kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

নওমুসলিমের কথা

মুসলিম নারীদের জীবন আমাকে মুগ্ধ করে

ড. রেবেকা

১৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুসলিম নারীদের জীবন আমাকে মুগ্ধ করে

ড. রেবেকা মাস্টারটন একজন ব্রিটিশ ইসলামী ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী। একই সঙ্গে তিনি একজন লেখক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। ১৯৯৯ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ বিষয়ে রিভার্ট মুসলিমস ডটকমে প্রকাশিত তাঁর আত্মজৈবনিক একটি লেখার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ প্রকাশ করা হলো
 

আমি দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সাগরতীরবর্তী একটি ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করি। শৈশব ও কৈশোরে ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তবে একজন শিশু হওয়ার পরও সব সময় পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতার একটি বোধ আমার ভেতর কাজ করত। ভাবতাম, আমি এখান থেকে অন্যত্র যেতে পারলে আর কখনো ফিরব না। আমার মনে হতো, আমি অদৃশ্য কোনো জগতের সঙ্গে সংযুক্ত, যেখান থেকে আমরা সবাই এসেছি এবং সবাই আবার ফিরে যাব।

আমার পরিবার শুধু নামেই খ্রিস্টান ছিল, তারা ধর্মে বিশ্বাস করত না। ধর্মের যতটুকু পালন করা হতো, তা শুধু সামাজিকতার অংশ হিসেবেই করা হতো। যেমন—হজরত ঈসা (আ.)-এর বাণী সম্পর্কে কোনো কিছু না জেনেই শৈশবে আমরা গির্জায় যেতাম। কেননা আশপাশের সবাই সেখানে যায়। আমার মা স্রষ্টার ‘পিতৃত্বের ধারণা’ অস্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, প্রভু হলেন একটি শক্তি বা ক্ষমতা। আমাদের ঘরে এক কপি বাইবেল ছিল। কিন্তু তা পড়া হতো না। আমার পরিবারের সদস্যরা সৎ ও ভদ্র হলেও তারা কখনো স্রষ্টা, প্রকৃতি, জীবনের অর্থ অথবা অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞানার্জনে আগ্রহী ছিল না। অদৃশ্য কোনো কিছুতে তাদের বিশ্বাস ছিল না। তবে অদৃশ্যের জ্ঞানের প্রতি আমার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। আমি আমার কিশোর বয়সে এ সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করেছি। আমি পৃথিবীর প্রাচীন বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে পড়েছি। বিশেষত প্রাচীন মিসরীয় ও ইন্দো-ইউরোপীয় ধর্মের ওপর দীর্ঘদিন অধ্যয়ন করি। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।

১৭ বছর বয়সে আমি ও আমার এক বন্ধু ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন শিক্ষকের আলোচনা শুনতে শুরু করি, যিনি মানুষের জীবন, সুখের ব্যাখ্যা ও তার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর কথায়ও আমি তৃপ্ত হতে পারিনি। কারণ আমার মনে হতো, তাঁর ভেতর কৃত্রিমতা আছে। অনুসারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্যই এসব বলেন তিনি। আমি তাঁর আলোচনা শোনা বন্ধ করে দিলাম। আবারও বই পড়তে শুরু করলাম। ধর্ম, আত্মা ও ঐশী বাণী বিষয়ে পড়ছিলাম আমি। কিন্তু কিছুতেই আশ্বস্ত হতে পারছিলাম না।

১৮ বছর বয়সে আমি জাপানি ভাষা পড়তে লন্ডনে আসি। ১৯ বছর বয়সে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে জাপানে যাই। আমি সেখানে অতিমাত্রায় যান্ত্রিক একটি সমাজ দেখতে পাই। ফেরার আগে আমি মালয়েশিয়া যাই। এই প্রথম আমার কোনো মুসলিম দেশে যাওয়া। ট্রেনে মালয়েশিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চল সফর করি। দেশটির উত্তরাঞ্চলে ধর্মের প্রভাব সবচেয়ে প্রবল। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি বললাম, আমি মুসলিম হয়েছি। মালয়েশিয়ার যে গেস্টহাউসে আমি ছিলাম, তার মালিক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ইসলামের বিধি-বিধান শিখেছি কি না। আমি বললাম, না। তখন পর্যন্ত ইসলাম সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তিনি আমাকে অজু ও নামাজ শেখালেন। ফজরের সময় একটি মসজিদে নিয়ে গেলেন। মালয়েশিয়ায় আমি খুব সামান্য সময় কাটাই। তবু দেশটিকে আমার জন্মভূমি বলেই মনে হচ্ছিল। হৃদয়ে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছিলাম, যা আমি কখনো পাইনি।

আমি ইংল্যান্ডে ফেরার পরও পড়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখলাম। তখন আমি মরক্কোর একজন নারীর কাছ থেকে একটি রুম ভাড়া নিই। তিনি আমার মাত্র দুই বছরের বড় ছিলেন এবং আমাকে বোনের মতো স্নেহ করতেন। তবে মিশতাম বন্ধুর মতো। তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার মনে হলো, আমি হারানো কোনো কিছু ফিরে পেলাম। ইংল্যান্ডে আমার জীবন অর্থহীন মনে হতো। ব্রিটিশ সমাজে আমরা যে জীবন যাপন করতাম সে তুলনায় তাদের জীবন ছিল অনেক পরিশুদ্ধ ও পবিত্র। ১৯৯৬ সালে আমার মরক্কোর বন্ধু মিসরে আরবি ভাষা শিখতে গেলেন এবং আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। মিসরে আমি ছয় মাস লেখাপড়া করি এবং সেটাই আমার জীবনে পরিবর্তন এনে দেয়। মিসরের মুসলিম নারীদের জীবনপ্রণালী আমাকে মুগ্ধ করে। আমি হিজাব কিনলাম এবং নিজেকে আবৃত করে রাখলাম। আজানের ধ্বনিও আমার কাছে মধুর মনে হতো। মিসরের মানুষ আমার সঙ্গে চমৎকার সৌজন্যমূলক আচরণ করল। রমজান মাসটি আমি মিসরে কাটাই। দেখতাম, ইফতারের সময় হলে রাস্তাঘাট কিভাবে শূন্য হয়ে যায়। ট্রাম, ট্যাক্সি, গাড়ি— কোনো কিছুই রাস্তায় দেখা যায় না। সবাই ইফতারের প্রস্তুতি নেয়। ধর্মের প্রতি মানুষের এই অগাধ ভালোবাসায় আমি বিস্মিত হলাম।

মিসর থেকে ফেরার সময় আমার প্রচণ্ড কান্না আসছিল। আমি ফিরে এলাম, কিন্তু সেই আগের মানুষটা ছিলাম না। ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ল এবং কোরআন অধ্যয়ন শুরু করলাম। লন্ডনের বিভিন্ন মসজিদ পরিদর্শন করলাম। ১৯৯০ সালে কলেমা পাঠ করে মুসলিম হলাম। মুসলিম হওয়ার পরপরই আমি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে স্বপ্ন দেখলাম। একটি অন্ধকার স্থানে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমার ডান পাশে ছিলেন। সাদা পোশাকে ছিলেন। আমি তাঁর চেহারা দেখিনি। শুধু দাড়ির কম্পন দেখেছি। তাঁর সামনে লাল-সাদা একটি জায়নামাজ ভাঁজ করা ছিল। তিনি জায়নামাজের কাছে গেলেন এবং তা নিজ থেকে তাঁর সামনে খুলে গেল। আমার মনে হলো, এটি পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করার আহ্বান। মহানবী (সা.)-কে স্বপ্নে দেখার পর আমি নিয়মিত হিজাব পরতে শুরু করি।

অনুবাদ : আতাউর রহমান খসরু

মন্তব্য