kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

গণপিটুনি শরিয়তে শাস্তিযোগ্য অপরাধ

আতাউর রহমান খসরু   

২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণপিটুনি শরিয়তে শাস্তিযোগ্য অপরাধ

সম্প্রতি শিশুচোর সন্দেহে বেশ কয়েকজন মানুষ গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তাছলিমা বেগম রেনু নামের একজন নিঃসঙ্গ মাও রয়েছেন, যিনি ঢাকার একটি স্কুলে ভর্তিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সহিংস জনতার আক্রমণের শিকার হন। গতকাল সারা দেশে শিশুচোর সন্দেহে তিনজন গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। (২২ জুলাই, কালের কণ্ঠ) মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৬ জন গণপিটুনিতে মারা গেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা প্রয়োজন—এমন গুজবে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সৃষ্ট আতঙ্কের কারণে গণপিটুনির হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। সরকার মানুষকে এমন সহিংস আচরণ পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, ঢাকায় নিহত নারী তাছলিমার হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিশ গণপিটুনি বা তার পরিবেশ তৈরি হলে ৯৯৯ ইমার্জেন্সি হেল্প লাইনে ফোন করার অনুরোধ জানিয়েছে।

গত ২১ জুলাই গণপিটুনির ওপর বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে হঠাৎ গণপিটুনি বৃদ্ধির কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মানুষের মধ্যে আতঙ্কবোধ, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, সহনশীলতার অভাব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ইত্যাদি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ইসলাম এসব বিষয়ের সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান দিয়েছে, যা সমাজের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি লাঘবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

গণমাধ্যমের দাবি, সম্প্রতি গণপিটুনি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ গুজব। গুজবের কারণে সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে এবং তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া জঘন্যতম অপরাধ। ইসলাম গুজবে কান দেওয়া এবং তা সমাজে প্রচার করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

এমনকি কোনো আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হলেও মানুষ ধৈর্যহারা হবে না। বরং তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলকে জানাবে, যেন তারা বিষয়টির যথার্থতা নির্ধারণ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা ভয়ের কোনো সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা তা প্রচার করে। যদি তারা তা (সংবাদটি) রাসুল বা তাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর করত, তাহলে তাদের (দায়িত্বপ্রাপ্ত) অনুসন্ধানকারীরা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত, তাহলে সামান্যসংখ্যক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)

সমাজবিজ্ঞানীরা গণপিটুনিতে মানুষ নিহত হওয়ার পেছনে সামাজিক সহিষ্ণুতা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন, বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এই অসহিষ্ণুতা তৈরি করেছে। বাস্তবেও হয়তো তা-ই। তবে এর চেয়েও বড় কারণ হলো মানুষের আল্লাহবিমুখতা ও পরকালীন জবাবদিহির চিন্তা লোপ পাওয়া। পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ যখন আল্লাহ থেকে বিমুখ হয়, তখন আল্লাহ তাদের হিতাহিত জ্ঞান লোপ করেন। ফলে তাদের দ্বারা আত্মঘাতী ও হিংসাত্মক কাজ সংঘটিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদের কথাও ভুলিয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৯) আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ হয়ো না। নতুবা আল্লাহ তোমাদের এমন কাজের কথা ভুলিয়ে দেবেন, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ মানুষের যখন হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়, তখন একটি অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! মানুষের সামনে এমন এক সময় আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে কী অপরাধে সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে কী অপরাধে সে নিহত হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম,  হাদিস : ২৯০৮)

গণপিটুনির কারণ যা-ই হোক কেন, শরিয়তে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। শরিয়ত মানুষের বিচারের ভার মানুষের হাতে তুলে দেয়নি। কোনো মানুষ অপরাধ করলে তার বিচার রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘জাকাত, হদ (শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি), ফাই (যুদ্ধলব্ধ এক প্রকার সম্পদ) ও জুমা সুলতানের (রাষ্ট্রের) দায়িত্ব।’ (আহকামুল কোরআন লিল জাসসাস, পৃষ্ঠা ১৩১)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই কিসাস (প্রাণদণ্ড) বাস্তবায়ন করবে—এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভিন্নতা নেই।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ২/২৪৫)

শরিয়ত অপরাধের শাস্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দিয়ে শেষ করেনি; এর সঙ্গে সন্দেহাতীতভাবে তা প্রমাণিত হওয়ারও শর্ত দিয়েছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে অভিযোগ পেলে তা প্রমাণের পূর্বে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, রাষ্ট্রও তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখে না। ইসলামী দণ্ডবিধির একটি মূলনীতি হলো, ‘সন্দেহ হদ বা শাস্তি রহিত করে।’ (কাওয়াইদুল ফিকহ)

এমনকি ব্যভিচারসংক্রান্ত এক হাদিসে রাসুল (সা.) অকাট্যভাবে প্রমাণের পূর্বে অপরাধীর ব্যাপারে কুধারণা পোষণ করতেও নিষেধ করেছেন। সেখানে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মানুষকে প্রহার করা, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা কিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

গণপিটুনিতে কেউ নিহত হলে তা ইসলামী দণ্ডবিধি মোতাবেক হত্যা হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং এর সঙ্গে জড়িত সবাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত হবে—সংখ্যায় তারা যতই হোক না কেন। তবে হ্যাঁ, সবার শাস্তি এক হবে না, আবার সব হত্যার বিধানও এক হবে না। যদি গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্য হত্যা হয় তাহলে সবাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হবে, যদি না তারা নিহতের আত্মীয়দের সঙ্গে মৃত্যুপণের বিনিময়ে আপস করতে সক্ষম হয়। ইসলাম মানুষকে মানুষের জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলেছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্ভ্রম পরস্পরের জন্য হারাম; আজকের দিনের মতো, তোমাদের শহরের (মক্কা) মতো, তোমাদের এই মাসের (জিলহজ) মতো। অতি শীঘ্রই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে। সুতরাং আমার পরে তোমরা কুফরির দিকে ফিরে যেয়ো না যে তোমরা পরস্পরের ঘাড়ে আঘাত করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৭০২)

সুতরাং যদি কোথাও গণপিটুনির মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহলে মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো গুজবে কান না দিয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া, যেন তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘যদি তোমরা তাদের শাস্তি দিতে চাও তবে তাদেরকে সেই পরিমাণ শাস্তি দাও, যে শাস্তি তারা তোমাদেরকে দিয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, তবে তা ধৈর্যধারণকারীদের জন্য কল্যাণকর হবে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৬) ভেবে দেখতে হবে, অপরাধ প্রমাণের পূর্বেই যদি ব্যক্তিকে আঘাত করা হয়, তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা কিভাবে সম্ভব? সেটা কি বাড়াবাড়ি ও অবিচারের শামিল হবে না?

মন্তব্য