kalerkantho

দেশে দেশে ইসলামী জাদুঘর

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



দেশে দেশে ইসলামী জাদুঘর

জাদুঘর জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক, সভ্যতা-সংস্কৃতির স্মারক এবং ইতিহাসের সাক্ষী। সমকালে দাঁড়িয়ে অতীত জানার সর্বোত্কৃষ্ট মাধ্যম জাদুঘর। ইসলামী ইতিহাসের সমৃদ্ধ অধ্যায় মানুষের সামনে তুলে ধরতে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক সমৃদ্ধ ইসলামী জাদুঘর। বর্তমান বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কয়েকটির পরিচয় তুলে ধরেছেন আতাউর রহমান খসরু

 

কাতারে সর্বাধুনিক ইসলামী জাদুঘর

কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট’কে বলা হয় সবচেয়ে আধুনিক ইসলামী জাদুঘর। প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষ কাতারের জনপ্রিয় এই জাদুঘরটি পরিদর্শন করে। জাদুঘরের দৃষ্টিনন্দন ভবনে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। পাঁচতলা জাদুঘরে প্রদর্শন হল ছাড়াও রয়েছে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা অজু ও নামাজের স্থান। এই জাদুঘরের নকশা করেছেন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন স্থপতি আইএম পাই। ৯১ বছর বয়সে ৪৫ হাজার বর্গমিটারের বিশাল ভবনের নকশা করেন। নকশা চূড়ান্ত করার আগেই তিনি বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে প্রায় ছয় মাস ভ্রমণ করেন। পরিদর্শন করেন বিভিন্ন জাদুঘর ও মুসলিম স্থাপত্য। জানার চেষ্টা করেন মুসলিম ইতিহাস। স্থানটি বেছে নেন দোহা উপসাগরের তীরকে। যেন ভবিষ্যতে কোনো উঁচু স্থাপনা ভবনটিকে ঢেকে না দেয়। জাদুঘরের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০০ সালে। ২০০৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও ২০০৮ সালে তা সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়।

জাদুঘরের অভ্যন্তরে জায়গা হচ্ছে প্রায় চার লাখ স্কয়ার ফিট। পাঁচতলা এই জাদুঘরের ভেতরের অংশগুলো অদ্ভুতভাবে কাচ দিয়ে সাজানো। যার একপাশ থেকে আরেকপাশে যেতে হয় কাচের তৈরি সিঁড়ি দিয়ে। মাঝখানে রয়েছে ১৬৪ ফুট উঁচু গম্বুজ।

পাঁচতলা জাদুঘরে আরব ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র, শিলালিপি, তৈজসপত্র, গহনা, অস্ত্র, বইয়ের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ অনুযায়ী আলাদা গ্যালারিতে ভাগ করা হয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগের জন্য রয়েছে আলাদা শিল্প গ্যালারি। মধ্য এশিয়া ও ইরানের ১২-১৬তম শতাব্দীর স্থাপত্যশিল্পের জন্য দুটি আলাদা গ্যালারি। মিসর ও সিরিয়ার ১২-১৫তম শতাব্দীর স্থাপত্যশিল্পের জন্য দুটি আলাদা গ্যালারি। ইরানের ১৬-১৯ শতকের আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের আলাদা গ্যালারিও।

জাদুঘরে স্থান পাওয়া সামগ্রীর ভেতর ধাতব বস্তু, কারুশিল্প সামগ্রী, কার্পেট, পাথর, সিরামিক পণ্য, কোরআনের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা, জুয়েলারি, অস্ত্র, কয়েন, কাচের জিনিসসহ ইসলামীশিল্পের নানা নিদর্শন। জাদুঘর ভবনেই একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। যাতে আরবি ও ইংরেজি ভাষার দেড় লাখের বেশি বই রয়েছে। এবং প্রায় ২০০ বিরল বই রয়েছে, যা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। পাঠাগারে শিশুদের পৃথক পাঠ কর্নার স্থাপন করা হয়েছে।

এ ছাড়া জাদুঘর কমপ্লেক্সে গিফট শপ, রেস্টুরেন্ট ও বাইরে উন্মুক্ত পার্ক রয়েছে। রেস্টুরেন্টে আরবি, ফরাসি ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মজাদার খাবার পাওয়া যায়। গিফট শপে জুয়েলারি, বই, ঘর সজ্জার নানা জিনিস, মোমবাতি, শো পিসসহ নানা ধরনের জিনিস পাওয়া যায়। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে আর্থিক লেনদেনের জন্য এটিএম বুথ, যোগাযোগের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই কানেকশন, ফ্রি গাইড লাইন এবং অভ্যর্থনা ও তথ্য অনুসন্ধান কেন্দ্রও রয়েছে। জাদুঘর সীমানায় দুই লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটারের বিশাল পার্ক স্থাপন করা হয়েছে, যা কিনা ২৪ ঘণ্টা মানুষের জন্য খোলা থাকে।

 

জেরুজালেমের ঐতিহাসিক ইসলামী জাদুঘর

তিন ধর্মের তীর্থ পবিত্র শহর জেরুজালেম। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি তিন আসমানি ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী এই শহর। প্রাচীন এই শহরেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ইসলামী জাদুঘর। ঐতিহাসিক আল আকসা মসজিদের সন্নিকটেই অবস্থিত ইসলামী জাদুঘর। ১৯২২ সালে জেরুজালেমের হায়ার ইসলামিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী জাদুঘর এবং এটি জেরুজালেমের প্রথম জাদুঘর। আল আকসা মসজিদে সংরক্ষিত প্রাচীন নিদর্শনাবলি নিয়ে যাত্রা শুরু করে জাদুঘরটি। পরবর্তী সময়ে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী অনেক নিদর্শন ও স্মারক উপহার হিসেবে পায় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, আকসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাব, অত্র অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন মুদ্রা ও তৈজসপত্র ইত্যাদি স্থান পেয়েছে জাদুঘরটিতে।

ঐতিহাসিক এই জাদুঘরের ভবনটিও কম ঐতিহাসিক নয়। জাদুঘরের প্রধান কক্ষ দুটি, যার একটি মামলুক শাসনামলে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য মসজিদ হিসেবেই তা নির্মাণ করা হয়। ৫৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ মিটার প্রস্থ ভবনটি নির্মাণ করেন শেখ ওমর ইবনে আবদুন নবী আল মাগরিবি আল মাসউদি ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে। তবে এর প্রবেশ পথটি উসমানীয় শাসনামলে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে সংস্কার করা হয়। দ্বিতীয় কক্ষটির দৈর্ঘ্য ১৭ মিটার এবং প্রস্ত ৩৫ মিটার। এটি ফাতেমীয় শাসনামলে মহিলাদের নামাজের জন্য তা নির্মাণ করা হয়। ফাতেমীয়দের কাছ থেকে ইউরোপীয়রা আকসা দখল করলে তারা তা সংস্কার করে সামরিক বাহিনীর কাজে ব্যবহার করত।

ইসলামী শাসনের স্বর্ণযুগের দুর্লভ ও হাজার বছরের প্রাচীন অনেক নিদর্শন রয়েছে জেরুজালেম ইসলামী জাদুঘরে। উত্তর আফ্রিকা, মিসর, সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশ থেকে এসব নিদর্শন ও স্মারক সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে উমাইয়া আমলের কাঠের সেট, ১৯৬৯ সালে ইসরায়েলের দেওয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া নূর আল দ্বিন মিম্বরের ধ্বংসাবশেষ, মামলুক আমলের মূল্যবান নথিপত্র (প্রায় এক হাজার), ধাতব, মার্বেল ও টাইলস। এ ছাড়া রয়েছে কুফি, নকশি ও থোলথ আরবি লিপির একাধিক ক্যালিগ্রাফি।

দুর্লভ ও ঐতিহাসিক কোরআনের সমৃদ্ধ সংগ্রহ জেরুজালেম ইসলামী জাদুঘরের গর্বের বিষয়। এখানে রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.)-এর ছেলে হাসসান (রহ.)-এর কোরআনের ব্যক্তি কপিটি। এ ছাড়াও সুলতান সোলায়মান আল কানুনি, সুলতান বায়েজিদ, সুলতান বার্সবি ও মরক্কোর বাদশার স্মৃতিবাহী কোরআনের কপি রয়েছে এই জাদুঘরে, যা তাঁরা মসজিদুল আকসায় উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।

জেরুজালেম জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন সময়ে আল আকসায় ব্যবহৃত সুনিপুণ কারুকাজের কাঠের প্যানেলগুলোর প্রতি রয়েছে দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ। প্রায় ৩০০ প্যানেল রয়েছে এখানে। প্যানেলগুলো প্রকৃতপক্ষে শাসকগোষ্ঠীর রুচি ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করছে। মামলুক, ফাতেমি ও উসমানীয় সবাই নিজ নিজ দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অনুযায়ী আল আকসা মসজিদ সুশোভিত করেছিলেন। কাঠের প্যানেলের কোনো কোনোটি ১৯৬৯ সালের নৃশংস অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।

 

বাহরাইনে কোরআনের বিশেষ জাদুঘর

বিশ্বের ইসলামী জাদুঘরগুলোর ভেতর বিশেষ মর্যাদার দাবিদার বাহরাইনের কোরআন জাদুঘর ‘আল হায়াত মিউজিয়াম’। দুষ্প্রাপ্য সব কোরআনের কপি ও কোরআনসংশ্লিষ্ট বিষয় দিয়ে সাজানো এই জাদুঘরটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮৪ সালে। মার্চ ১৯৯০ সালে তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বিশেষায়িত জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্ট কোরআন গবেষক ড. আবদুল লতিফ জাসিম কানো। বলা যায়, এটা তাঁর ব্যক্তিগত জাদুঘর। দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও সাধনায় তিনি কোরআনের বিরল ও মূল্যবান বহু রকমের কপি সংগ্রহ করেছেন। যার মধ্যে হাতে লেখা অনেক প্রাচীন পাণ্ডুলিপিও রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, ইসলামী বইয়ের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও ইসলামিক আর্টের বিরল সংগ্রহ জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেছে। 

ড. আবদুল লতিফ জাসিম কানোর ব্যক্তিগত সংগ্রহ দিয়ে জাদুঘরের যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময় প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও বিভিন্ন স্মারক ও নিদর্শনাবলি সংগ্রহ করা হয়েছে। চীন থেকে স্পেন পর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে তা একত্র করেছে কর্তৃপক্ষ। এ সময় তাঁরা বিশ্বের একাধিক ভাষায় অনূদিত কোরআনের কপিও সংগ্রহ করেন। হিজরি প্রথম শতকেরও (৬২২-৭২২ খ্রিস্টাব্দ) ক্যালিগ্রাফি ও পাণ্ডুলিপি কোরআন জাদুঘরে। হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে সংকলিত প্রথম কোরআনের মূল্যবান কপিটি এই জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাতে অংশগ্রহণ রয়েছে সাধারণ মানুষেরও। বাহরাইনের সর্বশ্রেণির মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে কোরআন জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছে। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে স্কুল শিক্ষার্থী সবাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছে। তাই জাদুঘর কর্তৃপক্ষও সেবার বিপরীতে মানুষের কাছ থেকে কোনো মূল্য গ্রহণ করে না।

১২ শতকের মসজিদের আদলে গড়ে তোলা বাইতুল কোরআন কমপ্লেক্সে জাদুঘর ছাড়া আরো রয়েছে মসজিদ, ইসলামী স্কুল, পাঠাগার ও সভাকক্ষ। পাঠাগারে আরবি, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় রচিত প্রায় ৫০ হাজার বই রয়েছে। সভাকক্ষে ধারণক্ষমতা দেড় শ জন। কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত ইসলামী স্কুলটিও একটি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দ্য ইউসুফ বিন আহমদ কানো স্কুলে মূলত কোরআনিক স্টাডিজ পড়ানো হয়। সাতটি পৃথক শ্রেণিকক্ষে কোরআন শেখানো হয়। নারী ও শিশুদের কোরআন শেখার জন্য রয়েছে পৃথক শ্রেণিকক্ষ।

 

বার্লিনে ইউরোপের বৃহৎ ইসলামী জাদুঘর

ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ জাদুঘর বার্লিন পারগামুন মিউজিয়াম। কায়রো জাদুঘরের পর এটাই পৃথিবীর প্রাচীনতম জাদুঘর। প্রায় ৯৩ হাজার স্মারক রয়েছে সেখানে। এই জাদুঘরের ইসলাম ও মুসলিমসংশ্লিষ্ট অংশকে পৃথক করে ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নতুন জাদুঘর ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট’। তবে সম্পূর্ণ পৃথক হয় ১৯৫০ সালে। যেখানে ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী নিদর্শন রয়েছে। যেমন—উমাইয়া যুগে ব্যবহৃত তৈজসপত্র, যা আরব ও চীনের মিশ্র শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম শতকের কোরআন, তরবারি, বর্ম ইত্যাদি। পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণীও লেখা আছে জাদুঘরের দেয়ালে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সব কিছুই এখানে স্থান পেয়েছে।

