kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

মানসিক রোগীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

২৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মানসিক রোগীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

আমাদের সমাজে এমন একটি শ্রেণি আছে, যাদের অনেকেই অবজ্ঞা করে। তাদের অধিকারের ব্যাপারে সম্পূর্ণ গাফিল। অনেক সংস্থা-প্রতিষ্ঠান নারী ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলে। এমনকি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো পশু অধিকার নিয়েও আন্দোলন করে। অনেক প্রতিবেদন, পরিসংখ্যানে তাদের আলোচনা ব্যাপকভাবে উঠে আসে। কিন্তু আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়ে কারো কোনো তৎপরতা নজরে পড়ে না। সমাজের অবহেলিত এই শ্রেণি নিয়ে কেউ কলম ধরে না। অথচ তাদের সংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশ।

মানসিকভাবে অসুস্থ এই মানুষগুলোকে আমরা রাস্তায় অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখি। তাদের দেখা মেলে হাসপাতালে। কখনো পরিবারের লোকজন ঘরের কোণে বা বারান্দায় শিকল দিয়ে তাদের বেঁধে রাখে।

এসব তাদের ওপর এক ধরনের অবিচার। গবেষণা বলছে, ৮১ শতাংশ স্মৃতিভ্রম সৃষ্টি হয় পরিবেশগত কারণে। স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর, পিতার সঙ্গে পুত্রের এবং মালিকের সঙ্গে শ্রমিকের অসংগতিপূর্ণ আচার-আচরণ এর জন্য দায়ী। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাপ্রবাহ স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়। ফলে একসময় সে পাগল হিসেবে পরিচিতি পায়। ৬ শতাংশ মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয় জন্মগত কারণে; যেমন—মা-বাবার ক্রমোজম বা জীবগত সমস্যা।

এ ছাড়া গর্ভকালীন মায়ের দেহে আঘাত লাগা, রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়া, মায়ের নেশাদ্রব্য গ্রহণ ও ক্ষতিকর ওষুধ সেবনের কারণে গর্ভের শিশুর ক্ষতি হয়। ফলে সে বিকৃতমস্তিষ্ক অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়।

অনেক সময় আলো-বায়ুর দূষণজনিত কারণেও হয়ে থাকে। আবার গর্ভবতী মায়ের মানসিক টেনশনের কারণেও হয়ে থাকে। গর্ভকালীন মায়ের পুষ্টিহীনতা, দূষিত খাদ্য গ্রহণ আরেকটি কারণ। শিশুর জন্মকালে অক্সিজেনের পরিমাণ কম হলে শিশু মস্তিষ্কে আঘাত পায়। ফলে তার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটে। অনেক সময় মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় শিশু শারীরিক আঘাত পায়।

জন্মের পরও মানসিক রোগী হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে; যেমন—পুষ্টিহীনতা, নোংরা পরিবেশ, বিভিন্ন দুর্ঘটনা, রোগব্যাধি, খাদ্যে বিষক্রিয়া ইত্যাদির কারণেও শিশুর মানসিক বিকৃতি ঘটে। অনেক সময় মাথায় আঘাত ও মস্তিষ্কজনিত রোগের কারণেও জন্মান্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশ মানসিক রোগী, যাদের আমরা পাগল বলতে পারি। তাদের অধিকার নিয়ে আলোচনা অবশ্যই করতে হবে। তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য কী, কেমন হবে তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ—এসব নিয়ে কথা বলতে হবে।

আল্লাহ তাআলা কি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না যে তুমি তখন কী করেছিলে, যখন সে নির্যাতিত হচ্ছিল? ক্ষুধার জ্বালায় চিৎকার করছিল? (অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন) সুতরাং যখন আমার প্রতিবেশী তার পাগল ছেলের সঠিক দেখভাল করে না, কখনো তাকে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় বেঁধে রাখে, খাবার, পানীয় দেয় না—তখন আমার কী করণীয়?

