kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

ইয়ার মুহাম্মদ

আমেরিকায় দাসমুক্তি আন্দোলনের মুসলিম পথিকৃৎ

মুসলিম মনীষী

আবরার আবদুল্লাহ   

২৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমেরিকায় দাসমুক্তি আন্দোলনের মুসলিম পথিকৃৎ

আমেরিকায় মুসলমানের সংরক্ষিত ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। সর্বোচ্চ আড়াই শ বছরের প্রাচীন ইতিহাসে মুসলিমদের বিবরণ পাওয়া যায়। তবে আমেরিকায় মুসলমানের আগমন হয় তারও অন্তত দুই শ বছর আগে। ধারণা করা হয়, আমেরিকায় মুসলিমদের আগমন হয় দাস হিসেবে। ১৪৯২ সালে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান হলে লক্ষাধিক মুসলমানকে দাস হিসেবে আমেরিকায় নেওয়া হয়। স্পেন ছাড়াও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কৃষি ও ব্যাবসায়িক কাজের জন্য এশিয়া ও আফ্রিকার লাখ লাখ দাস নিয়ে আসে। ঐতিহাসিকদের দাবি, আমেরিকায় নিয়ে আসা দাসদের   এক-তৃতীয়াংশই ছিল মুসলিম, যারা প্রকাশ্যে ইসলাম পালন করতে না পারলেও গোপনে পালন করত।

আমেরিকার সংরক্ষিত ইতিহাসে ইসলামের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন দুটি। কংগ্রেস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ওমর বিন সাঈদের আত্মজীবনী (দ্য লাইফ অব ওমর ইবনে সাঈদ, রচনাকাল : ১৮৩১) এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে সংরক্ষিত ইয়ার মুহাম্মদের কবর। উভয়েই আফ্রিকার ধনাঢ্য ও অভিজাত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে দাসত্বের জীবনযাপনে বাধ্য হন। ইয়ার মুহাম্মদ পরবর্তী সময়ে মুক্তি পান। অন্যদিকে ওমর বিন সাঈদ দাস হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেন।

ইয়ার মুহাম্মদ ১৭৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি আফ্রিকার দেশ গিনিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৫২ সালে তাঁকে বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। ইয়ার মুহাম্মদের মনিব ছিলেন স্যামুয়েল বেল ও ছেলে ব্রুক। ৪৪ বছরের দাসত্বের পর ৬০ বছর বয়সে (১৭৯৭ খ্রি.) স্বাধীন হন তিনি। স্বাধীনতালাভের পর ব্যবসা শুরু করেন এবং প্রচুর সম্পদের মালিক হন। ওয়াশিংটন ডিসির অভিজাত জর্জটাউনে বাড়ি করেন। আমেরিকার বড় বড় ব্যবসায়ী ইয়ার মুহাম্মদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতেন; এমনকি কলম্বিয়া ব্যাংক অব জর্জটাউনের একজন স্টেকহোল্ডার ছিলেন তিনি।

ইয়ার মুহাম্মদ ছিলেন জর্জটাউনের পরিচিত মুখ। একজন হাসিখুশি, অধ্যবসায়ী ও নিজ বিশ্বাসের প্রতি গভীর আস্থাশীল ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষত নামাজের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন ইয়ার মুহাম্মদ। যেখানে যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে লেখাপড়া শেখেন ইয়ার মুহাম্মদ এবং নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে কঠোর পরিশ্রম করেন। জর্জটাউনে দাসদের স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার অধিকার ছিল। তিনি ইটের কাজ শেখেন এবং মনিবের ভবন তৈরি করার বিনিময়ে মুক্তি লাভ করেন। ওয়াশিংটন ডিসির ইসলামিক হেরিটেজ মিউজিয়ামের পরিচালক আমির মুহাম্মদ বলেন, ‘তিনি প্রমাণ করেছেন, মুসলিম আমেরিকানরা আমেরিকান সমাজেরই অংশ। তাঁর জীবন থেকে আমেরিকান মুসলিমদের সংগ্রাম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, বিশেষত মুসলিম দাসদের জীবন সম্পর্কে।’

আমির মুহাম্মদ আরো বলেন, ‘ইয়ার মুহাম্মদের মুক্তি ও আর্থিক উত্থান অন্য দাসদের জন্য ছিল অনুপ্রেরণা। দাসদের মুক্তির ক্ষেত্রে তিনি সহযোগিতা করতেন। আমেরিকায় দাসমুক্তি আন্দোলনের সূচনা পর্বে যে কয়জন মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, ইয়ার মুহাম্মদ ছিলেন তাঁদের একজন।’

ইয়ার মুহাম্মদের কবর ছাড়া আর কোনো স্মৃতিচিহ্ন টিকে নেই। প্রায় শত বছর আগে তাঁর উত্তরাধিকারীরা তাঁর বাড়িটি ভেঙে ফেলে সেখানে নতুন বাড়ি করেন। এখন তাঁরা সেখানে বহুতল ভবন করতে আগ্রহী। লেখক ও ফ্রিল্যান্সার জেমস এইচ জনস্টন দীর্ঘ আট বছর ইয়ার মুহাম্মদের ওপর গবেষণা করেন। জনস্টন মনে করেন, তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করা আবশ্যক। কেননা আমেরিকার ইতিহাসে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন একজন ধনী ব্যক্তির (ইয়ার মুহাম্মদের) ছবি দেখে মুগ্ধ হয়, অথচ তারা জানে না এই লোকটাই দাসত্বের ভয়ংকর শর্তে আবদ্ধ ছিলেন। নিজের স্বাধীন সত্তা লাভের জন্য তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল।

সূত্র : ভয়েস অব আমেরিকা উইকিপিডিয়া ও প্লুরালিজম ডট অর্গ

মন্তব্য