বার্লিনে অবস্থিত ইসলামিক জাদুঘরে স্পেনের বিখ্যাত আল হামরা প্রাসাদসহ মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রতিলিপি স্থান পেয়েছে।  ইসলামিক জাদুঘরে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। যেখানে ইসলামী শিল্পকলা ও প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। মাঝেমধ্যে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ইসলামী চিত্রকলার বিশেষ প্রদর্শনীরও আয়োজন করে। ইসলামী ইতিহাসের ধারাক্রম অনুযায়ী স্মারকগুলো সাজানো হয়েছে। যেন খুব সহজেই দর্শক ধারণা লাভ করতে পারে। ইসলামিক মিউজিয়াম এখনো পারগামুন মিউজিয়াম ভবনেই অবস্থিত। ২০২০ সালে নিজস্ব ভবনে যাবে তা। স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখনো যেসব নিদর্শন ও স্মারক প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না, নিজস্ব ভবনে গেলে তা উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।

 

 

মক্কায় একাধিক ইসলামী জাদুঘর

 

দর্শনার্থীদের দাবি, মক্কার ইসলামী জাদুঘরের নাম বাদে বিশ্বের ইসলামী জাদুঘরের তালিকা পূর্ণ হবে না। আর তা হবেও বা কিভাবে? ইসলামের জন্মভূমির ইতিহাস-ঐতিহ্য ব্যতীত কি ইসলামী জাদুঘরের পূর্ণতা দান সম্ভব? অবশ্য ‘দ্য সৌদি কমিশন ফর ট্যুরিজম অ্যান্ড ন্যাশনাল হেরিটেইজের তালিকায় মক্কা নগরীর বেশ কয়েকটি জাদুঘরের নাম রয়েছে। প্রতিবছর হজ ও উমরাহ পালন করতে আসা লাখ লাখ হাজি এসব জাদুঘর পরিদর্শন করেন। মক্কায় অবস্থিত আল হারামাইন জাদুঘর রয়েছে দর্শনার্থীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। সাতটি হলরুমের বিশাল এই জাদুঘরে রয়েছে কাবার প্রাচীন দরজাগুলো, হাতে আঁকা কোরআন, দুষ্প্রাপ্য ছবি, ইসলামী স্থাপত্যের নমুনা ইত্যাদি। এ ছাড়া এখানে রয়েছে, প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট, প্রাচীন শিলালিপি, প্রাসাদ ও হজের যাত্রাপথের ছবি।

মক্কা জাদুঘরে আঞ্চলিক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, এই অঞ্চলে মানববসতি স্থাপনের ইতিহাস, আরবি ভাষা, সাহিত্য, হস্তলিপির বিকাশ সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের। ইসলামী শাসনামলের অনেক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই জাদুঘরে। যেমন—শাসকদের ব্যবহৃত পাত্র, চীনা মাটির বাসনপত্র, গহনা ও মুদ্রা।

মক্কা জাদুঘরের অদূরেই রয়েছে জেদ্দা জাদুঘর। ইসলামী ইতিহাসের প্রায় একই রকম স্মারক ও নিদর্শনাবলি এখানে প্রদর্শন করা হয়। মক্কা, তায়েফ ও জেদ্দায় বেশ কিছু পারিবারিক জাদুঘরও রয়েছে। যেগুলো মালিক তাঁর পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়েছেন। যেমন, মুদ্রা জাদুঘর। যেখানে প্রাচীন ও আধুনিককালের দুর্লভ মুদ্রা সংরক্ষণ করা হয়েছে। একইভাবে গৃহস্থালি, কৃষি, খাবার, কাপড় ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের একাধিক পারিবারিক জাদুঘর রয়েছে এই অঞ্চলে।

