kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

যে বার্তা দিয়ে যায় রমজান

ড. ইকবাল কবীর মোহন   

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যে বার্তা দিয়ে যায় রমজান

রমজানের সিয়াম সাধনা এক অনন্য ইবাদত। প্রতিবছর রহমত, নাজাত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে হাজির হয় রমজান। ইসলাম সাম্য-মৈত্রী, খোদাভীতি, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, শৃঙ্খলা, মমত্ববোধ, দান, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের যে মহান শিক্ষা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের সুযোগ এনে দেয় রমজানের সিয়াম সাধনা। রোজার অসংখ্য শিক্ষার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।

 

রোজা তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম

রমজানের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হচ্ছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ে এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে কোনো গর্হিত ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য মনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবল ইচ্ছাই তাকওয়া। যে আল্লাহকে ভয় করে তাকে বলা হয় মুত্তাকি। রমজানের রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)

আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজানের সিয়াম সাধনা তাকওয়ার গুণ অর্জনের মাধ্যমে মুত্তাকি হওয়ার অন্যতম উপায়।

 

রোজা ইবাদতের সুযোগ তৈরি করে

রোজা সাধনার মাস। পবিত্রতা অর্জন ও ইবাদতের মাস। ক্ষুধার যন্ত্রণা, প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস রোজাদারের জীবনকে অন্য আঙ্গিকে তৈরি করে। এ সময় রোজাদার বেশি বেশি দৈহিক ও আর্থিক আমল করার জন্য প্রস্তুত থাকে। তাই রোজাদার বেশি বেশি দান করে, অসহায় ও দরিদ্রকে অর্থ বা খাবার দিয়ে সাওয়াব অর্জনের চেষ্টা করে।

রোজার কারণেই মানুষের মধ্যে ইবাদতের এই অনুভূতি জাগ্রত হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস রোজাদারকে প্রেরণা জোগায়, যেখানে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসে আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সাওয়াব ১০ গুণ হতে ৭০০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)

 

রোজা ধৈর্য, সংযম ও ত্যাগের প্রশিক্ষণ দেয়

সিয়াম মূলত ধৈর্য, ত্যাগ ও সংযমের অনুশীলন। ধৈর্য, ত্যাগ ও সংযম একে অন্যের পরিপূরক। ধৈর্য না থাকলে জীবনে কোনো কিছুই অর্জন করা যায় না। মহানবী (সা.) এক হাদিসে রোজার মাসকে ধৈর্যের মাস বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘রমজান সবরের মাস, আর সবরের পুরস্কার হলো জান্নাত।’ (বায়হাকি)

রোজার মাসে রোজাদারকে কঠিন ধৈর্য ও সংযমের অনুশীলন করতে হয়। আল্লাহ তাআলা রোজার মাধ্যমে মুমিনকে ত্যাগ, সংযম ও ধৈর্যের শিক্ষা দেন, যেন সে বাস্তব দুনিয়ার সব দুঃখ-কষ্ট, আপদ-বিপদ, সংকট, রোগ-শোক, বালা-মুসিবত মোকাবেলা করে মুত্তাকি বান্দা হিসেবে জীবন পরিচালনা করতে পারে।

 

রোজা সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে

আল্লাহর রাসুল (সা.) রমজানকে সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের মাস বলে উল্লেখ করেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রমজান পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশের মাস।’ (বায়হাকি)

ধনী বা সম্পদশালী মুসলমানরা সারা দিন রোজা রেখে ক্ষুন্নিবৃত্তির কষ্ট এবং না খেয়ে থাকার জ্বালা উপলব্ধি করতে পারে। ফলে অসহায় ও গরিব মানুষের কষ্ট তারা অনুধাবন করার সুযোগ পায়। এতে বিত্তহীন ও গরিব-দুঃখীর প্রতি সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধ তৈরি হয়।

 

রোজা শিষ্টাচার ও আদর্শ চরিত্র শেখায়

রোজদার সিয়াম পালনকালে নিজেকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অন্যায় ও পাপাচার থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করে। কেননা সে জানে, রোজা রেখে মন্দ কাজ করলে রোজার কোনো মূল্যই নেই। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করতে পারেনি, তার খাদ্য ও পানীয় পরিহার করার কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি)

ফলে রোজাদার ভালো আচরণ করে, সুন্দরভাবে কথা বলে, মিথ্যা কথা ও কাজে সে অংশ নেয় না। ধোঁকা ও প্রতারণা রোজাদারের পক্ষে সম্ভব হয় না। এভাবেই রোজাদারের ভেতর শিষ্টাচার, নম্রতা, আদব এবং উন্নত চরিত্রের এক মহীয়ান সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়।

 

রোজা নাজাত ও মাগফিরাত লাভের সুযোগ

রমজানের রোজা গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। সুরা বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ, যদি তোমরা জানতে।’

রোজা পালনের কারণে এবং রোজাদারকে ইফতার করানোর ফলে গুনাহ মাফ হয় বলে উল্লেখ করেছেন মহানবী (সা.)। রাসুল (সা.) এক হাদিসে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে এবং দোজখ থেকে তাকে নাজাত দেওয়া হবে।’

গুনাহ থেকে রোজাদারকে মুক্তির ব্যাপারে মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের তাগিদে এবং সাওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বেকার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।’ (বুখারি ও মুসলিম)

 

রোজার মাস ঐক্য ও সংহতির মাস

রমজান সারা দুনিয়ার মুসলমানের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির ডাক দেয়। পৃথিবীর সব মুসলিম একই নিয়মে একইভাবে রোজা পালন করে, যা ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। আল্লাহর নির্দেশে সব মুসলমান একই নিয়মে এবং সময়ে তারাবির নামাজ আদায় করে এবং ঈদুল ফিতরের ফিতরা প্রদান করে। তারপর সবাই ঈদগাহে গিয়ে নামাজ আদায় করে, কোলাকুলি করে, ঈদের আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। এভাবে মুসলমানের মধ্যে তৈরি হয় ঐক্য ও সংহতির সম্পর্ক।

রমজানের যে অফুরন্ত মহিমা ও সীমাহীন সওগাত, প্রতিটি মুসলিমের সঠিকভাবে রোজা পালনের মাধ্যমে তা গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা রহমত, নাজাত ও মাগফিরাতের যে অপরিসীম সুযোগ রোজার দিনগুলোতে দান করেছেন তা যদি আমরা কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে আমরা হব দুর্ভাগা।

মহানবী (সা.) এ ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজায় অনাহারে থাকা ছাড়া কোনো উপকার নেই, আর অনেক লোক রয়েছে, যারা রাতে জাগ্রত থেকে নামাজে দণ্ডায়মান হয় আর জাগরণ ছাড়া তাদের কোনো উপকার নেই।’ (মেশকাত)

 

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, প্রকাশক ও সাবেক ব্যাংকার

 

 

মন্তব্য