kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

মুসলিম উম্মাহর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব

ওআইসির ৫০ বছর

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ওআইসির ৫০ বছর

আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলের অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)। ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট আল-আকসা মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মসজিদের কাঠের তৈরি ছাদ, আট শ বছরের পুরনো কার্পেটসহ অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস হয়ে যায়। অগ্নিকাণ্ডের পর জেরুজালেমের প্রধান মুফতি আমিন আল হুসাইনি ইসরায়েল তা করেছে বলে দাবি করেন এবং ভবিষ্যতে ‘ইহুদিবাদী অপরাধ’ রোধের জন্য মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

ওই বছরেরই ২৫ সেপ্টেম্বর মুসলিম বিশ্বের ২৪ জন রাষ্ট্রনেতা মরক্কোর রাবাতে বৈঠকে মিলিত হন এবং মুসলিম দেশগুলো নিয়ে সহযোগিতামূলক একটি সংগঠন তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। একই দিন তাঁরা ওআইসি চার্টার স্বাক্ষর করেন। সংগঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে ১৯৭০ সালের মার্চে সৌদি আরবের জেদ্দায় মুসলিম বিশ্বের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিলিত হন। ১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ওআইসি। প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর পর ওআইসির সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ৫৭ হয়েছে। পর্যবেক্ষক হিসেবে ওআইসির সঙ্গে যুক্ত আছে পাঁচটি দেশ (রাশিয়া, বসনিয়া, থাইল্যান্ড, সিএআর ও তুর্কি সাইপ্রাস) এবং সাতটি সংগঠন ও সংস্থা। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য পদ লাভ করে বাংলাদেশ। একাধিক প্রতিবেশী দেশের পরামর্শ উপেক্ষা করে এই সম্মেলনে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মহাসচিবই ওআইসির নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। ওআইসির প্রথম মহাসচিব ছিলেন মালয়েশিয়ার টুংকু আবদুর রহমান এবং বর্তমান (১১তম) মহাসচিব সৌদি আরবের ড. ইউসুফ বিন আহমদ আল উসাইমিন। সদস্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মহাসচিব নির্বাচনে ভোট দেন। একজন ব্যক্তি পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য সর্বোচ্চ দুইবার মহাসচিব হতে পারেন।

মূল সংগঠনের বাইরে ওআইসির ছয়টি সহযোগী, ১৮টি অধিভুক্ত, সাতটি বিশেষায়িত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান এবং চারটি স্ট্যান্ডিং কমিটি রয়েছে। এ ছাড়া ওআইসি চারটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ছয়টি আঞ্চলিক অফিস পরিচালনা করে। সৌদি আরবের জেদ্দায় সংগঠনটির প্রধান কার্যালয় অবস্থিত।

মুসলিম রাষ্ট্রনেতাদের শীর্ষ সম্মেলন ওআইসির প্রধান কার্যক্রম। পাঁচ বছর পর পর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনেও মহাসচিব ওআইসির শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করতে পারেন। এ পর্যন্ত ১৪টি সাধারণ এবং সাতটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে সদস্য দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়েও একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যেমন—পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শ্রম, নারী ইত্যাদি বিষয়ক মন্ত্রীরা পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়নচিন্তা থেকে বৈঠক করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং মুসলিম দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর নানা অবিচারের শিকার হয়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম দেশগুলো ধীরে ধীরে স্বাধীন হতে থাকে, তবু খেলাফতব্যবস্থার শূন্যতা ও ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত রয়ে যায় প্রায় প্রতিটি দেশেই, বিশেষত ইসলামের প্রথম কিবলা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্মৃতিবাহী আল-আকসা মসজিদ এবং ফিলিস্তিন ইস্যু মুসলিম উম্মাহকে দারুণভাবে হতাশ ও মর্মাহত করে। এমন পরিস্থিতিতে ওআইসির প্রতিষ্ঠা মুসলিম দেশের জনগণকে আশাবাদী করে তোলে। হয়তো এই সংগঠন খেলাফতব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বে যে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও পূরণ করে। ওআইসির ঘোষণায় সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথাও বলা হয়েছে। যেমন—সদস্য দেশগুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরস্পরের সহযোগিতা করবে; বিশেষত শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে অগ্রগতি নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া তা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ওআইসি প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে না পারলেও তার বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ রয়েছে। তবে যে রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ওআইসির প্রতিষ্ঠা, সে ক্ষেত্রে, এমনকি মুসলিম বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না ওআইসি। যেসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিল সংগঠনটি, আজ ওআইসির নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর বড় অংশই সেসব দেশের পদলেহনে ব্যস্ত। বিশ্বরাজনীতিতে মুসলিম স্বার্থ সুরক্ষার প্রশ্নেও তাদের ভূমিকা রহস্যজনক। ধনী ও নেতৃস্থানীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা মুসলিম উম্মাহকে নতুন উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

১৯৯০ সালের ৫ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে ইসলামে মানবাধিকারবিষয়ক কায়রো ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার পাশাপাশি মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সুশাসন ও সুষম উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়। বিশ্লেষকদের দাবি, এই ঘোষণাও বাস্তবায়িত হয়নি ওআইসির বেশির ভাগ দেশে। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বেশির ভাগ সদস্য দেশেই রাজনৈতিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। তাই বলা যায়, ওআইসির সম্মেলন ও অঙ্গীকার ঘোষণাসর্বস্ব বিষয়ে পরিণত হচ্ছে দিন দিন।

বর্তমানে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে ওআইসির শীর্ষ সম্মেলন চলছে। সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। তাদের এ কথার সত্যতাও পাওয়া গেছে গত ৩১ মের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সৌদি বাদশাহর বক্তব্যে। তিনি মুসলিম দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। অথচ ইরান-সৌদি আরব সংকটের মূলে রয়েছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক আধিপত্য ও তেলের বাজার দখল। নিজস্ব ও আঞ্চলিক স্বার্থের সংঘাতকে ওআইসির ঘাড়ে চাপানোর এই প্রবণতাকেও বিপজ্জনক মনে করছেন অনেকেই। তাঁরা মনে করেন, এতে সংগঠনের ঐক্য ও সংহতি সংকটে পড়বে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন না করে সদস্য দেশগুলোর উচিত হবে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা, সিরিয়া ও ইয়েমেনের মানবিক সংকট মোকাবেলায় মুসলিম দেশগুলোর মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।

তথ্যসূত্র : ওআইসির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট