kalerkantho

কখন অন্তরের অসুখ হয়

আতাউর রহমান খসরু   

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কখন অন্তরের অসুখ হয়

পাপ বলতে অনেকেই শুধু শারীরিক পাপকেই বোঝে। তারা আরো ভয়ংকর পাপের ব্যাপারে উদাসীন। তা হলো, অন্তরের পাপ বা অপরাধ। শায়খুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘সমাজের অনেক মানুষই অপরাধ বলতে শুধু ব্যভিচার, চুরি ও অত্যাচারকে বোঝে। এবং এসব কাজে লিপ্ত হওয়াকেই তারা গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখে। অথচ পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ এসব অপরাধে লিপ্ত নয়। সমাজের নিম্ন ও অশিক্ষিত শ্রেণির মানুষও চুরি ও ব্যভিচার থেকে বিরত থাকে। বেশির ভাগ মানুষ যে অপরাধে লিপ্ত তা হলো, আত্মার ব্যাধি বা অন্তরের পাপ। পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে অন্তরের পাপগুলো যথা—ঈমানহীনতা, অহংকার, হিংসা, প্রদর্শন, মোহ, দাম্ভিকতার মতো অপরাধই বেশি দায়ী।

শারীরিক অপরাধের চেয়ে আত্মার পাপ ও ব্যাধি ব্যক্তির জন্য অধিক ভয়ংকর। এ জন্য আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামি (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘আল জাওয়াজির আন ইকতিরাফিল কাবায়ির’-এ শারীরিকভাবে সংঘটিত কবিরা গুনাহর (বড় পাপ) আলোচনার আগে আত্মিকভাবে সংঘটিত কবিরা গুনাহর আলোচনা এনেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘প্রথম অধ্যায় আত্মিক কবিরা গুনাহ ও এ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। আমি অধ্যায়টি প্রথমে এনেছি কারণ হলো, সহজতার কারণে তাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ লিপ্ত হয়। অথচ তারা বিষয়টিকে হালকা করে দেখে। খুব সামান্যসংখ্যক মানুষ এ বিষয়ে সচেতন।’ কোনো কোনো বুজুর্গ বলেন, অন্তরের কবিরা গুনাহ বাহ্যিক কবিরা গুনাহ থেকে ভয়ংকর। কেননা তা মানুষকে অবিচার ও প্রকাশ্য পাপাচারের পথে ধাবিত করে। অন্তরের কবিরা গুনাহ ব্যক্তির নেক আমল ধ্বংস করে এবং কঠিন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

আল্লামা ইবনে কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘অন্তরের হারাম কাজগুলো ব্যভিচার, মদপান বা এজাতীয় নিষিদ্ধ কাজের চেয়ে বেশি হারাম। কেননা তাতে মানবাত্মা রোগাগ্রস্ত হয়। আর অন্তরের রোগ শরীরের রোগের চেয়ে ক্ষতিকর।’

তিনি অন্তরের ব্যাধিকে দুই ভাগে ভাগ করেন। এক. কুফর ও কুফর সমতুল্য। যেমন—সংশয়, নিফাক, শিরক ইত্যাদি। ব্যক্তি এমন অপরাধে লিপ্ত হলে তার জন্য তওবা করার পাশাপাশি ঈমান নবায়ন করা আবশ্যক। দুই. এমন অপরাধ, যা কুফরির পর্যায়ের নয়। দ্বিতীয় প্রকারের অপরাধ আবার দুই প্রকার। ক. কবিরা, খ. সগিরা।

কবিরা : কবিরা অর্থ বড়। কবিরা গুনাহ মানে বড় পাপ। মানুষ আত্মিকভাবে যেসব অপরাধ করে তার কোনো কোনোটির ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কঠোরভাবে তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘আত্মমুগ্ধতা, অহংকার, দাম্ভিকতা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া, হিংসা, বিদ্বেষ, মুসলমানের কষ্টে সন্তোষ প্রকাশ, অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করা, অন্যের অকল্যাণ চাওয়া ইত্যাদি। এজাতীয় অপরাধের পরিণতি কোনো অংশেই ব্যভিচার ও মদপানের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। এমন পাপ বা অপরাধ থেকে সর্বদা বিরত থাকতে হবে। কোনোভাবে তা সংঘটিত হয়ে গেলে অবশ্যই তওবা করতে হবে। দ্রুত ফিরে আসার প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। কেননা মানুষের অন্তর যখন রোগাক্রান্ত হয় তখন দেহও রোগাক্রান্ত হয়। অন্তরের ব্যাধির ব্যাপারে অসচেতনতা মানুষকে ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শিরকে আসগর (ছোট শিরক) রিয়া বা প্রদর্শন নিয়ে আমি তোমাদের ব্যাপারে যতটা ভয় পাচ্ছি, অন্য কোনো বিষয়ে এতটা ভয় পাচ্ছি না।’ (মুসনাদে আহমদ)

সগিরা : অন্তরের সগিরা গুনাহ হলো, পাপের প্রতি আসক্তি। যেমন—কোনো ব্যক্তি হারাম কাজে লিপ্ত হলো না; কিন্তু তার ভেতর হারামে লিপ্ত হওয়ার প্রবল ইচ্ছা বিদ্যমান। তবে কুফরের প্রতি আসক্তি বা কুফরি কাজ করার প্রবল আগ্রহ কুফরিতুল্য এবং হারাম। যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও হারাম কাজ পরিহার করে, তবে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হবে। আর যদি অপারগতাবশত বিরত থাকে, তবে আল্লাহর কাছে এ জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

কোরআন ও হাদিসের একাধিক স্থানে অন্তরের ব্যাধির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? মূলত আল্লাহর পাকড়াও থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই নিশ্চিত হতে পারে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৯৯)

আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়ার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে ভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই নিরাশ হয়ে থাকে।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৫৬)

মানুষের ব্যাপারে ধারণা পোষণ আল্লাহর কাছে নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক পরিমাণ ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয় কিছু কিছু ধারণা পাপতুল্য।’ (সুরা হুজরাত, আয়াত : ১২)

অহংকারের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেন, ‘যার অন্তরে এক মিসকাল পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম)

অন্য হাদিসে রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে তার কোনো মুসলিম ভাইকে তাচ্ছিল্য করবে।’ (সহিহ মুসলিম)

কোরআনের এসব আয়াত ও হাদিসের ভাষা ও অভিব্যক্তি বিশ্লেষণ করলেই অন্তরের অপরাধ ও পাপের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অথচ সমাজের বেশির ভাগ মানুষ অন্তরের ব্যাধি সম্পর্কে অসচেতন, বরং এই বিষয়ে যথাযথ জ্ঞানও রাখে না। ফলে প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষাও করতে পারে না তারা। আল্লাহ এই আত্মবিমুখতা সম্পর্কে বলেন, ‘তারা দেখবে তাদের দুষ্কর্মসমূহ। তা তাদের ঘিরে ফেলবে। (অথচ) এসব বিষয় নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত।’ (সুরা ঝুমার, আয়াত : ৪৮)

অন্তরের ব্যাধিগুলো থেকে আত্মরক্ষার উপায় হলো, আল্লাহর কাছে তওবা করা। ভালো কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। সৎ চিন্তা ও ভালো কাজের ইচ্ছা নিজের ভেতর জাগ্রত করা। এ জন্য জীবনে ও মননে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসা বৃদ্ধি, আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা, তাঁর ওপর আস্থা ও আশা রাখা, তাঁর অবাধ্যতাকে ভয় করা, তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা, কৃতজ্ঞতা আদায় করা, লজ্জাবোধ জাগ্রত করা, আল্লাহর অনুবর্তী হওয়ার চেষ্টা করা আবশ্যক। বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির করা। সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্য কামনা করা। স্বয়ং রাসুলে আকরাম (সা.) সুস্থ হৃদয় লাভের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসয়ালুকা কালবান সালিমান। হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি তোমার কাছে সুস্থ ও অনুগত অন্তর প্রার্থনা করছি।’ (সুনানে তিরমিজি)

ইসলাম ওয়েব অবলম্বনে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা