kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

ইন্টারনেটে ইসলাম প্রচারের অবারিত সুযোগ

ড. আবদুর রহমান আল-আরেফি

১৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইন্টারনেটে ইসলাম প্রচারের অবারিত সুযোগ

যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে ইন্টারনেট। আধুনিক লোকজন ইন্টারনেট ব্যবহারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা শত শত মিলিয়নে পৌঁছে গেছে। ইন্টারনেট দূরের জিনিসকে অতি কাছে নিয়ে এসেছে।

যুগের চাহিদা অনুযায়ী মুসলিম উম্মাহর উচিত এই ইন্টারনেটের মাধ্যমে দাওয়াতি কার্যক্রম প্রচারে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা। অনেক অমুসলিম যুবক-যুবতির নাম শুনি, যারা এটাকে তাদের ধর্ম প্রচারের মাধ্যম বানিয়েছে। তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট খুলেছে। বিশ্বব্যাপী বক্তৃতা, লেকচার, অনুষ্ঠান প্রচার করছে। ফলে অনেকে তাদের ধর্ম অনুসরণ করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেকের সমস্যার সমাধান হয়েছে। এই ছোট জানালা দিয়ে কত ভালো বিষয়াদি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গেছে তার হিসাব নেই। অন্যদিকে অনেকে ইন্টারনেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনর্থক সময় নষ্ট করছে। এর মাধ্যমে কিভাবে ভালো কাজ করবে তা জানে না।

আমি এই মাধ্যমে দাওয়াতি কার্যক্রম প্রচার নিয়ে আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।

আমি মনে করি, যোগাযোগ মাধ্যম দিন দিন উন্নত হচ্ছে। নবী করিম (সা.)-এর সামনে অনেক প্রচারমাধ্যম উন্মোচিত ছিল। তিনি সেসব মাধ্যমকে সরাসরি ইসলাম প্রচারে ব্যবহার করেছেন। ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এমন স্থানে যেতে তৎপর ছিলেন, যেখানে গেলে অনেক মানুষকে একসঙ্গে আল্লাহর দিকে ডাকা যায়। অর্থাৎ তিনি জনসাধারণের একত্র হওয়ার স্থান হাট-বাজারে যেতেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তোমার আগে যত রাসুল পাঠিয়েছি, তারা খাবার আহার করত (যেহেতু তারা মানুষ ছিল) এবং বাজারে যেত।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২০)

আপনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনার আওয়াজকে এত অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন, যার সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। কেননা প্রতিমুহূর্তে শত শত মিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেটে থাকে। তাহলে সারা দিনে কী পরিমাণ থাকে চিন্তার বিষয়। এটা বিশাল সংখ্যা।

 

যে কারণে মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী

১. এটি একটি সহজ মাধ্যম।

২. এই মাধ্যমে কোনো নিরাপত্তাজনিত জটিলতা নেই। আপনি ইন্টারনেটে গিয়ে লিখতে পারেন, ‘প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহ বলবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি বৃক্ষ রোপণ করবেন।’ এই হাদিস লেখার পর কেউ প্রশ্ন করবে না যে আপনার পরিচয়পত্র কোথায়, কে আপনাকে (হাদিস বর্ণনার) অনুমতি দিয়েছে ইত্যাদি। তা ছাড়া এমন অনেক বোন আছেন, যাঁরা ধর্মীয় প্রগ্রামে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু তাঁর পক্ষে মসজিদে মানুষের সামনে বক্তৃতা প্রদান সম্ভব নয়। তিনি জুমার খুতবাও দিতে পারেন না।

অধিকন্তু পরিবার, সন্তান ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়াও সম্ভব হয় না। কিন্তু ইন্টারনেটের মাধ্যমে তিনি বিপুলসংখ্যক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

আবার অনেকে লজ্জা বা যোগ্যতার অভাবে সেমিনারে বক্তৃতার প্রগ্রামে অংশগ্রহণ করতে পারে না। ইন্টারনেট এসব জটিলতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

 

