাছ থাকবে। তখনও সে বলল, না, আমি পারব না।

আল্লাহর রাসুল (সা.) এর চেয়ে বেশি কী বলবেন? উপস্থিত সাহাবিদের মাঝে আবু দাহদাহ (রা.)-ও ছিলেন। তিনি ভাবলেন যে দুনিয়ার এই খেজুরগাছ একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ তার বিনিময়ে আখিরাতে একটি খেজুরগাছ পাওয়া যাচ্ছে। আর জান্নাতের ‘তুবা’ খেজুরগাছের ছায়ায় ১০০ বছর ঘোড়া নিয়ে চললেও এর পথ শেষ হওয়ার মতো নয়। আবু দাহদাহ (রা.) এ কথা শুনে কালবিলম্ব না করে বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি তার খেজুরগাছটি ক্রয় করে তাকে দিই, তাহলে আমার জন্যও কি জান্নাতে খেজুরগাছ হবে? রাসুুল (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ। তোমার জন্যও হবে।’

আবু দাহদাহ (রা.) চিন্তা করতে থাকলেন, কোন সম্পদ দিলে খেজুরগাছের মালিক তা বিক্রি করতে আগ্রহী হবে। আর সেই এতিমকে তা দান করে জান্নাত লাভ করবেন। তখন মনে হলো, ৬০০ খেজুরগাছবিশিষ্ট তাঁর বিশাল একটি খেজুরবাগান আছে। মদিনার ব্যবসায়ীরা সর্বদা তা পাওয়ার আশা করে থাকে। সেখানে বেশ কয়েকটি কূপ ও ঘরবাড়িও আছে।

আবু দাহদাহ (রা.) বললেন, হে খেজুরগাছওয়ালা, তুমি কী চাও? আমার অমুক স্থানের বাগানটি চেনো? সে বলল, হ্যাঁ, চিনি। তুমি আমার পুরো বাগান নিয়ে যাও। আমাকে শুধু তোমার এ খেজুরগাছটি দাও।

তুমি আমার খেজুর বাগান কূপ ও বাড়িসহ নিয়ে যাও। বিনিময়ে আমাকে শুধু তোমার খেজুরগাছ দেবে। লোকটি আবু দাহদাহের দিকে তাকাল। আবার চারদিকের মানুষের দিকেও তাকাল। তারা সবাই ক্রয়-বিক্রয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে। অতঃপর সে বলল, হ্যাঁ, ঠিক আছে। আমি তোমাকে খেজুর বাগানের বিনিময়ে আমার খেজুরগাছটি দিলাম।

আবু দাহদাহ (রা.) এতিমের তাকিয়ে বললেন, হে অমুক, খেজুরগাছটি আমার পক্ষ থেকে তোমাকে দিলাম। তুমি এখন চলে যাও। অতঃপর আল্লাহর রাসুলের দিকে ফিরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এখন কি জান্নাতে আমার একটি খেজুরগাছ হয়েছে? রাসুল (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে আবু দাহদাহর ফলবান কত খেজুুরগাছ দেখছি! জান্নাতে আবু দাহদাহর ফলবান কত খেজুুরগাছ দেখছি!’

হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) একবার, দুইবার, তিনবার নয়, বরং অসংখ্যবার এ কথা বলতে থাকেন। এ কথা শুনে আবু দাহদাহ (রা.) বের হয়ে যান।

ক্রয়-বিক্রয় শেষ করে আবু দাহদাহ (রা.) তাঁর বাগানে যান। কেউ কিছু বিক্রি করলে বিক্রির সংশ্লিষ্ট বাটি, পোশাক বা এজাতীয় কিছু থাকে। তাই তিনি সেগুলো বের করতে চাইলেন। বাগানের দরজার কাছে এলে তাঁর সন্তানদের সঙ্গে স্ত্রীর খেলার আওয়াজ পান। তিনি এখন বাগানে প্রবেশ করবেন। কিন্তু তাঁর মন এ দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। তাই তিনি ভাবলেন, বাইরে থেকে ঘোষণা দেবেন। বলবেন, তোমরা বের হয়ে আসো। আমাদের কোনো বাগান নেই। অনেক বছর ধরে ধন-সম্পদ জমা করে বসবাসের জন্য আমরা যে বাগান ক্রয় করেছি, তা চোখের পলকে আমাদের কাছ থেকে নেই হয়ে গেছে।

তিনি বিশাল বাগান থেকে তাঁর সন্তানদের বের করে দেবেন, তা সহ্য করতে পারছেন না। দরজায় টোকা দিলেন। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেন না। বাগানের বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, হে উম্মে দাহদাহ, হে উম্মে দাহদাহ।

উম্মে দাহদাহ একটু বিস্মিত হলেন। আজ আবু দাহাদাহ ঢুকছেন না কেন? এটি তো আবু দাহদাহর বাগান। তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন।

তখন আবু দাহদাহ বললেন, তোমরা বের হয়ে আসো।

স্ত্রী বললেন, আমরা বাগান থেকে বের হয়ে আসব?

আবু দাহদাহ বললেন, হ্যাঁ। আমি বাগান বিক্রি করে দিয়েছি।

স্ত্রী বললেন, কার কাছে বিক্রি করেছেন?

আবু দাহদাহ বললেন, জান্নাতের একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে আমার রবের কাছে বিক্রি করেছি।

স্ত্রী বললেন, আল্লাহু আকবার! আবু দাহদাহ, তোমার এ বেচাবিক্রি খুুবই লাভজনক হয়েছে। আবু দাহদাহ, আপনার এ বেচাবিক্রি খুুবই লাভজনক হয়েছে।

অতঃপর স্ত্রী তাঁর সন্তানদের বের করতে লাগলেন। তাদের দরজার কাছে নিয়ে যান। তাদের পকেট চেক করে সঙ্গে থাকা খেজুরগুলো বাগানে ছুড়ে ফেলেন। আর বলতে থাকেন, এগুলো আমাদের না। এগুলো আল্লাহ তাআলার। ছোট্ট ছেলেটি ক্ষুধার তাড়নায় একটি খেজুর নিয়ে মুখে দেয়। ভেবেছিল বাইরে গিয়ে খাবে। কিন্তু তার মা তাকে দাঁড় করিয়ে মুখ থেকে খেজুর বের করে ফেলে দেন। আর বলতে থাকেন, এগুলো আমাদের না, এগুলো আল্লাহ তাআলার। অতঃপর তাঁরা বাগান থেকে বের হয়ে পড়েন।

হ্যাঁ, আবু দাহদাহ ও উম্মে দাহদাহ সন্তানদের নিয়ে বের হয়ে পড়েন। বাগানের পত্রপল্লবিত বৃক্ষরাজি, ফলফলাদি ও সুশীতল ছায়ায় ঘেরা জীবন ফেলে রেখে দুনিয়ার কষ্টকর-সংকীর্ণ জীবন যাপন গ্রহণ করেন। আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতা পরিহার করে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হন। দুনিয়ার দুঃখ-কষ্টের জীবন আল্লাহর আনুগত্যে কাটিয়ে দেন। এভাবে আবু দাহদাহ, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা দুনিয়ার সব মোহ ত্যাগ করে। বিনিময়ে তারা জান্নাতের পালঙ্কে হেলান দিয়ে একসঙ্গে বসবে। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায়, ‘জান্নাতবাসীরা হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকবে। স্ত্রীদের সঙ্গে তারা পালঙ্কে হেলান দিয়ে থাকবে। সেখানে তাদের জন্য ফলফলাদি ও তারা যা চাইবে তা থাকবে। দয়াময় রবের পক্ষ থেকে তাদের জন্য সালাম বর্ষিত হবে।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৫৫-৫৮)

তারা এর চেয়ে আরো বেশি নিয়ামতের মধ্যে থাকবে। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় এসেছে, ‘মুত্তাকিরা জান্নাতের বাগিচায় বিচরণ করবে। রবের প্রদত্ত নিয়ামত তারা ভোগ করবে এবং তিনিই তাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করবেন। (আল্লাহ তাআলা বলবেন) তোমরা কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ স্বাচ্ছন্দ্যে পানাহার করতে থাকো। তারা শ্রেণিবদ্ধ সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে এবং আমি তাদের আয়তলোচনা হুরদের সঙ্গে তাদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করব। যারা ঈমানদার এবং যাদের সন্তানরা ইমান এনে তাদের অনুসরণ করবে আমি তাদেরকে তাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে একত্র করে দেব এবং তাদের আমলের সামান্যতমও হ্রাস করা হবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ কর্মের জন্য দায়ী থাকবে। আমি তাদের চাহিদা অনুযায়ী ফল ও গোশত প্রদান করব। তারা একে অপরকে পানপাত্র দেবে, তখন কোনো অনর্থক কথাবার্তা ও পাপাচারমূলক কাজ হবে না। সুরক্ষিত মোতির মতো কিশোররা তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। তারা মুখোমুখি হয়ে পরস্পর কথা বলবে। তারা বলবে, আমরা ইতিপূর্বে পরিবারের কাছে অবস্থানকালে খুব ভীত ছিলাম। অতঃপর  আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা ইতিপূর্বে আল্লাহকে ডেকেছি, তিনি খুব কৃতজ্ঞ ও পরম দয়ালু। (সুুরা আত-তুর, আয়াত : ১৭-২৮)

 

 

মন্তব্য