তবে রহস্যজনক ব্যাপার হলো, সৌদি সরকারের তালিকায় নেই জেদ্দার সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামী জাদুঘর ‘আবদুর রউফ খলিল মিউজিয়াম’।  জাদুঘর, প্রাসাদ ও মসজিদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই কমপ্লেক্সে তুলে ধরা হয়েছে আরব জাতির হাজার বছরের ইতিহাস। এখানে রয়েছে দ্য হোম অব সৌদি অ্যারাবিয়ান হেরিটেইজ, দ্য হোম অব ইসলামিক হেরিটেইজ ও দ্য হোম অব ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেইজ। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন জাতি ও সভ্যতার নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এই জাদুঘরে। যার ভেতর আড়াই হাজার বছরের পুরনো নিদর্শনও রয়েছে। বিশেষত উসমানীয় শাসনামলের বিপুলসংখ্যক নিদর্শন রয়েছে আবদুর রউফ খলিল মিউজিয়ামে।

 

মালয়েশিয়ার দৃষ্টিনন্দন ইসলামী জাদুঘর

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ইসলামী জাদুঘরের গর্বিত মালিক মালয়েশিয়া। ‘দ্য ইসলামিক আর্টস মিউজিয়াম’টি রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবিস্থত। পাহাড়ের চূড়ায় জাতীয় মসজিদের ঠিক বিপরীতে। ১৯৯৮ সালে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া জাদুঘরটি খুব অল্প দিনেই পর্যটকদের আকর্ষণে পরিণত হয়। ১২টি প্রদর্শনকক্ষে প্রায় সাত হাজার স্মারক ও নিদর্শন রয়েছে। যার মধ্যে হাতে লেখা কোরআন, ইসলামী স্থাপত্যের প্রতিরূপ, গহনা, চীনা মাটি, কাচের পাত্র, বস্ত্র, অস্ত্র, বর্ম ইত্যাদি। বিষয় ও সময়কাল হিসেবে গ্যালারিগুলো ভাগ করা হয়েছে। জাদুঘরে চীনা ও মালয় মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে। এ ছাড়া জাদুঘর কমপ্লেক্সে রয়েছে গবেষণাকেন্দ্র, আলোচনা কক্ষ, শিশু ও গবেষকদের জন্য পৃথক পাঠাগার, বিক্রয়কেন্দ্র ও রেস্টুরেন্ট। ৩০ হাজার স্কয়ার ফিটের সুবিশাল এই ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ ফ্লোরকে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তৃতীয় ফ্লোরে রয়েছে কোরআন ও পাণ্ডুলিপি, ইসলামী স্থাপত্য, ভারতীয়, চীনা ও মালয় গ্যালারি। চতুর্থ ফ্লোরে রয়েছে গহনা, অস্ত্র, বর্ম ও সিরামিকস গ্যালারি।

 

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইসলামী জাদুঘর

দ্য ইসলামিক মিউজিয়াম অব অস্ট্রেলিয়া প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১০ সালে। এটাই অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইসলামী জাদুঘর। অস্ট্রেলীয় সমাজে মুসলমানের ভূমিকা তুলে ধরাই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। তাই অস্ট্রেলীয় মুসলিমদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ইসলামী জাদুঘরের ডিজাইন করেছে বিখ্যাত ডিজাইন হাউস ডসাইফার। মুসলিম স্থাপত্য রীতি ও অস্ট্রেলিয়ান সংস্কৃতির মিশেলে নির্মাণ করা হয়েছে জাদুঘরের ভবন। জাদুঘর নির্মাণে অর্থ সরবরাহ করেছে যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়ান সরকার, ফাহুর পরিবার ও মুসলিম কমিউনিটি। আর এর মূল উদ্যোক্তা ফাহুর পরিবার। জাদুঘর নির্মাণে ফাহুর পরিবার চার মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ফাহুর পরিবারের সদস্য মোস্তফা ফাহুর জাদুঘরের বর্তমান পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় মেলবোর্নে অবস্থিত দ্য ইসলামিক মিউজিয়াম।

স্থানীয় মুসলিম সংস্কৃতি তুলে ধরার পাশাপাশি দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মুসলিম শিল্পীদের সহযোগিতা করা জাদুঘরের অন্যতম লক্ষ্য। মুসলিম শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য জাদুঘরে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী গ্যালারি। জাদুঘরের স্থায়ী গ্যালারিতে রয়েছে মূল্যবান ও চমৎকার সব শিল্পকর্ম। অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ইতিহাস গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে সেসব মালয়-ফিলিপিন জেলে ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কথা, যাদের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামের আগমন ও প্রচার-প্রসার হয়েছিল। এ ছাড়া সেখানে আফগান উটচালক, মালয় মুক্তা শিকারি, আলবেনিয়ান কৃষকসহ মুসলিম বিশ্বের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার আলোকচিত্র রয়েছে। মূলত যা ইসলামিক মিউজিয়াম অব অস্ট্রেলিয়া প্রকাশিত প্রামাণ্যচিত্র  ‘বাউন্ডলেস প্লেইনস’ (২০১১ সালে প্রকাশিত) থেকে নেওয়া হয়েছে।

 

মিসরে সর্ববৃহৎ ইসলামী জাদুঘর

প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসর। পিরামিড ও জাদুঘরের দেশও বলা হয় দেশটিকে। মিসরের পিরামিড ও জাদুঘরের প্রতি আগ্রহ রয়েছে বিশ্বের ভ্রমণপ্রেমী মানুষের। এই মিসরেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন, বৃহৎ ও সমৃদ্ধ ইসলামী জাদুঘর। ইসলামী ইতিহাসের সাক্ষী লক্ষাধিক নিদর্শন রয়েছে এখানে। মিসর ও আরব ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র, শিলালিপি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বিচিত্র সব নিদর্শনে সমৃদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘরের বেসমেন্টে রয়েছে স্টোর এরিয়া। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় রয়েছে প্রদর্শনী কক্ষ। প্রদর্শিত স্মারকের মধ্যে ধাতব বস্তু, কারুশিল্প সামগ্রী, কার্পেট, পাথর, সিরামিক পণ্য, কোরআনের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা, জুয়েলারি, অস্ত্র, মসজিদের মিহরাব প্রভৃতি অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, বইয়ের কপি, চিত্রকলা, ধাতু ও চীনা মাটির তৈজসপত্র, গহনা, অস্ত্র, হাতির দাঁতের জিনিস। বর্তমানে জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় দেড় লাখ মূল্যবান সম্পদ। রয়েছে ২৫টি জাদুঘরের হল।

বিশাল জাদুঘরটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রবেশদ্বার পেরোলেই চোখে পড়বে ইসলামী খিলাফতের প্রতিটি যুগের গল্প। যেমন উমাইয়া, আব্বাসি, আয়ুবি, মামলুক ও উসমানীয়। এসব সাম্রাজ্যের অধিপতি, তাদের পরিবার, অর্জন, তাদের স্থাপত্য, বিভিন্ন শৈল্পিক প্রভাব ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে। অপর ভাগে রয়েছে ইসলামী বিশ্বের ব্যবহৃত সমস্ত উপকরণ, যেমন—বস্ত্র থেকে কার্পেট, জানালা-দরজার ফ্রেম, বিভিন্ন সিরামিকের টুকরা, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম।

১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সংস্কারও করা হয়েছে কয়েকবার। প্রতিবারের সংস্কারে নতুনত্ব এসেছে জাদুঘরে। প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পে ভরপুর জাদুঘরে গবেষণা ও অধ্যয়নের জন্য রয়েছে বিশাল পাঠাগার। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা ও দেড়টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মধ্যবর্তী সময়ে নামাজের জন্য বন্ধ থাকে।

ইতিহাসের আলোকে কায়রো ইসলামী জাদুঘরের ধারাক্রম নিম্নরূপ। ১৮৮০ সালে মুইজ স্ট্রিটে অবস্থিত আল হাকিম মসজিদের পাশে অল্প কিছু সংগ্রহ কয়েকটি মসজিদের মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রদর্শন করা হয়। ১৮৯২ সালে নাম দেওয়া হয় ‘আরব মিউজিয়াম’। ১৯৫১ সালে আবারও নাম পরিবর্তন করে ‘হাউস অব অ্যারাবিয়ান অ্যান্টিকুইটিস’ রাখা হয়। ১৯০৩ সালে মিসরের রাজধানী কায়রোতে জাদুঘরের নিজস্ব ভবন তৈরি করা হয়। ১৯৫২ সালে নামকরণ করা হয় ‘মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট’। ১৯৮৩ সালে জাদুঘর সম্প্রসারণ করা হয়। ২০০৩ সালে সংস্কারের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১০ সালে সাত বছর পর উন্মুক্ত করা হয়। ২০১৪ সালে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৬ সালে নতুন করে কিছু অংশ পুনর্নির্মাণ করে আবার চালু করা হয়।

মন্তব্য