kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

ইমাম বুখারির দেশে ইসলাম

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ   

২৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ইমাম বুখারির দেশে ইসলাম

পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যের নগর হিসেবে পরিচিত উজবেকিস্তানের বুখারা নগর। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতাব্দীতে নির্মিত মধ্য এশিয়ার এই নগরটি অর্থনীতি ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুও। তা ছাড়া ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ও শিক্ষা-গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও পৃথিবীব্যাপী সমাদৃত বুখারা নগরী। হাদিসশাস্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও পরিচিত গ্রন্থ ‘সহিহুল বুখারি’র রচয়িতা ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল (রহ.)সহ অগণিত আলেম, বিজ্ঞানী ও গবেষকের পদচারণে মুখরিত ছিল বুখারা নগর। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনার জম্মভূমি হিসেবেও বুখারা বেশ পরিচিত। এ ছাড়া নকশবন্দি সুফি তরিকার অনেক প্রখ্যাত আলেমের কবর রয়েছে এখানে। তাই প্রতিবছর বুখারায় প্রায় এক কোটি পর্যটকের আগমন ঘটে।

৪৫.৬ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট কালয়ান মসজিদের মিনারটি মধ্য এশিয়ার সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে স্বীকৃত। কানাখানিক সম্রাট মুহাম্মাদ আরসালান খান কর্তৃক ১১২৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। তা ছাড়া এই মসজিদের পাশে আছে ১৬ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র মিরে আরব মাদরাসা, যা আজও ইসলামী শিক্ষা বিস্তার করছে।

ইসলামপূর্ব যুগে বুখারার অধিবাসীরা ছিল পৌত্তলিকতার অনুসারী। মুসলিমদের মধ্যে সর্বপ্রথম বুখারায় এসেছেন খলিফা মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান (রা.)-এর নিযুক্ত খুরাসানের গভর্নর ওবায়দুল্লা বিন জিয়াদ। ৯৪ হিজরিতে ২৫ বছর বয়সে তিনি ২৪ হাজার সৈন্য নিয়ে বুখারার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হন। সে সময় বুখারার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন খাতুন নামের এক বিধবা নারী। তুর্কিদের সহযোগিতায় খাতুন মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াই শুরু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক লাখ দিরহামের বিনিময়ে সন্ধি স্থাপন করেন।

কিন্তু খুরাসানে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের শাসনকালে। ৯০ হিজরিতে কুতায়বা বিন মুসলিম আল বাহিলির নেতৃত্বে তৎকালীন শাসক ওয়ারদান খাদাহর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধের পর বিজয়ী হয় মুসলিম বাহিনী এবং সেখানে তাগশাদাহকে গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ৯৪ হিজরিতে শহরের প্রাচীরের ভেতর সেনাপতি কুতাইবা একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

নানা সময়ে বুখারা নগরী ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। ৬১৬ হিজরি মোতাবেক ১২২০ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে বুখারা নগরী হস্তগত হলে তাতে ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। এ সময় বুখারার অনেক পুরনো প্রাসাদ ও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংস হয়। এ ছাড়া বুখারার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও কমে যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ইসলামী শিক্ষাদীক্ষা বহাল থাকে আপন অবস্থায়। তবে মোগলদের ইসলাম গ্রহণের পর বুখারা আবার আগের মতো শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও ইলম চর্চায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

বুখারার ইলম চর্চা আবারও বন্ধ হয় ১৯২০ সালে। রাশিয়ার কমিউনিস্টদের আগ্রাসনের শিকার হয়ে ৭০ বছর পর্যন্ত থাকে। অবশেষে ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তানের রাজধানী হিসেবে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে।

পারস্য, মোগল ও সোভিয়ত ইউনিয়নের আক্রমণের সম্মুখীন হলেও প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনে এখনো বুখারা অনন্য হয়ে আছে। ১৯৯৭ সালে বুখারা নগরী প্রতিষ্ঠার দুই হাজার ৫০০ বছর পূর্তিতে এখানে সাত শরও বেশি ঐতিহাসিক নিদর্শন বিদ্যমান। তাই ইউনেসকো কর্তৃপক্ষ ১৯৯৩ সালে একে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের নগরী বলে স্বীকৃতি প্রদান করে।

লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও অনুবাদক

[email protected]

 

মন্তব্য