kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

কিভাবে বিয়ে করব

মুফতি মাহমুদ হাসান

১৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



কিভাবে বিয়ে করব

সৃষ্টিগতভাবেই নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। নারী ছাড়া পুরুষ এবং পুরুষ ছাড়া নারীর জীবন অসম্পূর্ণ। আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর হজরত হাওয়া (আ.)-কে তাঁর জীবনসাথিরূপে সৃষ্টি করেন এবং তাঁদের বিয়ের ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো পৃথিবীতে চলমান। এমনকি অনন্ত অনাবিল সুখের জান্নাতেও নারী-পুরুষ পরস্পরের সঙ্গবিহীন অতৃপ্ত থাকবে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর তাঁর (আল্লাহ) নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও মায়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত : ২১)

মানুষের স্বভাবজাত পরিচ্ছন্নতা, মানসিক ভারসাম্য, চারিত্রিক উৎকর্ষ ও পবিত্রতা রক্ষার অন্যতম উপায় বিয়ে। মানবতার ধর্ম ইসলাম নারী-পুরুষের মধ্যে সুন্দর ও পূতপবিত্র জীবনযাপনের জন্য বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা বিয়ে করো তোমাদের পছন্দের নারীদের থেকে, দুজন অথবা তিনজন অথবা চারজন; কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে তোমরা ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে পারবে না, তাহলে মাত্র একজন।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩)

 

বিয়ের ফজিলত

হজরত আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘বিয়ে আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নত অনুযায়ী আমল করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়। তোমরা বিয়ে করো। কেননা আমি উম্মতের সংখ্যা নিয়ে হাশরের মাঠে গর্ব করব।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৪৬)

আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) সূত্রে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, চারটি জিনিস নবী (সা.)-এর সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত—লজ্জা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মিসওয়াক করা ও বিয়ে করা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮০)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওই পুরুষ মিসকিন! মিসকিন!! মিসকিন!!! যার কোনো স্ত্রী নেই, যদিও সে ধনবান হয়। আর ওই নারী মিসকিন! মিসকিন!! মিসকিন!!! যার কোনো স্বামী নেই, যদিও সে সম্পদের মালিক হয়।’ (আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৬৫৮৯)

 

বিয়ের উপকারিতা

বিয়ের বহুমুখী উপকারিতা রয়েছে। যেমন—

১. গুনাহ ও পাপাচার থেকে নিজেকে সংবরণ করার মাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়ের ঈমান, ইসলাম ও সতীত্ব রক্ষা করতে পারে।

২. নারী জাতির তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়।

৩. নারীর সম্মানজনক জীবন-জীবিকা সহজ হয়। 

৪. পুরুষ একজন আমানতদার নির্ভরযোগ্য সঙ্গিনী লাভ করে।

৫. বৈধ পন্থায় মানববংশের বিস্তার হয়।

৬. সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত যৌনচাহিদা পূরণের বৈধ ও নিরাপদ ব্যবস্থা বিয়ে।

৭. নারী-পুরুষ উভয়ের মানসিক স্বস্তি, তৃপ্তি ও প্রফুল্ল অর্জন হয়, যা বিয়ে ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব নয়।

৮. নবীজি (সা.)সহ সব নবীর একটি মহৎ সুন্নতকে বাস্তবায়ন করা হয়। (সহি মুসলিম, হাদিস : ১৪০০; আওজাজুল মাসালিক : ৪/২৩৬)

৯. মানবশিশু তাদের প্রকৃত পরিচয় লাভ করত সঠিক লালন-পালন ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

১০. বিয়ের দ্বারা রিজিকে বরকত ও জীবনে প্রাচুর্য আসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিয়ে করো, স্ত্রীরা স্বীয় ভাগ্যে তোমাদের কাছে সম্পদ টেনে আনবে।’ (মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস : ১৪০২)

১১. অবিবাহিত থাকলে মানসিক বা শারীরিক রোগ ও জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থাকে।

১২. অবাধ ও অবৈধ যৌনতা এইডসের মতো মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পথ খুলে দেয়। আর বিয়ে তা থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দেয়।

১৩. অবৈধ যৌন সম্পর্ক সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে।

১৪. বিয়ে মানুষকে সংসারী করে। ফলে পুরুষরা দায়িত্বসচেতন ও কর্মমুখী হয়। ভোগের মানসিকতা দূর হয়। তদ্রূপ নারীরাও দায়িত্বসচেতন ও বাস্তবমুখী হয়।

১৫. স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে উৎসাহ দিয়ে সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণের পথ সুগম করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের সময় আকস্মিক ওহিপ্রাপ্তিতে ভয় পেলে হজরত খাদিজা (রা.) তাঁকে অভয় দেন এবং তাঁর পাশে থাকার ঘোষণা দেন।

 

পাত্র-পাত্রীর মধ্যে লক্ষণীয় গুণাবলি

পাত্রের যে গুণাবলি লক্ষণীয়—সুস্থ ও বিয়েতে সক্ষম হওয়া, স্ত্রীর প্রয়োজনীয় খরচ চালানোর উপযোগী, দ্বিনদার, সচ্চরিত্র, স্নেহপরায়ণ হওয়া ইত্যাদি। 

পাত্রীর ভেতর লক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো—দ্বিনদার হওয়া, সচ্চরিত্র হওয়া, স্বামীর অনুগত, বংশমর্যাদাসম্পন্ন, স্নেহপরায়ণ, অধিক সন্তান প্রসবে উপযোগী, সংসারী ও সুন্দরী হওয়া ইত্যাদি। (বুখারি, হাদিস : ৫০৯০; ফাতহুল বারি : ৯/৩৮)

 

পাত্রী দেখার সঠিক পদ্ধতি

ইসলামী শরিয়তে বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখার অনুমতি রয়েছে। এমনকি দেখার নির্দেশও রয়েছে, যাতে পরবর্তী সময় অপছন্দের বাহানায় কেউ সম্পর্ক নষ্ট করার সুযোগ না পায়। বিয়েতে আগ্রহী ব্যক্তির জন্য মেয়ের অগোচরে তাকে দেখে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই সম্ভব হলে মেয়ের অগোচরে শুধু তার মুখমণ্ডল ও হাত দেখে নেবে। আর তা সম্ভব না হলে নির্ভরযোগ্য নারী পাঠিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবেও দেখতে পারে, যাতে কোনো কারণে মেয়েকে অপছন্দ করলে সে লজ্জিত ও মর্মাহত না হয়। সমাজে প্রচলিত মেয়ে দেখানোর অতি আনুষ্ঠানিকতা পরিত্যাগ করা উচিত। এতে মেয়েপক্ষ যেমন লজ্জিত হয়, তেমনি ছেলেপক্ষের ওপর প্রস্তাব গ্রহণের মানসিক চাপ তৈরি হয়। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২০৮২, মিরকাত : ৫/২০৫০, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৪/২০০, আহসানুল ফাতাওয়া : ৮/৫২)

 

সাবালক কনের অনুমতি নেওয়া অপরিহার্য

ইসলামে নারীদেরও পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব দিয়ে তাদের অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এ জন্যই সাবালক মেয়ের বাবাও যদি তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেন, তবে তা শুদ্ধ হবে না। তাই মেয়েকে পাত্রের সার্বিক অবস্থা জানানো এবং বিয়ে বিষয়ে পরিষ্কার মতামত নেওয়া আবশ্যক। সব কিছু জানানোর পর সে মুখে সম্মতি প্রকাশ করলে ভালো, অন্যথায় কুমারী মেয়ের অনুমতি গ্রহণকারী অভিভাবক হলে তার চুপ থাকাও অনুমতি বলে বিবেচিত হবে। পক্ষান্তরে মেয়ে আগে বিবাহিত হলে মৌখিক অনুমতি নেওয়া জরুরি। (আল বাহরুর রায়েক : ৩/১১১)

বিয়ের সুন্নতসম্মত পদ্ধতি

ছেলে-মেয়ে উভয় পক্ষের পরামর্শক্রমে শরিয়তবিরোধী কুপ্রথামুক্ত বিয়ের আয়োজন করা আবশ্যক, যাতে কমপক্ষে দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকবে এবং বিয়ে পরিচালনাকারী খোতবা পাঠের পর উভয় ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুলের (গ্রহণ) আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। উভয় পক্ষের সামর্থ্য ও সম্মান অনুপাতে মোহর ধার্য করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলামী শরিয়ত। বিয়ের আকদ মসজিদে করা সুন্নত। আকদের পর উপস্থিত মানুষের ভেতর কিছু খেজুর বিতরণ করা উত্তম। এরপর কনেকে বরের হাতে সমর্পণ করবে। বাসরযাপনের পর বরপক্ষ সামর্থ্য অনুযায়ী ওলিমা করবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৯, আদ্দুররুল মুখতার : ৩/৮-২১)

 

মজলিসে খেজুর বিতরণের পদ্ধতি

বিয়ে আকদের পর খেজুর নিক্ষেপ করা সুন্নত। তবে মসজিদে বিয়ে হলে মসজিদের সম্মান রক্ষার্থে এবং অন্যান্য পরিবেশেও মজলিসের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে খেজুর নিক্ষেপ না করে বিতরণ করা উচিত। (মুস্তাদরাকে হাকেম : ৪/২২, আসসুনানুল কুবরা, হাদিস : ১৪৬৮৪, তালখিসুল হাবির : ৩/৪২৪, এলাউস সুনান : ১১/১১)

 

স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ ও জামাতে নামাজ আদায়

বিয়ের পর প্রথম সাক্ষাতে স্ত্রীর মাথার অগ্রভাগে হাত রেখে এই দোয়া পড়া সুন্নত— 

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসয়ালুকা খায়রাহা ওয়া খায়রা মা জাবালতাহা আলাইহি। ওয়া আউজু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালবাহা আলাইহে।

একটি হাদিসে স্বামী-স্ত্রী জামাতে নামাজ পড়ে দোয়া করার নির্দেশও পাওয়া যায়। এই দোয়া করবে, ‘হে আল্লাহ! আমাদের পরিবারে বরকত দিন, স্ত্রী থেকে আমাকে উপকৃত করুন এবং আমার থেকে তাকে উপকৃত করুন, যত দিন ভালো হয় আমাদের একসঙ্গে রাখুন এবং যেদিন চিরতরে একে অপর থেকে আলাদা হওয়া ভালো হয় সেদিন আলাদা করুন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৬০, আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৪০১৮)

স্বামী-স্ত্রী জামাতে নামাজ পড়লে স্বামী ইমামতি করবে এবং স্ত্রী তার এক কদম পেছনে দাঁড়াবে। নতুবা নামাজ শুদ্ধ হবে না।

 

স্ত্রীর মন প্রফুল্ল করার চেষ্টা করবে

স্বামী প্রথম সাক্ষাতে স্ত্রীর সঙ্গে এমন কাজ করবে যেন তার মন প্রফুল্ল হয়। যেমন—তাকে দুধ বা শরবত পান করানো ইত্যাদি। হাদিস শরিফে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সময় একটি দুধের পেয়ালা থেকে নিজে কিছু পান করলেন, অতঃপর আয়েশা (রা.)-কে পান করানোর জন্য পেয়ালা এগিয়ে দিলে তিনি লজ্জায় মস্তকাবনত করেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭৫৯১)

 

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের গোপনীয়তা রক্ষা করবে

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরে সংঘটিত লজ্জাজনক কথাবার্তা ও কাজকর্ম বন্ধুবান্ধবের সামনে প্রকাশ করা হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলন করে এবং তার স্ত্রী তার সঙ্গে মিলিত হয়, অতঃপর তার গোপনীয়তা অন্যদের কাছে প্রকাশ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৩৭)

 

শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষরের দ্বারা বিয়ে হয় না

বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইজাব-কবুলের বাক্যগুলো সাক্ষীদের সামনে মৌখিকভাবে বলা আবশ্যক। তাই শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষরের দ্বারা বিয়ে সম্পন্ন হয় না। (রদ্দুল মুহতার : ৩/১২, ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া : ৪/৩১৫)

 

মোবাইলে বিয়ে সম্পন্ন করার সঠিক পদ্ধতি

বিয়ের মজলিসে পাত্র-পাত্রী উপস্থিত থাকা বা তাদের উকিলের দ্বারা দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে আকদ হওয়াই শরিয়তের বিধান। তবে কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে পাত্র-পাত্রীর পক্ষে আকদ কবুল করার জন্য উকিল মনোনীত করবে এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে তারা আকদ করে নিতে পারবে। পাত্র-পাত্রী দূরদেশে থাকা অবস্থায় আকদ করতে হলে নিম্নে বর্ণিত পদ্ধতিদ্বয় হতে কোনো একটি অবলম্বন করবে—

১. পাত্র টেলিফোনে দেশে একজনকে তার পক্ষে উকিল (স্থলাভিষিক্ত) নির্ধারণ করবে। যখন বিয়ের মজলিসে দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে পাত্রীর পক্ষ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অভিভাবক বলবেন, আমি বিদেশে বসবাসকারী অমুকের কাছে এত টাকা মোহরে মেয়েকে বিয়ে দিলাম। তখন উকিল বলবেন, আমি পাত্রের পক্ষে কবুল করলাম।

২. পাত্রীর বাবা বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত অভিভাবক দেশ থেকে টেলিফোনে বিদেশে তাঁর পক্ষে বিয়ে দেওয়ার জন্য একজন উকিল মনোনীত করবেন এবং ওই উকিল সেখানে বিয়ের মজলিসে সাক্ষীর উপস্থিতিতে বলবেন, আমি অমুক মেয়েকে এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলাম। ছেলে তখনই বলবে কবুল করলাম।

ওই পদ্ধতিদ্বয়ের কোনো একটি অবলম্বন করলে বিয়ে হয়ে যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৩১, আদ্দুররুল মুখতার : ৩/১৪, ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১১/১৬১)

 

অডিও বা ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ে

বিয়ে একটি মহৎ কাজ, যা পুরো জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই ইসলামী শরিয়ত তার জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছে। যথা—দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব কবুল (প্রস্তাব গ্রহণ) হওয়া এবং তা একই মজলিসে হওয়া। টেলিফোন-মোবাইল ফোন যতই উন্নত হোক না কেন, তার দ্বারা মজলিসের শর্ত পূর্ণ হয় না বিধায় এতে আকদ সম্পাদন হবে না। তাই আগে উল্লিখিত পদ্ধতিতে মোবাইল ফোনে কোনো ব্যক্তিকে উকিল বানিয়ে এবং উকিল সাক্ষীর সামনে ইজাব কবুল সম্পন্ন করতে হবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ৩/১৪, ফতোয়ায়ে উসমানি : ২/৩০৫)

 

মেসেজ বা ই-মেইলের বিয়ে শুদ্ধ নয়

উভয়ের মধ্যে মেসেজ বা ই-মেইলে শুধু লেখালেখির মাধ্যমে বিয়ে শুদ্ধ হয় না। মেসেজ বা ই-মেইলের মাধ্যমে প্রেরিত বিয়ের প্রস্তাব প্রেরকের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পর দুজন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষীর সম্মুখে তা পাঠ করবে। এতে অপর পক্ষ তা মৌখিকভাবে কবুল করলে বিয়ে শুদ্ধ হবে। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ২/৪৯, রদ্দুল মুহতার : ৩/১২)

 

মোহরের পরিমাণ ও তার সুন্নত

মোহর স্ত্রীর অধিকার। তার ন্যায্য অধিকার সে যেন সঠিকভাবে পায় এবং নারীর যেন অবমূল্যায়ন না হয় তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। মোহরের শরয়ি বিধান হলো, ১০ দিরহামের কম না হওয়া (১০ দিরহামের পরিমাণ বর্তমান হিসাবে পৌনে তিন ভরি খাঁটি রুপা) এবং স্বামীর সামর্থ্যের ঊর্ধ্বে না হওয়া। স্ত্রীর বংশের ও তার সমমানের মেয়েদের মোহরের পরিমাণ বিবেচনা করাও উচিত। মোহরের সর্বোচ্চ কোনো পরিমাণ শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৭৫, মিরকাতুল মাফাতিহ : ৬/৩৫৮)

হজরত উম্মে হাবিবা (রা.) ছাড়া নবী (সা.)-এর অন্যান্য স্ত্রীর মোহর ছিল ৫০০ দিরহাম, যা প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী ১৩১.২৫ ভরি খাঁটি রুপা বা তার সমপরিমাণ বাজারমূল্য। যেহেতু পরিমাণ নির্ধারণে শরিয়ত বিশেষজ্ঞদের ভেতর সামান্য মতবিরোধ রয়েছে, তাই সতর্কতামূলক পূর্ণ ১৫০ ভরি ধরাই ভালো। উম্মে হাবিবা (রা.)-এর মোহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশি আদায় করেছিলেন ৪০০ দিনার, যা বর্তমান হিসাবে দেড় শ ভরি খাঁটি সোনা, অপর বর্ণনায় ৪০০ দিরহাম রুপা। (মুসলিম, হাদিস : ১৪২৬, তিরমিজি, হাদিস : ১১১৪, আবু দাউদ : ২১০৮, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ১৬৩৮৬)

 

মোহরে ফাতেমির বিধান ও তার বাজারদর

স্ত্রীর সম্মান ও স্বামীর সাধ্যানুযায়ী মোহর ধার্য করা সুন্নত। শুধু মোহরে ফাতেমিকেই সুন্নত মনে করা সঠিক নয়। তবে  মোহরে ফাতেমি ধার্য করা বরকতময় ও উত্তম। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী মোহরে ফাতেমির পরিমাণ ৫০০ দিরহাম তথা ১৩১.২৫ ভরি (এক কেজি ৫৩০.৯০০ গ্রাম) খাঁটি রুপা অথবা এর বাজারমূল্য। সতর্কতামূলক ১৫০ তোলা খাঁটি রুপার কথা বলা হয়ে থাকে। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ২৭৪২; ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া : ৩/২১৫; ফতোয়ায়ে রহিমিয়া : ৮/২৩১)

 

মোহর দিতে হয় না ভেবে বেশি ধার্য করার কুপ্রথা

বিয়েতে ধার্য করা মোহর পরিশোধ করা জরুরি। বর্তমান সমাজে অধিক পরিমা মোহর ধার্য এবং তা আদায়ে অনীহার মনোভাব দেখা যায়। মেয়েপক্ষ বিয়ের সম্পর্ক রক্ষার জন্য মোহরের অঙ্ক বাড়ানোর চেষ্টা করে এবং ছেলেরা চিন্তা করে এটি আদায় করতে হবে না। ইসলামী শরিয়তে এমন মনোভাব নিন্দনীয়। কেননা মোহর আদায়ের নিয়তবিহীন বিয়েকে হাদিসে ব্যভিচারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী মোহর ধার্য করা এবং তা যথাসম্ভব দ্রুত পরিশোধ করা শরিয়তের নির্দেশ। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘সর্বোত্তম মোহর হলো, যা আদায় করতে সহজ হয়।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ২৭৪২)

হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা নারীদের মোহরের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কোরো না। কেননা তা যদি দুনিয়ায় সম্মানের ও আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় হতো, তবে আল্লাহর নবী (সা.) এই সম্মানের বেশি উপযুক্ত ছিলেন। অথচ নবী করিম (সা.)-কে নিজের বিয়েতে এবং তাঁর মেয়েদের বিয়েতে ১২ উকিয়ার (৫০০ দিরহাম) বেশি নির্ধারণ করতে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১১১৪)

অতএব সামর্থ্য অনুযায়ী মোহর ধার্য করবে এবং ধার্য করা মোহর পরিশোধ করার সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে পুরুষ বিয়েতে মোহর আদায়ের নিয়তবিহীন মোহর ধার্য করল, চাই তা বেশি হোক বা কম, সে হাশরের দিন আল্লাহর সামনে ব্যভিচারী হিসেবে উপস্থিত হবে।’ (আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ১৮৫১)

 

অনাড়ম্বর ও অপব্যয়মুক্ত বিয়ে চাই

বিয়ে যত অনাড়ম্বর হবে, খরচ যত কম হবে ততই তা বরকতপূর্ণ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সর্বাধিক বরকতপূর্ণ বিয়ে হচ্ছে, যার খরচ যত সহজ ও স্বাভাবিক হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৪৫২৯)

এ ছাড়া অপব্যয় ও অপচয় নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কোরআনে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না। জেনে রেখো, যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই।’ (বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬-২৭)

 

ওলিমা খাওয়ানো সুন্নত

স্বামী-স্ত্রী রাত যাপনের পর শুকরিয়াস্বরূপ স্বামী বা তার নিকটবর্তীদের পক্ষ থেকে মানুষকে খাওয়ানো সুন্নত, যাকে ওলিমা বলে। এতে বিরাট কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই, অপচয় তো নয়ই, বরং প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা করবে। এ ছাড়া আর অন্য কোনো খানার আয়োজন সুন্নতসম্মত নয়। (বুখারি, হাদিস : ২০৪৮)

 

ওলিমায় শুধু ধনীদের দাওয়াত দেওয়া নিষেধ

অনেকেই বিয়েতে শুধু ধনীদের দাওয়াত দেয়, যাতে তারা উপঢৌকন দিতে পারে, গরিব আত্মীয়দের এড়িয়ে যায়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘ওই ওলিমার খাবার সর্বনিকৃষ্ট, যাতে দরিদ্রদের বাদ দিয়ে শুধু ধনীদেরই দাওয়াত দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৭৭)

 

ওলিমা অনুষ্ঠানে উপহারসামগ্রী গ্রহণ

বর্তমানে দেখা যায়, বিয়ের অনুষ্ঠানে উপহার গ্রহণের জন্য ক্যাম্প খুলে বসে। এটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও নিম্নরুচির পরিচায়ক। এতে আগত মেহমানরা লজ্জায় পড়ে যায়। যেসব উপঢৌকন দেওয়া হয়, তা যদি চক্ষুলজ্জার খাতিরে বা সামাজিক চাপে বা সুখ্যাতি কিংবা তার বিনিময় পাওয়ার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তাহলে তা গ্রহণ করা অবৈধ। আর যদি প্রফুল্লচিত্তে ভালোবাসার স্মারকস্বরূপ দেওয়া হয় এবং না দিলে কোনো ধরনের অপমান করা না হয়, তাহলে ওই উপহারসামগ্রী গ্রহণ করা বৈধ। (সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ১১৫৪৫; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ৪/৩৮৩)

 

বরযাত্রী আগমন ও আপ্যায়ন

বিয়ে উপলক্ষে বরযাত্রী গমন ও মেয়ের বাড়িতে আপ্যায়ন যদি কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতাহীন এবং সানন্দে হয়, তাহলে তা বৈধ, অন্যথায় অবৈধ। কিন্তু বর্তমানে বরযাত্রী গমন ও মেয়ের বাড়িতে খাবারের আয়োজনের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা খুবই নিন্দনীয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি মেয়ের পরিবারের প্রতি অবিচার। সুতরাং এমন কাজ পরিহার করা উত্তম। (আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস : ১১৫৪৫, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ : ৭/৫২২)

 

বিয়েতে শরিয়তবিরোধী কাজের আশঙ্কা থাকলে দাওয়াত গ্রহণের বিধান

যেসব বিয়েতে গান-বাজনা, বেপর্দা-বেহায়াপনা, আতশবাজি ইত্যাদি শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় বা হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, জেনে-শুনে সেই দাওয়াতে অংশগ্রহণ বৈধ নয়, বরং কৌশলে এমন বিয়ের দাওয়াত এড়িয়ে যাবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৭৭৪, বাদায়েউস সানায়ে : ৫/১২৮)

মন্তব্য