ইন্টারনেট ধারালো অস্ত্রের মতো

ইন্টারনেট ধারালো অস্ত্রের মতো। সেটা এমন একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে আপনি আজ যা বপন করবেন, আগামীকাল তার ফসল আহরণ করবেন। অনেকেই ইন্টারনেট খারাপ কাজে ব্যবহার করে। কিছুদিন আগে এক জরিপে পড়লাম, ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা ছবির ৮৪ শতাংশ অশ্লীলতাপূর্ণ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ছবি প্রকাশ করা হয়। গাড়ি, সমুদ্র, প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদি আপলোড করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভয়ংকর পরিসংখ্যান।

 

যেভাবে ইন্টারনেটে ধর্ম প্রচার করতে পারি

ইন্টারনেটে ইংরেজি ভাষায় লিখিত অনেক মেসেজ, প্রবন্ধ আছে, যার বর্ণনাভঙ্গি খুব সুন্দর। সেটা আপনি যেকোনো ব্যক্তিকে পাঠাতে পারবেন। বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে জানতে পারবেন, কে মুসলিম আর কে মুসলিম নয়। অমুসলিমদের জন্য অনেক মুনতাদা (সাহিত্য আসর বা ব্লগ) রয়েছে। আপনি ইসলাম সম্পর্কে ইংরেজিতে সুন্দরভাবে বিস্তারিত লিখে এদের কাছে পাঠাতে পারেন।

 

ইসলামের সেবায় অবদান রাখুন

হে ভাই, ইসলামের সেবায় নিজের অবদান রেখে যান। নিজেকে উম্মতে মুহাম্মদির সদস্য মনে করুন। জাতির জন্য কিছু উপস্থাপন করুন। জাতির এই করুণ অবস্থা চলতে থাকলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

আমি তিনটি উদ্যোগের কথা জানি, যা মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে করতে পারে। সেসব উদ্যোগের বিষয়ে অনেকেই জানেন। তবু গাফিলদের স্মরণ করিয়ে দিতে উল্লেখ করছি।

১.  গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ ডাউনলোড-আপলোড করা।

২.  ভালো লেখকদের উৎসাহ প্রদান করা। কেননা উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে অনেক ইতিবাচক ফল বেরিয়ে আসে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি প্রশংসা-উৎসাহে উজ্জীবিত হওয়া। এ জন্য আপনি দেখবেন যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে ইবাদতে উৎসাহব্যঞ্জক কথা বেশি এসেছে।

৩.  বিভিন্ন মন্তব্য (কমেন্ট) করে তাদের উৎসাহ প্রদান করা; যেমন—মাশাআল্লাহ! আপনার লেখাশৈলী চমৎকার। আপনার লেখার যোগ্যতা আছে। কেন আপনি লেখা থেকে দূরে থাকেন? কেন নিজেকে এমন কাজে মগ্ন করছেন না, যা দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার ও সমগ্র মুসলিম জাতির উপকার করবে।...

৪.  এক নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয়ে বিক্ষিপ্ত প্রবন্ধকে একত্র করা।

৫.  মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিদআত গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করা।

৬.  বিভিন্ন ব্লগে অংশগ্রহণ ও তাতে প্রবন্ধ প্রদান।

৭.  মানুষকে ওয়াজ-নসিহত করা।

৮.  তাৎক্ষণিক সামাজিক প্রয়োজন ও ত্বরিত সেবামূলক কর্মকাণ্ডে মানুষকে দিকনির্দেশনা প্রদান।

৯.  বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় কল্যাণমূলক কাজে অংশ নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ।

১০. মুসলমানদের নতুন তথ্য দিয়ে উপকৃত করা। উদাহরণস্বরূপ নির্দিষ্ট সাইটে এই তথ্য লেখা যে ২০০৬ সালে জার্মানিতে চার হাজার ব্যক্তি মুসলমান হয়েছে। আবার এই সুসংবাদও লিখতে পারেন যে আপনি কি জানেন, ইউরোপে প্রতি দুই ঘণ্টায় একজন মুসলিম হচ্ছে। বেলজিয়ামের সরকারি পরিসংখ্যান আপনি জানেন কি? বেলজিয়ামের সরকারি জরিপ বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা হবে প্রথম।

১১. ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাদিসের খিদমত করতে পারেন। ২০০৮-এর এক জরিপে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পড়েছি। সেই জরিপের আলোকে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান একানে দেওয়া হলো : এশিয়ায় ৫৭৮ মিলিয়ন। ইউরোপে ৩৮৫ মিলিয়ন। উত্তর আমেরিকায় ২৮৪ মিলিয়ন। লাতিন আমেরিকায় ১৫১ মিলিয়ন। আফ্রিকায় ১৫১ মিলিয়ন। অস্ট্রেলিয়ায় ২১ মিলিয়ন। চীনে ২৭৬ মিলিয়ন। মধ্যপ্রাচ্যে ৪১ মিলিয়ন। এখন দেখি ওয়েবে ভাষার পরিসংখ্যান। ইংরেজি ভাষায় ৪৮০ মিলিয়ন। যেসব ওয়েবসাইট ইসলামের সেবা করে, তার মধ্যে চীনা ভাষায় ইসলামী ওয়েবসাইটের সংখ্যা সবচেয়ে কম। তারপর স্প্যানিশ ভাষা, তারপর জার্মান ও ফরাসি ভাষার অবস্থান।

১২. হাদিসের তথ্য-উপাত্ত, হজ পরিচিতির সেবা প্রদান।

১৩. হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ ও হজবিষয়ক মাসায়েল শিক্ষা দেওয়া। এসব কাজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে করার বাস্তব নমুনা আমাদের সামনে আছে।

১৪. গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির পর্যাপ্ত সঞ্চয়ভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারি।

১৫. নেটের মাধ্যমে ইসলামিক লিংক, পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণ ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইসলামের সেবা করা সম্ভব। নবীজির সিরাতবিষয়ক ওয়েব বা বিভিন্ন কিরাতে তাফসিরসহ পবিত্র কোরআন পড়া ও ডাউনলোডের সুব্যবস্থাসমৃদ্ধ ওয়েব প্রস্তুত ও লিংক প্রচার করতে পারি।

১৬. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অমুসলিমদের দাওয়াতে আমরা বেশি মনোযোগী হতে পারি। কেননা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও  পৌঁছে দাও।’

১৭. নেট সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ সংস্থা হতে পারে।

১৮. যোগ্যরা তাঁদের যে যে যোগ্যতা আছে, তা প্রকাশ করতে পারেন।

১৯. অনেক যুবকের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। আপনি নেটের মাধ্যমে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

২০. ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞ এমন লোকদের কাছে বিভিন্ন প্রবন্ধ ভাষান্তর করে পাঠাতে পারেন।

২১. অনেক অনৈসলামিক ওয়েবে প্রবেশ করেও মানুষকে উপদেশ দেওয়া যায়।

২২. অনেক নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট আছে, যার সাহায্যে অমুসলিম ও অনারবদেরও দাওয়াত দেওয়া সম্ভব; যেমন—ফেসবুক। এখানে বিভিন্ন জাতি, ভাষাভাষী ও ধর্মাবলম্বী লোক আছেন। তবে খুব সতর্ক থাকতে হবে। কেননা এর অনেক কিছুই মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর। আপনি কিছু পোস্ট করলে অনেকেই তা পড়তে পারবে। অন্তত চোখ বুলাতে পারবে। সে এটা গ্রহণ করুক বা না করুন। আপনার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দেখছেন।

২৩. আরব দেশগুলোতে অমুসলিম অনারব আরবি শিক্ষার্থীদের দাওয়াত দেওয়া সম্ভব। এই ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে বলা যাবে। অনেক ওয়েবসাইট আছে পবিত্র কোরআন অনুবাদের। প্রতিটি আয়াত অনুবাদসহ পড়া হয়। আল্লাহ চাহেন তো পরবর্তী সময়ে এটা তাদের ইসলাম গ্রহণ করার কারণ হবে।

২৪. কোরআন বিতরণ করে প্রচার চালাতে পারেন।

২৫. ওয়েব কর্তৃপক্ষ ও ডেভেলপারদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে হবে, কিভাবে ইসলাম প্রচারে বেশি বেশি ভূমিকা রাখা যায়। পরিশেষে আল্লাহ তাআলার কাছে আমার ও আপনাদের জন্য তাওফিক প্রার্থনা করছি।

 

সৌদি আরবের বিখ্যাত বক্তা ড. আরেফির বক্তৃতা থেকে

অনুবাদ করেছেন মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

মন্তব্য