kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

কোরআন থেকে উপকৃত হওয়ার উপায় ও অন্তরায়

মুফতি তাজুল ইসলাম   

২৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কোরআন থেকে উপকৃত হওয়ার উপায় ও অন্তরায়

কোরআন যদিও গোটা বিশ্বের সব মানুষের জন্য নাজিল হয়েছে, তা সত্ত্বেও কোরআন থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ পথ ও পন্থা আছে। কোরআন থেকে উপকৃত হতে চাইলে সেগুলো অনুসরণ করতে হবে।

এক. কোরআন থেকে উপকৃত হওয়ার প্রথম শর্ত হলো তার জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের জন্য অনুসন্ধিত্সু আকুলতা। যার মধ্যে কোরআন শেখার প্রগাঢ় আগ্রহ নেই, সে কোরআন থেকে উপকৃত হতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহ) তাদের পথ দেখান, যারা তাঁর অভিমুখী।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১৩)

দুই. মনোনিবেশ ও আনুগত্য। কোরআন থেকে উপকৃত হতে চাইলে অবশ্যই তার বক্তব্যের প্রতি যথাযথ মনোযোগ ও মনোনিবেশ থাকতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদের, যারা মনোযোগসহ কথা শোনে, অতঃপর যা উত্তম তার অনুসরণ করে। আল্লাহ তাদের সৎপথ প্রদর্শন করেন। আর তারাই বুদ্ধিমান।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১৭-১৮)

তিন. কোরআনের ভিত্তি হলো খোদার মানসকল্পনা ও তাঁর ভয়। যার হৃদয় আল্লাহর ভয়শূন্য, সে দ্বিন থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে উপদেশ দাও কোরআনের সাহায্যে।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ৪৫)

চার. পরকাল ও অদৃশ্যে বিশ্বাসী মানুষ কোরআন থেকে সর্বাধিক উপকৃত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই কোরআন পরহেজগারদের জন্য পথনির্দেশ, যারা অদৃশ্যের ওপর ঈমান আনে...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২-৩)

পাঁচ. কোরআন থেকে উপকৃত হতে চাইলে গভীর মনোযোগ দিয়ে কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার বিষয়ে কোরআনে বহু জায়গায় তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)

ছয়. কোরআনের যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। কোরআন শুধুই তথ্যের বই নয়। আইন-কানুনেরও সংকলন নয়। কোরআন রাজাধিরাজ মহান আল্লাহর কালাম। তাই তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। দেহ-মনকে পবিত্র রাখতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই এটি সম্মানিত কোরআন, যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে। যারা পূতপবিত্র, তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৭৭-৭৯)

সাত. কোরআন উপলব্ধি করার জন্য সংগ্রাম-সাধনায় আত্মনিয়োগ করা জরুরি। মানুষ যখন কোরআন সম্পর্কে অবগত হতে চায়, কোরআন থেকে উপকৃত হতে চায়, তখন আল্লাহর রহমত তার দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহ তাঁর কিতাব অনুধাবনের জন্য ওই ব্যক্তির বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন। তাকে বুঝ দান করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)

কোরআন থেকে উপকৃত হওয়ার অন্তরায়

মহানবী (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত কোরআনের মর্মবাণী বহু মানুষের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু কিছু মানুষ ঈমান আনার সৌভাগ্য লাভ করেনি। মহানবী (সা.) যতই তাদের কোরআনের কথা বলতেন, তারা সত্য উপলব্ধি করত না। যেন তারা কিছুই শুনতে পায়নি। বিশেষত যখন ‘আল্লাহ ও অদ্বিতীয়’—এমন বাণী শোনানো হতো, মক্কার মুশরিকরা দ্রুত প্রস্থান করত। অহংকারী ও উদ্ধত মনোভাব দেখিয়ে তারা চলে যেত।

আসলে কোরআন গোটা বিশ্বের সব মানুষের জন্য নাজিল হলেও সবার পক্ষে কোরআন থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব হয় না। এর বিভিন্ন কারণ আছে—

প্রথমত, আত্মগরিমা ও অহংকারের কারণে বহু মানুষ কোরআন থেকে উপকৃত হতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহর আয়াতের তিলাওয়াত শোনে, অথচ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে (কুফরের ওপর) অটল থাকে, যেন সে তা শোনেনি। তাকে সংবাদ দাও বেদনাদায়ক শাস্তির।’ (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ৭-৮)

দ্বিতীয়ত, সেই সব মানুষ কোরআন থেকে উপকৃত হতে পারে না, যারা কোরআন সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছাড়া অহেতুক কোরআন নিয়ে বাদানুবাদ করে, বাকপটুতা দেখানোর চেষ্টা করে এবং সন্দেহ-সংশয় পোষণ করে। এই বাদানুবাদ গুপ্ত অহংকারের সন্ধান দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা নিজেদের কাছে কোনো দলিল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর আয়াত নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাদের অন্তরে আছে শুধুই অহংকার। তারা এ ব্যাপারে সফল হবে না। সুতরাং আল্লাহর শরণাপন্ন হও, তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৫৬)

তৃতীয়ত, যারা পরকালে অবিশ্বাসী, তারাও কোরআন থেকে উপকৃত হতে পারে না। কেননা কোরআনের উৎসাহ, উপদেশ ও সংশোধনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো পরকাল। কোরআন পরকাল সম্পর্কে সতর্ক করে, ভীতি প্রদর্শন করে এবং পরকালের সওয়াবের ব্যাপারে আশান্বিত করে। পরকালের সুদীর্ঘ সফরের জন্য পাথেয় জোগায়। এর জন্য যাবতীয় তথ্য ও নির্দেশনা দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা পরকালে বিশ্বাস করে, তারা কোরআনেও বিশ্বাস করে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯২)

বিষয়টি অন্য আয়াতে আরো স্পষ্টভাবে এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা (কিয়ামতের দিন) আমার সাক্ষাতের ভয় করে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত থাকে, আর যারা আমার আয়াত সম্পর্কে উদাসীন, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। এটা তাদের কৃতকর্মের জন্য।’ (সুরা : ইউনুস,  আয়াত : ৭-৮)

এর বিপরীতে পরকাল ও অদৃশ্যে বিশ্বাসী মানুষ কোরআন থেকে সর্বাধিক উপকৃত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই কোরআন পরহেজগারদের জন্য পথনির্দেশ, যারা অদৃশ্যের ওপর ঈমান আনে...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২-৩)

এ দুই আয়াত থেকে জানা যায়, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তারা কোরআন থেকে উপকৃত হতে পারে না।

লেখক : ইসলামী গবেষক

মন্তব্য