kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

বাজারে গিয়ে যা করবেন, যা করবেন না

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাজারে গিয়ে যা করবেন, যা করবেন না

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হলো বাজার। এটি এমন একটি জায়গা, যা মানুষকে আল্লাহর জিকির ও ইবাদত থেকে ভুলিয়ে রাখে। মানুষের অধিক দুনিয়াপ্রীতির কারণে বাজারগুলো হয়ে উঠেছে ধোঁকা-প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার, বিশ্বাসঘাতকতা প্রভৃতি পাপাচারের স্থান; পাশাপাশি পর্দার লঙ্ঘন তো আছেই। তথাপি জীবনের তাগিদে মানুষকে বাজারে যেতে হবে। কেনাবেচাও করতে হবে।

কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কেনাকাটাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আল্লাহ ও তাঁর হুকুমকে ভুলে গেলে চলবে না। জীবনের তাগিদে জীবিকা অর্জনও মুমিনের জন্য ইবাদত। তবে তা হতে হবে আল্লাহর দেওয়া হুকুম এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী। ইসলামে বাজারে যাওয়ার কিছু আদব রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে প্রথম শর্ত হলো হালাল ও হারাম পণ্য সম্পর্কে ধারণা রাখা। এটি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই কর্তব্য।

 

হারাম-হালালের জ্ঞান থাকা

একজন মুমিনের জন্য পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে পণ্যটি হালাল কি না তা জেনে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যাঁরা অমুসলিম দেশে থাকেন, তাঁদের জন্য এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। বিশেষ করে কোনো প্রাণীর গোশত কেনার ক্ষেত্রে প্রাণীটি হালাল পন্থায় জবাই করা হয়েছে কি না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশত এবং যা গায়রুল্লাহর (আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো) নামে জবাই করা হয়েছে। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭৩)। অন্যান্য খাবারের ক্ষেত্রে তাতে হারাম কিছু মিশ্রিত আছে কি না। পানীয় ও সুগন্ধির ক্ষেত্রে তাতে কোনো হারাম অ্যালকোহল আছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, দ্বিন সম্পর্কে যার সম্যক জ্ঞান আছে, সে ব্যতীত আর কেউ যেন আমাদের বাজারে লেনদেন না করে। (তিরমিজি, হাদিস : ৪৮৭)

 

বাজারে যাওয়ার আগে দোয়া পড়া

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদ, ইয়ুহয়ি ওয়া ইউমিতু বিয়াদিহিল খাইর, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির (অর্থ : আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব তাঁরই, সব প্রশংসা তাঁর। তিনি জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তাঁর হাতেই সব কল্যাণ। তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।)—এই দোয়া পড়বে, আল্লাহ তার জন্য দশ লাখ নেকি বরাদ্দ করেন, দশ লাখ গুনাহ মাফ করেন এবং তার দশ লাখ মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪২৮)

 

একে অপরকে সালাম দেওয়া

সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ শুধু সালামের ফজিলত অর্জনের উদ্দেশ্যেই বাজারে যেতেন। হজরত তোফায়েল ইবনে উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর কাছে আসতেন এবং সকালে তাঁর সঙ্গে বাজারে যেতেন। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা সকালে বাজারে যেতাম, তখন তিনি প্রত্যেক খুচরা বিক্রেতা, স্থায়ী ব্যবসায়ী, মিসকিন তথা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাকে সালাম দিতেন।’ তোফায়েল বলেন, সুতরাং আমি একদিন (অভ্যাসমতো) আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর কাছে গেলাম। তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে বাজারে যেতে বললেন। আমি বললাম, আপনি বাজারে গিয়ে কী করবেন? আপনি তো বেচাকেনার জন্য কোথাও থামেন না, কোনো পণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন না, তার দরদাম জানতে চান না এবং বাজারের কোনো মজলিসে বসেনও না। আমি বলছি, এখানে আমাদের সঙ্গে বসে যান, এখানেই কথাবার্তা বলি।’ (তোফায়েলের ভুঁড়ি মোটা ছিল, সে জন্য) তিনি বললেন, ‘ওহে ভুঁড়িমোটা! আমরা সকালবেলা বাজারে একমাত্র সালাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাই। যার সঙ্গেই আমাদের সাক্ষাৎ হয়, আমরা তাকেই সালাম দিই।’ (মুয়াত্তায়ে মালেক,   হাদিস : ৮৫০)

 

বাজারে হৈ-হুল্লোড় না করা

আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.)-কে বললাম, আপনি আমাদের কাছে তাওরাতে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর গুণাবলি বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, আচ্ছা। আল্লাহর কসম! কোরআনে বর্ণিত তাঁর কিছু গুণের কথা তাওরাতেও উল্লেখ করা হয়েছে, হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং উম্মিদের রক্ষক হিসেবেও। আপনি আমার বান্দা ও আমার রাসুল। আমি আপনার নাম মুতাওয়াক্কিল (আল্লাহর ওপর ভরসাকারী) রেখেছি। তিনি বাজারে কঠোর, রূঢ় ও নির্দয় স্বভাবের ছিলেন না। তিনি মন্দর প্রতিশোধ মন্দ দ্বারা নিতেন না; বরং মাফ করে দিতেন, ক্ষমা করে দিতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ততক্ষণ মৃত্যু দেবেন না, যতক্ষণ না তাঁর দ্বারা বিকৃত মিল্লাতকে ঠিক পথে আনেন—অর্থাৎ যতক্ষণ না তারা (আরববাসী) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ঘোষণা দেবে। আর এই কলেমার মাধ্যমে অন্ধ চক্ষু, বধির কর্ণ ও আচ্ছাদিত হৃদয় খুলে যাবে। (বুখারি, হাদিস : ২১২৫)

 

হালাল পণ্য কেনাবেচা করা

হজরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট, উভয়ের মাঝে বহু অস্পষ্ট বিষয় রয়েছে। যে ব্যক্তি গুনাহর ভয়ে সন্দেহযুক্ত কাজ পরিত্যাগ করে, সে ব্যক্তি যে বিষয়ে গুনাহ হওয়া সুস্পষ্ট, সে বিষয়ে অধিকতর পরিত্যাগকারী হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি গুনাহর সন্দেহযুক্ত কাজ করতে দুঃসাহস করে, সে ব্যক্তির সুস্পষ্ট গুনাহর কাজে পতিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। গুনাহগুলো আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা; যে জানোয়ার সংরক্ষিত এলাকার চারপাশে চরতে থাকে, তার ওই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করার আশঙ্কা রয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ২০৫১)

 

প্রতারণা থেকে বিরত থাকা

বাজারে কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেতা বা বিক্রেতা কোনো পক্ষেরই মিথ্যা, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। ভেজাল পণ্য বিক্রির ব্যাপারে হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) (বিক্রির জন্য) স্তূপীকৃত খাদ্যদ্রব্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর ভেতর হাত ঢোকালে তাঁর আঙুলগুলো ভেজা পেলেন। তিনি মালিককে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? সে উত্তর দিল, বৃষ্টির পানিতে এই খাদ্যদ্রব্যগুলো ভিজে গিয়েছিল—হে আল্লাহর রাসুল! তখন তিনি বললেন, ভেজাগুলো স্তূপের ওপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকেরা তা দেখতে পায়? অতঃপর তিনি বললেন, যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ [মুসলিম (ইফা.), হাদিস : ১৮৬] তেমনি মাপে কম দেওয়াও জঘন্যতম অপরাধ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ মাপে কম দানকারীদের জন্য, যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৩)

দালালির মধ্যে ক্রেতাকে প্রতারিত করাও নিষেধ। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ক্রেতার ওপর দিয়ে অন্য ক্রেতার দরাদরি করা নিষেধ করেছেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৯৬৩) ক্রেতাদের বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করাও নিষিদ্ধ। (তিরমিজি, হাদিস : ১২১০)

পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা কসম করা থেকে বিরত থাকা। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা ক্রয়-বিক্রয়কালে অধিক শপথ করা থেকে বিরত থাকো। কেননা মিথ্যা শপথের ফলে পণ্য বিক্রি হলেও তার বরকত নষ্ট হয়ে যায়।’ (মুসলিম)

 

পরনিন্দার আসর বর্জন করা

গ্রামগঞ্জের বাজারের চায়ের দোকানগুলোতে সাধারণত পরনিন্দার আসর সহজেই জমে যায়; যেহেতু সবাই পরিচিত। শহরেও পরিচিত এলাকায় থাকলে এমনটা হতে পারে। তাই শহর কিংবা গ্রাম—যেখানেই হোক, বাজারে গেলে পরনিন্দার আসর জমবে এমন জায়গা পরিহার করতে হবে। কেননা গিবত (পরনিন্দা) ও অপরের দোষচর্চা নিকৃষ্টতম অভ্যাস। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘পেছনে ও সামনে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ-ধ্বংস।’ (সুরা : হুমাজাহ,  আয়াত : ১)

 

শরয়ি পর্দা মেনে চলা

নারী-পুরুষ উভয়ের পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায় হলো ইসলামের পর্দা বা হিজাব বিধান। এই বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই হৃদয়-মনের পবিত্রতা অর্জন সম্ভব। পর্দার এই সুফল স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই বিধান তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৩)

তাই কোনো নারীর নিরুপায় হয়ে যদি বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে অবশ্যই শরয়ি পর্দা অবলম্বন করে যাবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৯)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদের আদেশ করেছেন, যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে, তখন যেন মাথার ওপর থেকে ওড়না বা চাদর টেনে স্বীয় মুখমণ্ডল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে। (ফাতহুল বারি, ৮/৫৪, ৭৬, ১১৪)

নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)

 

কেনাকাটায় মধ্যপন্থা অবলম্বন

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে ‘(রহমানের বান্দা তো তারাই), যারা অপব্যয়ও করে না, আবার কৃপণতাও করে না। তাদের পন্থা হয় এ দুইয়ের মধ্যবর্তী।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৭)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা