kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ জুলাই ২০১৯। ৮ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৯ জিলকদ ১৪৪০

কোরআনের সাধক সাত সাহাবি

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



কোরআনের সাধক সাত সাহাবি

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিরাই ছিলেন কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারক, বাহক ও প্রচারক। তাঁদের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অবিকৃত ও অখণ্ড কোরআন পৌঁছিয়েছেন। সাধারণভাবে তাঁরা সবাই ছিলেন কোরআনের প্রতি অনুরাগী। কোরআন তাঁদের হৃদয়কে বিগলিত করত এবং ঈমান বাড়িয়ে দিত। তবে তাঁদের মধ্যেই এমন কিছু মনীষী ছিলেন, কোরআন যাঁদের জীবনের অংশে পরিণত হয় এবং মহানবী (সা.) তাঁদের কোরআন সাধনার স্বীকৃতি দেন। কোরআনের এমন সাত সাধক সাহাবির পরিচয় তুলে ধরেছেন আতাউর রহমান খসরু

 

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)

যাঁর তিলাওয়াত শুনে অশ্রুসিক্ত হন মহানবী (সা.)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হিজরতের ৩৭ বছর আগে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম আবির্ভাবের প্রাথমিক যুগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বলা হয়, তিনি ইসলাম গ্রহণকারী ষষ্ঠ ব্যক্তি। ইসলামের জন্য দুইবার হিজরত করেন মহান এই সাহাবি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বদর, উহুদ, খন্দক, বাইআতে রিদওয়ানসহ অন্যান্য যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন কোরআনের একনিষ্ঠ সেবক। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় তিনি কোরআন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার কাজে ব্যয় করেন। সমকালে তাঁকে কোরআনের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার গণ্য করা হতো। হিজরতের আগে মহানবী (সা.)-এর পর তিনিই মক্কায় সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন। বায়তুল্লাহ শরিফে তিনি সুরা আর রহমানের কিছু অংশ তিলাওয়াত করেন। তাঁর সাহসিকতায় কুরাইশরা হতবাক হয়ে যায় এবং তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। (উসদুল গাবাহ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা ৩৮২)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে তিলাওয়াত করতে বলেন এবং তাঁর তিলাওয়াত শুনে তিনি অশ্রুসিক্ত হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৬৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর তিলাওয়াতের প্রশংসা করে বলেন, ‘যে কোরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে ঠিক তেমন ও সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করে খুশি হতে চায়, সে যেন ইবনে উম্মে আবদ (অবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ)-এর মতো তিলাওয়াত করে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৪৩৪০) অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কাছ থেকে কোরআন শেখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭১৩)

হজরত ওমর (রা.) তাঁকে কুফায় শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি তাঁর ব্যাপারে লেখেন, আবদুল্লাহর ব্যাপারে তোমাদেরকে আমি নিজের ওপর অগ্রাধিকার দিলাম। ফকিহুল উম্মাহ খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ৩২ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।

 

জায়েদ বিন সাবিত (রা.)

কোরআন সংরক্ষণে যাঁর ভূমিকা অনন্য

সারা বিশ্বের মুসলমান আজ যে অবিকৃত ও অখণ্ড কোরআন পড়ছে, তার পেছনে হজরত জায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর অনন্য ভূমিকা রয়েছে।  কোরআনের আয়াত ও সুরা সংগ্রহ এবং তা সংরক্ষণের কাজটি তিনি করেছেন মাত্র ২২ বছর বয়সে। হজরত জায়েদ বিন সাবিত (রা.) মদিনার বনু নাজ্জার গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১১ বছর। শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চায় বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। বিশেষত কোরআন মুখস্থ করা এবং তার জ্ঞান অর্জনে তাঁর আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। কিশোর জায়েদ (রা.)-এর আগ্রহ ও প্রচেষ্টা দেখে রাসুল (সা.) তাঁকে কাতিবে ওহি বা ওহি লেখকের মর্যাদা দেন। তাঁর মেধার প্রখরতা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ইহুদি ধর্মগ্রন্থ শেখার নির্দেশ দেন এবং তিনি তা মাত্র ১৫ দিনে আত্মস্থ করেন। এরপর তিনি জায়েদ (রা.)-কে সুরয়ানি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জ্ঞানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে শায়খুল কুররা ও মুফতিউল মদিনা বলা হতো।

আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে পুরো কোরআন মুখস্থ করেন। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের বছর তিনি দুইবার পুরো কোরআন পাঠ করে শোনান। তিনিই আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে সবার শেষে পুরো কোরআন পাঠ করে শোনান। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় কোরআন গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ ছিল না; তা সংরক্ষিত ছিল হাফেজদের বুকে, বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে। এ সময় বিভিন্ন যুদ্ধে হাফেজ সাহাবিদের মৃত্যু বিজ্ঞ সাহাবিদের চিন্তিত করে তোলে। হজরত ওমর (রা.) ও হজরত আবুবকর (রা.) এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কোরআন সংরক্ষণের তাগিদ দেন। হজরত আবুবকর (রা.) এই গুরুদায়িত্ব জায়েদ বিন সাবিত (রা.)-কে অর্পণ করেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ব্যাপারে আমরা কোনো মন্দ ধারণা পোষণ করি না।’ হজরত জায়েদ (রা.) এই আস্থা অটুট রাখেন। তবে এই কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! যদি আমাকে কোনো পাহাড় স্থানান্তর করার দায়িত্ব দেওয়া হতো, তবে তা আমার জন্য কোরআন একত্র করার চেয়ে সহজ হতো।’ হজরত উসমান (রা.) কোরআন সংকলনের কাজ চূড়ান্ত করার জন্য গঠিত ১২ জনের কমিটিতেও হজরত জায়েদ বিন সাবিত (রা.) ছিলেন। কোরআনের মহান এই সেবক ৪৫ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তথ্যসূত্র : আল বয়ান, মাওদু

 

সালিম মাওলা আবু হুজাইফা (রা.)

তাঁর কাছ থেকে কোরআন শিখতে বলেছিলেন রাসুল (সা.)

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মধ্যে যে কয়েকজন কোরআনের সেবক হিসেবে সাধারণ স্বীকৃতি লাভ করেন হজরত সালিম ইবনে মিকাল (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর সুন্দর ও সুললিত কণ্ঠের তিলাওয়াত ছিল প্রবাদতুল্য। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে পড়ে গেলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা! তোমার কী হলো? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! নিশ্চয় মসজিদে এক ব্যক্তি রয়েছেন, আমি তাঁর চেয়ে সুন্দর কিরাতের কাউকে দেখিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) গিয়ে দেখলেন তিনি আবু হুজাইফার মুক্তিপ্রাপ্ত দাস সালিম।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৫১৯৬)

হজরত সালিম (রা.) পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি বন্দি হন এবং তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে তিনি মক্কায় লালিত-পালিত হন এবং মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। সালিম (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সব যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন।

সালিম (রা.) ছিলেন আবু হুজাইফা (রা.)-এর স্ত্রী সাবিতা বিনতে আয়ার (রা.)-এর দাস। কিন্তু উন্নত চরিত্র ও উত্তম আচরণের জন্য তাঁকে মুক্তি দিয়ে পুত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। পবিত্র কোরআনে পালক পুত্রকে প্রকৃত পিতার সঙ্গে সম্বোধন করার নির্দেশ দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাঁকে সালিম বিন আবি হুজাইফা বলা হতো। কোরআনের নিষেধাজ্ঞা আসায় তাঁর নাম হয় সালিম মাওলা আবি হুজাইফা। আবু হুজাইফা (রা.) তাঁকে আপন ভাতিজি ফাতিমা বিনতে ওয়ালিদের সঙ্গে বিয়ে দেন।

কোরআনের প্রতি হজরত সালিম (রা.)-এর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি কোরআনের তিলাওয়াত ও তা অনুধাবনে আত্মনিয়োগ করেন এবং এই শাস্ত্রে বিশেষ মর্যাদা ও স্থান অর্জন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদেরকে তাঁর কাছ থেকে কোরআন শেখার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা চার ব্যক্তি থেকে কোরআন গ্রহণ করো—আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম মাওলা আবি হুজাইফা, মুয়াজ ইবনে জাবাল ও উবাই বিন কাব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭১৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর কুবা নামক স্থানে প্রথম মসজিদ স্থাপিত হয়। তিনি হজরত সালিম (রা.)-কে এই মসজিদের ইমাম ও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। হিজরতের আগে তিনি মদিনার মুসলিমদের নামাজের ইমামতি করতেন এবং মানুষকে কোরআন শেখাতেন।

সালিম (রা.) ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। মুমূর্ষু অবস্থায় হজরত ওমর (রা.)-কে বলা হয়, যদি আপনি উত্তরসূরি নির্বাচন করতেন! তিনি উত্তরে দুজন মানুষের কথা বলেন, যদি তাঁরা থাকতেন, তবে তাঁদেরকে তিনি খলিফা মনোনীত করতেন। হজরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ ও সালিম (রা.)। হজরত সালিম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যদি আবু হুজাইফার মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম সালিম জীবিত থাকতেন, তবে আমি তাঁকে অবশ্যই আমার উত্তরসূরি মনোনীত করতাম। আল্লাহ আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় সালিম আল্লাহকে অধিক পরিমাণে ভালোবাসে।

হজরত ওমর (রা.) ভালোবেসে তাঁর এক ছেলের নাম সালিম রাখেন, যেন তিনি হজরত সালিম (রা.)-এর মতো হন।

 

হজরত উবাই বিন কাব (রা.)

আরশে আজিমে উচ্চারিত হয়েছিল যাঁর নাম

হজরত আবুল মানজার উবাই বিন কাব আনসারি (রা.) সাহাবাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান কারি ও কোরআনের শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া ওহি লেখক ও ফকিহ হিসেবে তাঁর বিশেষ মূল্যায়ন ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় হজরত উবাই বিন কাব (রা.) কোরআন সংগ্রহ করেন এবং তা নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন।

হজরত উবাই বিন কাব (রা.) মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই লালিত-পালিত হন। তবে তাঁর জন্ম সাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি মর্যাদাপূর্ণ দ্বিতীয় ‘বাইয়াতুল উকবা’য় ছিলেন। বদর, উহুদসহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। হজরত উবাই বিন কাব (রা.) তাঁর সময়ে কোরআনের সবচেয়ে সুপাঠক। মুহাম্মদ (সা.) নিজেও তাঁর সুন্দর কোরআন পাঠের স্বীকৃতি দেন এবং তাঁর কাছ থেকে অন্যদের কোরআন শিখতে উৎসাহিত করেন। আমৃত্যু তিনি মানুষকে কোরআন শিক্ষা দেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁর কাছ থেকে কোরআন শিখতেন। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর উবাই বিন কাব (রা.) তারাবির নামাজের ইমামতি করেন। এ ছাড়া তিনি সমসাময়িক বিষয়ের ফিকহি সমাধান প্রদান এবং রাসুল (সা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করতেন। সহিহ বুখারিতে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুুলুল্লাহ (সা.) উবাই বিন কাব (রা.)-কে বলেন, ‘আল্লাহ তোমার কাছে আমাকে পাঠ করতে বলেছেন...। হজরত উবাই জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ আমার নাম বলেছেন? রাসুল (সা.) বলেন, হ্যাঁ। উত্তর শুনে হজরত উবাই (রা.) কাঁদতে শুরু করলেন।’ (হাদিস : ৩৫৯৮) রাসুলে আকরাম (সা.) হজরত উবাইকে উম্মতের শ্রেষ্ঠ কারি হিসেবে স্বীকৃতি দেন বলেও তাঁর কোনো কোনো জীবনীকার দাবি করেছেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা) এই মহান সাহাবি হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতের শেষ ভাগে বা হজরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলের শুরুতে ইন্তেকাল করেন।

 

আবু মুসা আশআরি (রা.)

দাউদ (আ.)-এর কণ্ঠের মিষ্টতা পেয়েছিলেন তিনি

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ছিলেন কোরআনের কোকিল। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী। মনোমুগ্ধকর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করতেন তিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সম্পর্কে বলেন, আবু মুসাকে দাউদ (আ.)-এর কণ্ঠের কিছু মিষ্টতা দান করা হয়েছে। হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর তিলাওয়াত শুনে বলেন, এ যেন দাউদের কণ্ঠ। হজরত ওমর (রা.) তাঁকে তিলাওয়াতের আহ্বান জানিয়ে বলতেন, ‘হে আবু মুসা, আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আগ্রহী করে তোলো।’

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ইয়েমেনের কাহতানের অধিবাসী ছিলেন। আশআরি তাঁর বংশীয় পদবি। তিনি মক্কায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর নিজ গোত্রে ফিরে যান ইসলাম প্রচারের জন্য। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) হাবশায় হিজরত করেন। তিনি খাইবার বিজয়ের দিন মদিনায় আসেন এবং রাসুল (সা.) তাঁকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অংশ দেন। হুনাইন ও হাওয়াজিনের যুদ্ধের পর রাসুলে আকরাম (সা.) হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর মাগফিরাতের জন্য দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ বিন কায়েসের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং তাকে কিয়ামতের দিন সম্মানজনক স্থান দান করুন।’

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) কোরআন মুখস্থ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তা শোনান। তিনিও মানুষকে কোরআন শেখাতেন এবং তাদের কাছ থেকে কোরআন শুনতেন। তিনি বসরায় অবস্থানকালে মানুষকে কোরআন শেখাতেন। প্রতিদিন ফজরের পর লোকেরা তাঁর কাছে কোরআন শিখতে ভিড় করত। তিনি একজনের পর একজনকে কোরআন শেখাতেন। হজরত হাসান (রা.) আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর কোরআনের সেবার মূল্যায়ন করে বলেন, কোনো প্রশাসক বসরাবাসীকে তাঁর চেয়ে উত্তম কিছু দিতে পারেনি। তাঁর কাছ থেকে কোরআন শেখা বিখ্যাত কয়েকজন হলেন হাতান বিন আবদুল্লাহ, আবু রেজা, আবু শায়খ হানায়ি প্রমুখ।

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) শুধু একজন কোরআনের শিক্ষক ও ফকিহ ছিলেন না; তিনি একজন দক্ষ শাসক ও বীর যোদ্ধাও ছিলেন। তিনি রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর শাম বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জাবিদ ও আদনের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। হজরত ওমর (রা.) তাঁকে বসরা এবং উসমান (রা.) তাঁকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন। অধিক গ্রহণযোগ্য মতানুসারে সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী মহান এই সাহাবি ৪৪ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। সূত্র : সিয়ারু আলামিন নুবালা, কিসসাসুল ইসলাম, ইসলাম ওয়েব

 

হজরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা.)

আল্লাহর নবী (সা.) যাঁকে ভালোবাসতেন

হজরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) হিজরতের ১৮ বছর আগে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। হজরত ওমর (রা.)-এর যুগে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে জর্দানে প্লেগরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হজরত মুয়াজ (রা.) দ্বিতীয় ‘বাইয়াতুল উকবা’য় (উকবা নামক স্থানের শপথ) অংশগ্রহণ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বদর, উহুদসহ সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহানবী (সা.)-এর জীবনকালে যে চারজন সাহাবি কোরআন একত্র ও সংরক্ষণ করেন, মুয়াজ (রা.) তাঁদের অন্যতম। হজরত আবুবকর (রা.)ও তাঁকে কোরআন একত্র করা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেন।

হজরত মুয়াজ (রা.) ছিলেন একই সঙ্গে কারি, ফকিহ, প্রশাসক ও গোত্রীয় নেতা। বিশেষত ইলমুল কোরআনে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা চার ব্যক্তি থেকে কোরআন গ্রহণ করো—আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম মাওলা আবি হুজাইফা, মুয়াজ ইবনে জাবাল ও উবাই বিন কাব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭১৩)

ইয়ামেনবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত মুয়াজ (রা.)-কে সেখানে প্রেরণ করেন তাদের কোরআন, ঈমান ও আহকাম শেখানোর জন্য। মক্কা বিজয়ের পরও আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে মক্কায় রেখে আসেন মানুষকে ঈমান, কোরআন ও ইসলাম শেখানোর জন্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই তরুণ সাহাবি ও নেতাকে পছন্দ করতেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে মুয়াজ! আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ মুয়াজ (রা.) বলেন, ‘আপনার জন্য আমার মা-বাবা উৎসর্গ হোক! আমিও আপনাকে ভালোবাসি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫২২)

অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, ‘মুয়াজ কতই উত্তম ব্যক্তি।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৭১২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত মুয়াজ (রা.)-এর জ্ঞানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘তাদের মধ্যে (উম্মত) হালাল ও হারাম সম্পর্কে মুয়াজ ইবনে জাবাল সবচেয়ে ভালো জানে।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৭২৫২)

 

উসমান ইবনে আফফান (রা.)

কোরআনই ছিল যাঁর জীবন

পৃথিবীতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)। কুরাইশদের মধ্যে তিনি ইসলাম গ্রহণকারী চতুর্থ পুরুষ। হজরত ওমর (রা.)-এর পর তৃতীয় খলিফায়ে রাশিদ (ন্যায়পরায়ণ শাসক) উসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কন্যার জামাতা। তাই তাঁকে বলা হতো জিন্নুরাইন (দুই আলোর অধিকারী)। ইসলামের সূচনাকালে মুসলিম উম্মাহর সংকটময় দিনগুলোতে তিনি ইসলামের জন্য অঢেল সম্পদ ব্যয় করেন। তিনি ছিলেন ওহি লেখকদের একজন এবং কোরআনের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী। তাঁর শাসনামলে কোরআন সংরক্ষণ করে তিনি উম্মতকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।

উসমান ইবনে আফফান (রা.) আসহাবে ফিলের (মক্কায় হস্তিবাহিনীর আক্রমণ) ঘটনার ছয় বছর পর জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮ জিলহজ ৩৫ হিজরিতে শহীদ হন। ঘাতকরা আঘাত করার সময় তিনি কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর রক্তে কোরআন রঞ্জিত হয়।

আবুবকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁর বন্ধু ও সহচরদের মধ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) উসমান (রা.)-এর সামনে কোরআন তিলাওয়াত করেন, যেন তা তাঁর হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত হয়। রাসুল (সা.)-এর এই প্রত্যাশা পূরণ সম্পর্কে হজরত উসমান (রা.)-এর শিষ্য আবু আবদুর রহমান সুলামি (রহ.) বলেন, ‘উসমান (রা.) ১০ আয়াতের বেশি মুখস্থ, তার মর্ম ও শিক্ষা অর্জন এবং তার ওপর আমল করা ব্যতীত সামনে অগ্রসর হতেন না। এভাবেই তিনি কোরআনকে মুখস্থ, আত্মস্থ ও জীবনে বাস্তবায়ন করেন। তিনি বলতেন, ‘পৃথিবীতে আমার কাছে তিনটি জিনিস প্রিয়। তা হলো—ক্ষুধার্ত মানুষকে তৃপ্ত করা, নগ্ন ব্যক্তিকে কাপড় দান ও কোরআনের তিলাওয়াত।’

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘হজরত উসমান (রা.) দিনে-রাতে একবার কোরআন খতম করতেন।’

উসমান (রা.) সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মূল্যায়ন হলো, কোরআন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের হৃদয় পবিত্র হয়, তবে আল্লাহর কালাম দ্বারা আমরা কখনো তৃপ্ত হব না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এমন দিন আমি অপছন্দ করি, যেদিন আমি কোরআনের প্রতি দৃষ্টি দেব না।’

হজরত উসমান (রা.) ছিলেন কাতিবে ওহি (ঐশী প্রত্যাদেশের লেখক)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত জিবরাঈল (আ.)-এর উপস্থিতিতে রাসুলে আকরাম (সা.) উসমান (রা.)-কে ওহি লেখার নির্দেশ দিতেন। (মুসনাদে আহমাদ) কোরআনের প্রতি অনুরাগ থেকে উসমান (রা.) সারা জীবন মানুষকে কোরআন শিখিয়েছেন। কোরআন সংরক্ষণ, তার প্রচার ও প্রসারে কাজ করে গেছেন। তাঁর ছাত্রদের অনেকেই ইলমুল কিরাতে খ্যাতি অর্জন করেন; যেমন—আবু আবদুর রহমান সুলামি, মুগিরা ইবনে আবি শিহাব, আবুল আসওয়াদ, জর ইবনে হুবাইশ প্রমুখ।

শাহাদাতের আগে হজরত উসমান (রা.) এক মাসের বেশি সময় গৃহবন্দি ছিলেন। এ সময় তিনি খানিকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। একাকিত্বের এই সময় তিনি কোরআনকে আরো বেশি আপন করে নেন। এক রাতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘আমি রাতে নিহত হব। তাঁর স্ত্রী বললেন, না, হে আমিরুল মুমিনিন। তারা এ কাজ কখনো করতে পারবে না। তিনি উত্তরে বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.), আবুবকর ও ওমরকে স্বপ্নে দেখেছি। তাঁরা আমাকে বলছেন, তুমি রাতে আমাদের সঙ্গে ইফতার করবে।’

তথ্যসূত্র : আল আলুকাহ, ইসলাম ওয়েব, কিসসাসুল ইসলাম

মন্তব্য