kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

সমাজ সংস্কারে মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-এর অবদান

আতাউর রহমান খসরু   

২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সমাজ সংস্কারে মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-এর অবদান

ইসলাম সর্বকালের ধর্ম—এই দাবি জোরালো করেছে যেসব বিষয় তাজদিদ বা সংস্কারের ধারণা তার অন্যতম। কালের আবর্তে মুসলিম সমাজের মূল্যবোধ, বিশ্বাস, রীতিনীতিতে যে মেদ, বাহুল্য ও বিকৃতি দেখা দেয়, তা থেকে আত্মরক্ষার একটি পদ্ধতির নাম তাজদিদ। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা প্রতি শতকে মুসলিম সমাজে একজন সংস্কার প্রেরণ করেন। তিনি উম্মাহর দেহে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন এবং মুসলিম সমাজে শিকড় গাড়া বিকৃতি ও বিচ্যুতি দূর করেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর ভূমিকা হয় একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো, যিনি একজন রোগীর রোগ নির্ণয় করে তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ভারতবর্ষের বিখ্যাত আলেম আহমদ সেরহিন্দ (রহ.) তেমনি একজন মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক। যিনি এক ক্রান্তিকালে ইসলামের সেবায় আত্মোৎসর্গ করেন এবং বহুবিধ কুফর ও শিরকে লিপ্ত ভারতীয় মুসলিমদের তাওহিদ ও একত্ববাদের অনুগামী করেন। তাঁর কর্মপরিধি ও সংস্কার আন্দোলনের বিপুল প্রভাবের কারণেই তাঁকে ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানি’ বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বলা হয় এবং এই নামেই তিনি অধিক পরিচিত।

হজরত আহমদ সেরহিন্দ (রহ.) বিতর্কিত সম্রাট আকবরের শাসনামলের শুরুর ভাগে ৯৭১ হিজরি মোতাবেক (২৫ জুলাই) ১৫৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ‘দ্বিনে ইলাহি’ প্রবর্তনের কারণে সম্রাট আকবরের সময় যে ধর্মীয় অনাচার ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার ভেতরই তিনি বেড়ে ওঠেন। তিনি দেখেছিলেন একজন পরাক্রমশালী অথচ বিভ্রান্ত সম্রাটের অন্যায়-অবিচারের সামনে রাষ্ট্রের সজ্জনরা কিভাবে অসহায়ত্ব বরণ করেছে এবং একইভাবে অসৎ মানুষগুলো জাগতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজের বোধ, বিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকিয়ে দিচ্ছে। কিভাবে তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে সম্রাটের বিকৃত ধর্মচিন্তার বীজ সমাজের পরতে পরতে বপন করছে। বিশেষত আদর্শচ্যুত আলেম নামধারী ভ্রান্ত লোকদের অসততা মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-কে যারপরনাই ব্যথিত করেছিল। তিনি জীবন দিয়ে এই ধর্মীয় নৈরাজ্য রোধের সংকল্প করেন। সমাজ, রাষ্ট্র ও উম্মাহকে নিয়ে তাঁর কল্যাণচিন্তার প্রধান কারণ সম্ভব তার পবিত্র ‘রক্তধারা’ ও পরিবারের প্রভাব। কারণ তিনি ছিলেন হজরত ওমর (রা.)-এর অধস্তন পুরুষ এবং তাঁর বাবা মাওলানা সাইয়েদ আবদুল আহাদ ছিলেন যুগের একজন খ্যাতিমান আলেম। হজরত ওমর (রা.)-এর প্রতি লক্ষ করে তাঁদের ফারুকিও বলা হয়।

বাবার কাছেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অল্প বয়সেই কোরআনের হিফজ সমাপ্ত করেন। এরপর যুগের বিশিষ্ট আলেমদের কাছে উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে সেরহিন্দে অবস্থিত বাবার মাদরাসায় পাঠদান শুরু করেন। বাবার তত্ত্বাবধানেই তিনি আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত হন। কর্মজীবনে পা রেখেই তিনি বুঝতে পারেন ভারতবর্ষের মুসলমানরা যেসব ব্যাধিতে ভুগছে তার আরোগ্য আলেমদের হাতেই রয়েছে, যদিও তাঁরা ক্ষমতার মোহ বা ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। আলেমসমাজ যদি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তবেই মুসলিম সমাজ মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। কুসংস্কার ও বিকৃতির হাত থেকে সাধারণ মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও ধর্মাচার রক্ষা পাবে। আলেমদের ভেতর দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ‘ইসাবাতুন নুবুওয়াহ’ নামে একটি বই লেখেন, যাতে তিনি নবীর উত্তরসূরি হিসেবে আলেমদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেন। আলেমদের বিচ্যুতি, শাসকদের ঘনিষ্ঠতা ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার ভয়াবহতা সম্পর্কেও এই বইয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বাবার মৃত্যুর পর আহমদ সেরহিন্দ (রহ.) হজের উদ্দেশ্যে বের হন। তাঁর এই হজ পালনের প্রধান লক্ষ্য ছিল সম্রাট আকবরের একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ এবং ভারতীয় মুসলমানের একটি ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া। সম্রাট আকবর ভারতীয় মুসলিমদের ওপর হজ ‘রহিত’ বলে ঘোষণা দেন। সম্রাটের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বহু মুসলমান সামর্থ্য থাকার পরও হজ করত না। অথচ আল্লাহর নির্দেশ ফরজ বিধান হজ বিলোপের কোনো অধিকার সম্রাটের ছিল না। মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.) চাইলে নিজে হজ করে সম্রাটের আরোপিত ‘অন্যায় শৃঙ্খল’ ভেঙে ফেলতে পারেন।

সম্রাট আকবর ইসলাম ও ভারতীয় সনাতন ধর্মের মিশ্রণে ‘দ্বিনে ইলাহি’-এর যে কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তাতে ঘোর আপত্তি ছিল শাসক মুসলিম সমাজ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর। আকবর চেয়েছিলেন উভয় ধর্মের সংমিশ্রণে একটি নতুন ধর্মের প্রবর্তন করতে; যার প্রধান দাবি ছিল ধর্মীয় পরিচয় বিলোপ করে অভিন্ন ভারতের মানচিত্র তৈরি। ইতিহাসবিদদের দাবি, আকবর রাজনৈতিক চিন্তা থেকেই তা করেছিলেন। যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তাঁর ওপর সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু মুসলিমদের মতো সনাতন ধর্মের অনুসারী রক্ষণশীল ভারতীয়রা তাঁর এই ভ্রান্ত চিন্তাকে সমর্থন করতে পারেনি। বিশেষত ধর্মীয় আভিজাত্যের অধিকারী রাজপুত কন্যাদের একজন ‘স্লেচ’ (বহিরাগত) বিধর্মী শাসকের স্ত্রী হওয়া ছিল তাদের কাছে চরম অস্বস্তিকর বিষয়, যদিও সুবিধাভোগী ভারতীয় রাজন্যবর্গের তাতে খুব বেশি আপত্তি ছিল না। তাদের সহযোগিতার কারণেই সম্রাট আকবর মোগল শাসনামলের সবচেয়ে স্থিতিশীল সময় পার করেছিলেন।

ইসলাম ও সনাতন ধর্মের এই সংমিশ্রণে উভয় ধর্মই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দ্বিনে ইলাহির অবয়বে পৌত্তলিকতার প্রাধান্য থাকায় ইসলামী বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মাচার ও সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন—সম্মান প্রদর্শনের নামে সম্রাটকে সিজদা করার ফরমান জারি করেছিলেন আকবর। অথচ ইসলামে মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে কোনো অর্থেই সিজদা করার কোনো অবকাশ নেই। মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.) সম্রাটের এই অন্যায়ের প্রকাশ্য প্রতিবাদ করেন। তিনি রাজধানী আকবরাবাদে (বর্তমান আগ্রা) উপস্থিত হন এবং সম্রাটের ঘনিষ্ঠজনদের ডেকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘সম্রাট আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছেন। যদি তিনি পাপাচার থেকে ফিরে না আসেন, তবে সাম্রাজ্য ধ্বংস হবে এবং তাঁর রাজত্বে ধস নামবে। তিনি স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবেন। সুতরাং সম্রাট যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে ফিরে আসেন।’ তাঁর এই সাহসী উচ্চারণ উপস্থিত ব্যক্তিদের হতভম্ব করে দেয়।

মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-এর নির্ভীক দাওয়াতি কার্যক্রম সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সম্রাটের ঘনিষ্ঠজনদের ভেতর ঈমানি চেতনা জাগ্রত করে। তারা সত্যের পক্ষে কাজ করার সাহস ফিরে পায়। আহমদ সেরহিন্দ (রহ.)-এর অনুসারী, শিষ্য ও খলিফারাও সত্য ও সংস্কারের দাওয়াত নিয়ে ভারতবর্ষের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়েন। ভারতবর্ষের বাইরে তুর্কিস্তান, দাগিস্তান, খোরাসান, কাশগর, কোরিয়া, সৌদি আরব, ইয়েমেন, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে তাঁর অনুসারী ও খলিফাদের প্রেরণ করেন তিনি। তাঁর প্রচেষ্টায় ভারতবর্ষে ক্রমেই তওবা করে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শাহজাদা জাহাঙ্গীর ছিলেন অনুতপ্তদের একজন, যদিও অর্ধশতাব্দীকাল ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে চর্চিত অনেক কুসংস্কার পরিহার করা তাঁর পক্ষেও সম্ভব হয়নি। ১৬০৬ সালে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর শাহজাদা জাহাঙ্গীর ক্ষমতাসীন হন।

মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-এর প্রতি সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন সহানুভূতিশীল। তবে তাঁর এই সহানুভূতিকে সহজভাবে নিতে পারেননি আকবরের সংস্রবপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী রাজন্যবর্গ ও সভাসদরা। তাঁরা সম্রাট জাহাঙ্গীরকে এই বলে খেপিয়ে তুললেন যে এই ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। দিন দিন তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে এবং সেনাবাহিনীতেও তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। তাঁর কার্যক্রমের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ না করলে ভবিষ্যতে তিনি সম্রাটের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। জাহাঙ্গীর সভাসদদের চাপ ও প্ররোচনায় মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-কে বন্দি করার সিদ্ধান্ত দেন। ১০২৮ হিজরিতে তাঁকে বন্দি করে ‘কুলয়ারু দুর্গে’ রাখা হয়।

বন্দি হওয়ার পর আহমদ সেরহিন্দ (রহ.) বন্দিদের ভেতর দাওয়াতি কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেন। তাঁর সংস্পর্শে বহু মানুষ ইসলামের পথে ফিরে এলো। কথিত আছে, সম্রাট একদিন জেলারকে ডেকে তাঁর সম্পর্কে জানতে চান। তখন তিনি বলেন, ‘সম্রাট, এই মানুষের সংস্রবে অমানুষগুলো মানুষ হয়েছে আর মানুষগুলো ফেরেশতায় পরিণত হয়েছে।’ এরপর সম্রাট তাঁর সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হন এবং তাঁকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.)-কে ধর্ম বিষয়ে তাঁর পরামর্শক হওয়ার প্রস্তাব করলেন। তিনি এই প্রস্তাবকে ইসলাম ও মুসলমানের সেবা করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি সম্রাটকে কয়েকটি প্রস্তাব দিলেন। যেমন—ক. সম্রাটের সামনে সিজদার প্রথা রহিত করতে হবে; খ. যেসব মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে তার পুনর্নির্মাণ করতে হবে; গ. পশু কোরবানির অনুমতি দিতে হবে; ঘ. বিচারকার্যে ইসলামী আইনের অনুসরণ করতে হবে; ঙ. জিজিয়া বা নিরাপত্তা কর পুনর্বহাল করতে হবে; চ. সব ধরনের বিদআত ও কুসংস্কার পরিহার করতে হবে; ছ. ধর্মীয় কারণে যাদের বন্দি করা হয়েছে তাদের মুক্তি দিতে হবে ইত্যাদি।

সম্রাট ধীরে ধীরে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন এবং মসজিদ পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু করেন। মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.) চার বছর সম্রাটের পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শেষ জীবনে তিনি সেরহিন্দে ফিরে যান, মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোযোগ দেন। আধ্যাত্মিকতার লাইনে তিনি ছিলেন নকশাবন্দি তরিকার অনুসারী। প্রথমে তিনি নিজের বাবার হাতে বাইয়াত হন। পরে নকশাবন্দি তরিকার বিশিষ্ট পীর শায়খ বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এর মুরিদ হন এবং খিলাফত লাভ করেন।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি আজমিরে অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি তাঁর সন্তানদের চিঠি লেখেন, ‘আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে আর তোমরা আমার থেকে দূরে।’ এরপর তিনি সেরহিন্দে ফিরে আসেন এবং নামাজ-জিকির-দোয়ায় নিমগ্ন হন। একান্ত আপনজন ছাড়া কেউ তাঁর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি পেতেন না। জিলহজ মাসে প্রচণ্ড অসুখ দেখা দেয়। এ সময় তিনি ‘আল্লাহুম্মা আর-রাফিকুল আলা’ (হে আল্লাহ, আপনিই সর্বোত্তম বন্ধু) এই দোয়া বেশি বেশি পাঠ করতেন। ২২ সফর ১০৩৪ হিজরি মোতাবেক ১৬২৪ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।

মন্তব্য