আসলে সুস্থ-সুন্দর ও অনুকূল পরিবেশের ফলে শিশুর মেধাশক্তির বিকাশ হয়। কিন্তু দুঃখজনক যে কোনো শিশু যদি জন্মগতভাবে মেধাহীন হয় বা তার বোধশক্তি কম থাকে তখন পরিবার তাকে অবজ্ঞা করে। তার মেধা বিকাশের সৃজনশীল পদক্ষেপ নেয় না। ফলে সে সারা জীবন নির্বোধই থেকে যায়। পড়াশোনায় সবার থেকে পিছিয়ে পড়ে।

 

অতীতে মুসলিম মনীষীরা পাগলের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করতেন

ইমাম ইবনে জাওজি ‘সিফাতুত সাফওয়া’ নামক কিতাবে ‘নির্বাচিত জ্ঞানী পাগলবৃন্দ’ নামক অধ্যায়ে তদানীন্তন অনেক প্রসিদ্ধ পাগলের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। সেসব কাহিনির আলোকে বোঝা যায়, তদানীন্তনকালে তাদের মর্যাদা ও সম্মান ছিল। তারা সমাজ থেকে মার্জিত কোমল আচরণ লাভ করেছে। সমাজ তাদের অনেক চিন্তাচেতনার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করত। এমনকি খলিফারা তাদের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। বর্ণিত আছে, একবার বাহলুল নামক পাগলের পাশ দিয়ে খলিফা হারুনুর রশিদ অতিক্রম করেন। তখন বাহলুল খলিফার সম্মানে কিছু কবিতা আবৃত্তি করে। এতে খলিফা খুশি হয়ে তাকে পুরস্কার দিতে চাইলে সে প্রত্যাখ্যান করে।

এই হচ্ছে ইসলামের মহত্ত্ব, যা পাগলদের সঙ্গেও সৌজন্যমূলক রীতিনীতির শিক্ষা দেয়।

আরেকবার বাহলুলের পাশ দিয়ে খলিফা হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখন খলিফা বলেন, হে বাহলুল, আমাকে নসিহত করো।

বাহলুল বলল, হে খলিফা! আপনার কতজন পিতৃপুরুষ রাজ্য শাসন করেছে?

খলিফা : অনেক।

বাহলুল : তাদের প্রাসাদ কোথায়?

খলিফা : ওই তাদের প্রাসাদ।

বাহলুল : তাদের কবর কোথায়?

খলিফা : এই তো তাদের কবর (তখন খলিফা কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন)।

বাহলুল : হে খলিফা! ওই হচ্ছে তাদের প্রাসাদ। আর এই তাদের কবর। এসব দেখেও কি আপনি উপদেশ গ্রহণ করবেন না? আপনি আজকে প্রাসাদের হেরেমে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন, অথচ আগামীকাল কবরে যাবেন। তা সত্ত্বেও কেন কবরের জীবন সুখময় হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন না?

এর মানে হলো, বহু মানুষ পাগলবেশে থাকলেও তাদের মধ্যেও ন্যূনতম মেধা ও বোধশক্তি রয়েছে।

পাগলদের সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর একটি ঘটনা স্মরণীয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) পাগলদের উত্তম আহার্য দান করতেন। একবার তাঁর কাছে একজন পাগল এলো। তিনি উত্কৃষ্ট খাদ্য পরিবেশন করালেন। লোকেরা প্রশ্ন তুলল, হে ইবনে উমর, সে তো পাগল। সে ভালো খাবারের মর্ম বুঝবে না। সুতরাং কেন তাকে এত দামি খাবার দিচ্ছেন? তখন তিনি উত্তর দিলেন, আমি জানি সে বুঝবে না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো জানবেন যে আমি সর্বোত্কৃষ্ট খাবার দিয়ে তাকে আহার্য দান করেছি। (সুবহানাল্লাহ!) এই ছিল মানসিক প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে পূর্বসূরিদের আচার-ব্যবহার।

 

পাগলের প্রতি আমাদের করণীয়

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে আমাদের অনেক কিছু করণীয় আছে। এখানে তা আলোচনা করা হলো—

এক. পাগলদের অবজ্ঞা না করে নিজের সুস্থতার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। পাগলদের সঙ্গে আমাদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে সওয়াবের প্রত্যাশা করতে হবে।

যেসব মা-বাবা এই বিপদে পড়েছেন তাঁদের উচিত রাগান্বিত না হয়ে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তোমার যে ফায়সালা করেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকো। তাহলেই মুমিন হতে পারবে।’

ওপরের হাদিসে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকাকে ঈমানের আলামত বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

কোনো মুমিনের দেহে সামান্য কাঁটা বিঁধলেও বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার গুনাহ মাফ করে দেন। সুতরাং কারো সংসারে যদি এমন মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু থাকে, যাকে অনেক কষ্ট স্বীকার করে পরিচর্যা ও দেখাশোনা করতে হয়, যার কারণে বাসা থেকে বের হওয়া যায় না, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে এই কষ্টের বিনিময়ে মহা পুরস্কারে ভূষিত করবেন।

দুই. পাগলের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করতে হবে। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘নম্রতা ও কোমলতা প্রতিটি জিনিসের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। পক্ষান্তরে নম্রতার অনুপস্থিতি সেই জিনিসকে কলুষিত করে।’ সুতরাং তার প্রতি কর্কশভাষী হওয়া যাবে না। তাকে অন্যদের মতো প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা যাবে না। বাগিবতণ্ডা এড়িয়ে যেতে হবে।

তিন. তাদের সুস্থতার দোয়া করতে হবে। আল্লাহ চাহে তো তাদের জন্য আমাদের দোয়া কাজে আসবে।

চার. মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুকে শারীরিক চর্চা, যেমন—খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ তার স্মৃতিশক্তির উন্নয়নে সহায়তা করবে।

মায়ের নৈতিক দায়িত্ব তার সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া। উলামায়ে কেরাম ফতোয়া দিয়েছেন যে কোনো মা যদি তার শিশুসন্তানের দেখাশোনায় অবহেলা করে, সে কোথায় যায়, কী করে—এসব খোঁজখবর না রাখে, ফলে ঘটনাক্রমে বাচ্চাটি বিদ্যুতের উন্মুক্ত তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার মৃত্যু মা কর্তৃক ‘কতলে খতা’ (অনিচ্ছাকৃত হত্যা) বলে গণ্য হবে। শাস্তি হিসেবে মাকে দুই মাস লাগাতার রোজা রাখতে হবে। কেননা অবুঝ শিশুর দেখভালের দায়িত্ব মায়ের কাঁধে ছিল। সে তা সঠিকভাবে আদায় করেনি।

চিন্তা করুন, ইসলামী আইনজ্ঞরা নিজ সন্তানের ক্ষেত্রেও দিয়তের আবশ্যকতার বিধান রেখেছেন। কেননা মানুষের আত্মা-রক্ত সম্মানিত। কাজেই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সুতরাং তার সার্বিক দেখাশোনা করা  মা-বাবার দায়িত্ব ও কর্তৃব্য। এই মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর খোঁজখবর রাখতে হবে। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, জিম্মাদার। সেই দায়িত্ব সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।’

পাঁচ. তাদের উৎসাহস্বরূপ কিছু পুরস্কার-ভাতা প্রদান করা যেতে পারে। ফলে তাদের মানসিক অগ্রগতি হবে। জার্মানিতে মানসিক রোগীদের ছোটখাটো কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, যেন তারা সমস্যার কথা ভুলে যায়।

ছয়. যে পরিবেশে তারা বসবাস করে তার প্রতি লক্ষ রাখা। তারাও খোলামেলা সুন্দর পরিবেশ ও সুস্থ বিনোদনের অধিকার রাখে।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা।

মন্তব্য