kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

ফিরে দেখা ১২ জুন

সিন্ধু বিজয়ে উপমহাদেশের ইতিহাসের বাঁকবদল

আবরার আবদুল্লাহ   

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিন্ধু বিজয়ে উপমহাদেশের ইতিহাসের বাঁকবদল

আবহমান কাল থেকে ভারতবর্ষের সঙ্গে আরব বণিকদের যোগাযোগ ছিল। তার সূত্র ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই ভারতবর্ষে ইসলামের বাণী পৌঁছে যাওয়ারও প্রমাণ পাওয়া যায় ইতিহাস গ্রন্থে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ইসলামের বিজয়কেতন উড়লেও এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক বিজয় অর্জিত হয় হিজরি দ্বিতীয় শতকে। হজরত আলী (রা.)-এর যুগে ‘মেকরান’ মুসলিম শাসনভুক্ত হয়। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিজয়াভিযান কিছুটা স্থবির হয়ে যায়। উমাইয়া খলিফা প্রথম ওয়ালিদ নতুন করে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তাঁর শাসনামলে স্পেন, পর্তুগাল, চীনের কাশগর এবং ভারতবর্ষের সিন্ধু অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের এই ঐতিহাসিক বিজয়াভিযানের নেতৃত্ব দেন কিশোর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম। মূলত তাঁর মাধ্যমেই ভারতবর্ষে ইসলামী শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারতবর্ষ অভিযান নিছক কোনো যুদ্ধজয় ছিল না; এর পেছনে ছিল আরো অনেক কারণ। যেমন—সাধারণ নাগরিকদের ওপর রাজা দাহিরের অত্যাচার, মুসলিম নৌবহরে হামলা-লুণ্ঠন, বিধবা মুসলিম নারীদের বন্দি ও ক্ষতিপূরণ এবং বন্দিমুক্তিতে অস্বীকার, পারস্য অভিযানের মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয়দের সহযোগিতা, ইরাকের বিদ্রোহীদের আশ্রয় প্রদান। এ ছাড়া ভারতবর্ষে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আরব বণিকদের ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবসা নির্বিঘ্ন করাও এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কথিত আছে, বন্দি মুসলিম নারীরা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে মুক্তির মিনতি জানিয়ে চিঠি লিখলে তিনি ত্বরিত অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ প্রথমে উবায়দুল্লাহ এবং পরে বুদাইলের নেতৃত্বে দুটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তবে তাঁরা ব্যর্থ হন। তৃতীয়বার হাজ্জাজ তাঁর ভাতিজা ও জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধুতে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

মুহাম্মদ বিন কাসিম হাজ্জাজের নির্দেশে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে ছয় হাজার সিরীয় ও ইরাকি যোদ্ধা, ছয় হাজার উষ্ট্রারোহী এবং তিন হাজার ভারবাহী পশুর সমন্বয়ে গঠিত সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে সিন্ধুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। রায় ও শিরাজ হয়ে তিনি মেকরানে উপস্থিত হন। মেকরানের শাসক মুহাম্মদ হারুন তাঁকে প্রয়োজনীয় রসদ, অস্ত্রাদি ও দুর্গ ধ্বংসকারী যন্ত্রাদি সরবরাহ করেন। এ সময় দাহিরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জাঠ ও মেঠ সৈন্যরা মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেয়। মুহাম্মদ বিন কাসিম সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে প্রথমে দাহিরের সমুদ্রবন্দর দেবাল জয় করেন। দেবাল সমুদ্রবন্দর পদানত করার পর মুসলিম বাহিনী দেবাল দুর্গ অবরোধ করে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।  ৭১২ হিজরির ১২ জুন ঐতিহাসিক এ বিজয় অর্জিত হয়।

দেবালের পতনের পর রাজা দাহির রাওয়ারে পালিয়ে যান। কিন্তু তাঁর শেষরক্ষা হয় না। মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে তাঁর বাহিনী পরাজিত হয় এবং রাজা নিহত হন। দাহিরের বিপর্যয়ের পর তাঁর স্ত্রী রানি বাঈ ও তাঁর পুত্র রাওয়ার দুর্গে অবস্থান নেন এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। দুর্গের পতন হলে তিনি তাঁর সেবিকাদের নিয়ে আত্মহত্যা করেন। রাওয়ার চূড়ান্ত বিজয়ের আগে ও পরে মুসলিম বাহিনী ছোট ছোট বেশ কয়েকটি শহর বিজয় করে। এর মধ্যে রয়েছে বধু, নিরুন, ব্রাহ্মণ্যবাদ, আলোর, মুলতান ইত্যাদি।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের এই বিজয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা, যা পরবর্তী ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার দুয়ার খুলে দেয়। যদিও তাঁর বিজিত অঞ্চলে মুসলিম শাসনকাল মাত্র অর্ধশতাব্দীকাল স্থায়ী হয়েছিল, তবু এর প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক। ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার বলেন, ‘মুসলমান কর্তৃক ভারতবর্ষের সিন্ধু বিজয় অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা, পরবর্তী সময়ের ওপর একটি স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছিল।’ (অ্যান অ্যাডভান্স হিস্টরি অব ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ২৬৮)

শুধু সামরিক বিচারেই নয়, সাংস্কৃতিক বিবেচনায়ও এই বিজয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সিন্ধু বিজয়ের ফলে ভারতীয়রা মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে উভয় অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের বহুমুখী যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আব্বাসীয় যুগে ভারতীয় সংগীত, আধ্যাত্মিকতা সাধনা ও গণিতশাস্ত্রবিদদের বাগদাদে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭২ হিজরিতে বর্তমান সৌদি আরবের তায়েফ শহরের বিখ্যাত বনু সাকিফ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা মুহাম্মদ বিন হাকাম সাকিফ গোত্রের অধিপতি ছিলেন। ৭৫ হিজরিতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের চাচা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইরাকের শাসক নিযুক্ত হন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কাসিমকে বসরার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। পিতার সঙ্গে মুহাম্মদও বসরায় আগমন করেন এবং এখানেই বেড়ে ওঠেন। কিন্তু শৈশব না পেরোতেই পিতাকে হারান তিনি। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ভাতিজা মুহাম্মদের জন্য প্রচলিত শিক্ষার বাইরে উচ্চতর সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং তাঁর সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দেন।

সিন্ধু অভিযান শেষ করে মুহাম্মদ বিন কাসিম ইরাকে ফিরে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তত দিনে দামেস্কে ক্ষমতার পালাবদল হয়। সুলাইমান ইবনে আবদুল মালেক ক্ষমতা গ্রহণ করেন। খলিফা ওয়ালিদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে বন্দি করা হয়। বন্দি অবস্থায় মাত্র ২৪ বছর বয়সে এই মহান বীরের মৃত্যু হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা