kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

ইসলামে ভুল চিকিৎসার শাস্তি

মোস্তফা কামাল গাজী   

২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইসলামে ভুল চিকিৎসার শাস্তি

দেশজুড়ে ভুল চিকিৎসায় রোগীর অঙ্গহানি, প্রাণহানি ও মারাত্মক ধরনের শারীরিক ক্ষতির অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। এসব অভিযোগের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর সব প্রতারণার চিত্র। যেমন—ডাক্তার না হয়েও চিকিৎসা দেওয়া, ওয়ার্ডবয়কে দিয়ে অস্ত্রোপচার, বিনা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারে বাধ্য করা ইত্যাদি। নানা কৌশলে নিরীহ রোগীদের প্রতারণা করছে এক শ্রেণির ‘চিকিৎসা ব্যবসায়ী’। হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। ফলে চিকিৎসাসেবায় সৃষ্টি হচ্ছে ভীতিকর পরিস্থিতি। ডাক্তারের ওপর থেকে উঠে যাচ্ছে বিশ্বাস। ঝুঁকিতে পড়ছে রোগীদের জীবন। গত জুন পর্যন্ত দুই বছরে সারা দেশে ভুল চিকিৎসা ও ভুয়া ডাক্তারের কবলে পড়ে সাড়ে চার শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর নামিদামি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ৬৭ জন এবং ঢাকার বাইরে আরো প্রায় ৪০০ রোগী মারা যায়।

একইভাবে দেশজুড়ে ওষুধ বাণিজ্যেও চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য। ভেজাল ওষুধে সয়লাব বাজার। নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং ওষুধ কম্পানির দৌরাত্ম্যে জিম্মি হয়ে পড়ছে রোগীরা। রোগীরা জানতেও পারছে না টাকা দিয়ে আসলে তারা কী কিনছে!

ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু বা অঙ্গহানি হলে দোষী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন দেশে নেই। কিন্তু ইসলামে এ ব্যাপারে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ইচ্ছাকৃত হত্যা বা ভুলবশত হত্যা উভয়ের দণ্ডবিধি পবিত্র কোরআনে রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়। তবে ভুলবশত হলে তা ভিন্ন বিষয়। কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মুমিন দাস মুক্ত করবে এবং তার পরিজনবর্গকে দিয়ত অর্পণ করবে। যদি না তারা ক্ষমা করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯২)

এই আয়াতে দিয়ত বা রক্তপণ হচ্ছে প্রায় ১৯ ভরি সোনা বা দুই হাজার ৬২৫ ভরি রুপা কিংবা ১০০ উট (নির্দিষ্ট বয়সের)। এটা হচ্ছে পূর্ণ দিয়ত, যা নিহত ব্যক্তি পুরুষ হলে ওয়াজিব হয়। আর নারীর দিয়ত সর্বক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক। (হেদায়া, ৪/৬৫৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘চিকিৎসক হিসেবে সুপরিচিত নয় এমন কেউ যদি চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগীর ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে তার ওপর জরিমানা আরোপ হবে।’ হাদিসের বর্ণনাকারী আব্দুল আজিজ বলেন, ‘এটা শুধু ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে নয়, বরং শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৩০)

হাদিসের অর্থ হচ্ছে, চিকিৎসক যদি অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে রোগীর ক্ষতি করে ফেলেন, তাহলে তাঁকে জরিমানা দিতে হবে। মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) বিষয়টি এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে ডাক্তার দুই ধরনের—এক. বিজ্ঞ ডাক্তার, দুই. অনভিজ্ঞ ডাক্তার।

কোনো বিজ্ঞ ডাক্তার যদি রোগীর সম্মতিতে চিকিৎসার সব নিয়ম মেনে চিকিৎসা করেন, অস্ত্রোপচার করেন, তদুপরি দুর্ঘটনাক্রমে রোগীর মৃত্যু, অঙ্গহানি বা অন্য কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে ডাক্তার দায়ী হবেন না। তাঁর ওপর কোনো জরিমানা বর্তাবে না। বিজ্ঞ ডাক্তার যদি রোগীর অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার করেন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রীয় নিয়ম-নীতিবহির্ভূত হয় আর তাতে রোগী মারা যায় তাহলে চিকিৎসকের ওপর দিয়ত (রক্তপণ) আরোপিত হবে। কোনো অঙ্গহানি হলে শরিয়তের নির্ধারিত জরিমানা (অঙ্গের পণ) বর্তাবে।

অনভিজ্ঞ ডাক্তারের সঠিক বা ভুল চিকিৎসায় যেকোনোভাবেই রোগীর মৃত্যু হলে ডাক্তারের ওপর পূর্ণ দিয়ত (রক্তপণ) বর্তাবে। অঙ্গহানি হলে অঙ্গের পূর্ণ জরিমানা দিতে হবে। ডাক্তার যদি নিজ হাতে অস্ত্রোপচার করেন, ইঞ্জেকশন বা স্যালাইন পুশ করেন কিংবা ওষুধ নিজ হাতে খাইয়ে দেন, সে ক্ষেত্রেই শুধু ওপরের বিধান প্রযোজ্য। চিকিৎসক যদি শুধু ওষুধ লিখে দেন বা প্রেসক্রিপশন দেন এবং এর বেশি কিছু না করেন আর ওষুধ সেবন করে রোগীর ক্ষতি হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত বিধান প্রযোজ্য নয়। বিচারক সে ক্ষেত্রে চিকিৎসককে কোনো যৌক্তিক শাস্তি দিতে পারেন। (ফতওয়ায়ে শামি, ৯/২১৪; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৫৬)

তবে ইসলাম শুধু জাগতিক শাস্তিই নয়, পরকালীন জবাবদিহির কথাও বলে। জবাবদিহির চিন্তা মানুষকে সৎ ও নিষ্ঠাবান থাকতে সহায়তা করে। অন্যায়, অপরাধ ও দুর্নীতি থেকে বিরত রাখে। মানুষের মধ্যে যদি এই চিন্তা জাগরূক থাকে যে কিয়ামতের দিন আমার প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, তাহলে সে স্বেচ্ছায়ই অপরাধ থেকে বিরত থাকবে। অন্যথায় শত আইন ও নজরদারি করেও অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। দেশের মানুষের মধ্যে যদি পরকাল-ভাবনা সৃষ্টি হয়, তাকওয়া অর্জন হয় তাহলে সামগ্রিকভাবে অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে ফিরে আসবে। অতঃপর প্রত্যেককে তার কর্মফল পুরোপুরি দেওয়া হবে। আর তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮১)

পরকালের ভাবনা সৃষ্টি হলে গোটা কোরআন ও ইসলামের হুকুম-আহকাম মান্য করা সহজ হবে। পবিত্র কোরআনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে বারবার আখিরাত ও কিয়ামত দিবসের জবাবদিহি ও হিসাব-নিকাশ ইত্যাদির আলোচনা এসেছে। চিকিৎসক, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যেও যদি পরকাল-ভাবনা সৃষ্টি হয় তাহলে নৈরাজ্য ও দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে। ইনশাআল্লাহ! সর্বোপরি চিকিৎসকদের ভুলের কারণে রোগীর মৃত্যু ও অঙ্গহানির ঘটনা যে হারে বাড়ছে তা উদ্বেগজনক। অতি সত্বর এর বিহিত না করলে মানুষ চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম বাগ্নীবাড়ি মাদরাসা

সাভার, ঢাকা

মন্তব্য