kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

কী আছে ওমানের বিখ্যাত সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদে

মীর মো. গোলাম মোস্তফা   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কী আছে ওমানের বিখ্যাত সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদে

সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ ওমানের রাজধানী মাস্কাটের বাউশার এলাকায় অবস্থিত একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতি ও দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্পেটের জন্য প্রসিদ্ধ। যদিও একসময় বিশ্বের সর্ববৃহৎ কার্পেট আর ঝাড়বাতির জন্য নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছিল গিনেস বুকে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা হাতছাড়া হয়ে যায়।

সর্ববৃহৎ কার্পেটের রেকর্ডটি হাতছাড়া হয় ২০০৭ সালে আবুধাবির শেখ জায়েদ মসজিদে এর চেয়ে বড় কার্পেট স্থাপনের মাধ্যমে। আর ঝাড়বাতির রেকর্ডটি হাতছাড়া হয় ২০১০ সালে কাতারের দোহায় আল-হাতমি ভবনের লবিতে সবচেয়ে বড় ঝাড়বাতি বসানোর পর।

১৯৯২ সালে সুলতান কাবুস মসজিদটি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। মসজিদের নান্দনিক নকশা তৈরির জন্য আয়োজন করা হয় প্রতিযোগিতার। এতে অংশ নিয়েছিলেন দেশি-বিদেশি নামকরা নকশাবিদরা। পরবর্তী সময়ে প্রায় চার লাখ ১৬ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। কাজটির দায়িত্ব পায় বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান কার্লিয়ন আলাওই। মাস্কাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জাতীয় জাদুঘর, মজলিস, রয়াল অপেরা হাউসের মতো ওমানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এই কম্পানিরই বানানো। স্থপতি ইরাকের মোহাম্মদ সালেহ মাকিয়া এবং লন্ডনের কুড ডিজাইন কম্পানির তত্ত্বাবধানে ছয় বছর চার মাসে মসজিদটি তৈরি হয়। এতে কাজ করে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। মনোমুগ্ধকর এই স্থাপত্যে ব্যবহার করা হয় বিশ্বের নামি-দামি সব উপকরণ। ইতালি, মিসর, ভারত থেকে আনা হয় মার্বেল ও মোজাইক পাথর। অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে ভাস্কর্য তৈরিতে অংশ নেন ওমানের ৬০ জন এবং ভারতের ২০০ জন কারুশিল্পী, যাঁরা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বেলেপাথর, মার্বেল পাথর ও স্টেইনড গ্লাসের সমন্বয়ে গড়ে তোলা নকশার পরতে পরতে ফুটিয়ে তুলেছেন সাগর আর মরুভূমির মিশেলে গড়ে ওঠা আবহমান মরুজীবন, যা সত্যি হৃদয়কাড়া। অবশেষে ২০০১ সালে উদ্বোধন হয় আধুনিক ইসলামী স্থাপত্যের গৌরবময় নিদর্শন সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ, যা চোখ-ধাঁধানো স্থাপত্যশৈলীর জন্য আকর্ষণ করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। এটিই ওমানের একমাত্র মসজিদ, যেখানে অমুসলিমদেরও যাওয়ার অনুমতি আছে।

স্থাপত্যশৈলী নিয়ে স্থানীয় ওমানিরা জানায়, চতুর্ভুজ আকৃতির এই মসজিদ ওমানের এবাদি মুসলিম সমাজব্যবস্থার প্রতীকস্বরূপ। দুটি করিডর দিয়ে সংযুক্ত তিনটি পৃথক হল। একই সঙ্গে, যা সত্যি অনন্য।

মসজিদটির মূল নামাজঘরের আয়তন সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গমিটারেরও বেশি, যেখানে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে প্রায় সাত হাজার মুসল্লি। মসজিদে প্রবেশের সময় মুগ্ধ করে দেয় কারুকাজ করা উঁচু দরজা। ভেতরে ঢুকতেই মন জুড়াবে সাদা ও গাঢ় ধূসর মার্বেল পাথর দিয়ে আচ্ছাদিত চারদিকের দেয়াল। গায়ে লতাপাতার মোটিফ ও জ্যামিতিক নকশার ম্যুরাল। মেঝেতে বিছানো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্পেট, যার আয়তন চার হাজার ৩৪৩ বর্গমিটার। ওজন ২১ মেট্রিক টন। বোনা হয়েছে ক্লাসিক্যাল, তাব্রিজ, কাশান ও ইসাফাহান ঐতিহ্যের নকশায় ১৭০ কোটি সুতার বন্ধনে। নানা রঙের বিন্যাস ২৮টি স্তরে। সম্পূর্ণ হাতে বোনা এই নান্দনিক কার্পেটটি বুনতে কাজ করেছেন ৬০০ ইরানি নারী। সময় লেগেছে চার বছর।

ছাদের ঠিক মাঝ বরাবর আছে কেন্দ্রীয় গম্বুজ, যার ভেতরটা মার্বেল কলাম কাঠামোর মধ্যে খোদাই করা রঙিন গ্লাসের ছোট ছোট জানালা এবং চীনা মাটির বাসন প্যানেলে অলংকৃত। তাতে শোভা পাচ্ছে একসময় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের খ্যাতি কুড়ানো ঐতিহাসিক ঝাড়বাতিটি। মেটাল বিটের ওপর ২৪ ক্যারেটের সোনার প্রলেপের এই ঝাড়বাতিও বানাতে সময় লেগেছিল চার বছর। এর ওজন সাড়ে আট মেট্রিক টনেরও বেশি। উচ্চতা ১৪ মিটার। ছয় লাখ টুকরা অস্ট্রিয়ান সরভস্কি ক্রিস্টাল, এক হাজার ১২২টি হ্যালোজেন বাল্ব। এটি তৈরি করেছিল জার্মানির ফৌস্টিগ কম্পানি। এটি ছাড়াও মসজিদটিকে উজ্জ---ল করে রেখেছে আরো ১৬টি ছোট ঝাড়বাতি।

মসজিদের গম্বুজ আর সিলিং যে কতটা শৈল্পিক ও সুন্দর হতে পারে, তার নিদর্শন হতে পারে সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ। সিলিংয়ের সঙ্গে লাগানো ওপরের কলামে ইবনে মুলকা শরাজির উদ্ভাবিত ইসলামী ঠুলুথ লিপিতে কোরআনের আয়াত অঙ্কিত। পাশের বারান্দার প্রবেশপথগুলোও ইসলামী জ্যামিতিক ও আলংকারিক ফ্রেমওয়ার্ক জ্যামিতিক ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে পূরণ করা।

মসজিদের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে অসংখ্য ছোট খুপরির প্যাটার্নে মোজাইকে আচ্ছাদিত রাজকীয় মিহরাবটি। লতাপাতার মোটিফ ও আলংকারিক নকশার মাঝখানে আল্লাহর নাম ও কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি যে কারো মন শীতল করে তুলবে।

মসজিদটিতে নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা। এর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে সাড়ে ৫০০ বর্গমিটারের আলাদা একটি মুসাল্লা। যেখানে প্রায় ৭৫০ জন একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে। পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা অজুখানা দুটিও দৃষ্টিনন্দন মার্বেলে বানানো।

সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদের রাজকীয় পাঁচটি মিনার মসজিদের বাইরের সৌন্দর্য আরো বেশি ফুটিয়ে তুলেছে। মূলত এই পাঁচটি মিনারকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রতীকস্বরূপ সম্মিলন করা হয়েছে। মসজিদে আসা জ্ঞানপিপাসু মুসল্লিদের কথা মাথায় রেখে মসজিদ কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা হয়েছে ইসলামিক সায়েন্স ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া রয়েছে ৩০০ জন ধারণক্ষম সেমিনার রুম এবং বিশাল গ্রন্থাগার, যাতে স্থান পেয়েছে প্রায় ২০ হাজার বই।

লেখক : সেক্রেটারি, মসজিদ-ই-বায়তুর রহমান, পুরাতন কলেজ রোড, নোয়াখালী।

মন্তব্য