kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

দেশে দেশে রমজান

আয়ারল্যান্ডে ১৯ ঘণ্টা রোজা, রাত জেগে ইবাদত

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আয়ারল্যান্ডে ১৯ ঘণ্টা রোজা, রাত জেগে ইবাদত

দৃষ্টিনন্দন পাহাড়, নদী, সাগরে ঘেরা উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের একটি দ্বীপ আয়ারল্যান্ড; যেখানকার মানুষ সারা বছরে একনাগাড়ে সাত দিন সূর্য দেখার সুযোগ পায় না। রাজধানীর নাম ডাবলিন, যা আয়ারল্যান্ডের সর্ববৃহৎ দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। অত্যন্ত ছিমছাম এই শহরের রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড়ও কম দেখা যায়।

দক্ষিণ ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর; আড়াই হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করলেই আমেরিকা। এর মাঝে আর কোনো দেশ নেই। পূর্বে আইরিশ সাগর। উত্তরে উত্তর সাগর। দ্বীপটির এক-ষষ্ঠাংশ ব্রিটেনের অধীনে। এ অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ড নামে পরিচিত। আয়ারল্যান্ড একসময় আমাদের মতোই দীর্ঘদিন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ৬ ডিসেম্বর ১৯২২ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর এটি আইরিশ রিপাবলিক নামে পরিচিতি লাভ করে।

দেশটির আয়তন ৭০ হাজার ২৭৩ বর্গ কিলোমিটার, যার মধ্যে স্থলভাগ ৬৮ হাজার ৮৮৩ আর জলভাগ এক হাজার ৩৯০ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র ৫০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০, যার মধ্যে ১.৩ শতাংশ মুসলমান। তবে এখানকার বেশির ভাগ মানুষ ক্যাথলিক খ্রিস্টান। ২০০৬ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৩ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকের মতে, প্রকৃত মুসলিম অধিবাসী ৪০ হাজারের বেশি। এক তথ্য মতে, ২০০২ ও ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময় আয়ারল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০ শতাংশেরও বেশি। এই হিসাবে দেশটির সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ধর্ম হলো ইসলাম।

অতীতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে এখানে মুসলমানদের আগমন ঘটে। তাদের মধ্যে কেউ এসেছিল শিক্ষার প্রয়োজনে, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে। তাদের অনেকেই দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। অনেকে আবার আইরিশ মেয়েদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আয়ারল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করে।

১৯৯০ সালের শুরুর দিকে এখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও বলকান এলাকা থেকে অনেক মুসলমান পাড়ি জমায়। তাদের অনেকেই অভিবাসী এবং অন্যরা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রত্যাশী। এ ছাড়া এখানে নাইজেরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, সোমালিয়া, আলজেরিয়া ও অন্যান্য দেশের অনেক মুসলমান রয়েছে। ইদানীং সেখানে নওমুসলিমের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।

১৯৫৯ সালে সেখানে সর্বপ্রথম ডাবলিন ইসলামিক সোসাইটি নামে মুসলমানদের একটি ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অব আয়ারল্যান্ড নামে পরিচিত হয়। এ ছাড়া সেখানে রয়েছে ইসলামিক কালচালার সেন্টার অব আয়ারল্যান্ড, আল মোস্তফা ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ডসহ বেশ কিছু ইসলামিক সেন্টার।

এ দেশের মুসলমানদের রোজা রাখতে হয় প্রায় ১৯ ঘণ্টা। কিন্তু এতে মোটেই চিন্তিত নয় সেখানকার মুসলমানরা। পবিত্র রমজানজুড়ে সেখানকার ইসলামিক কালচারাল সেন্টারগুলোর থাকে নান্দনিক আয়োজন, যার অংশ হিসেবে রমজানের দিনের বেলায় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোতে আয়োজন করা হয় ধর্মীয় আলোচনা, আরবি ভাষা শিক্ষার। পাশাপাশি কোরআন শিক্ষা কোর্স তো আছেই।

এ ছাড়া মসজিদ ও ইসলামিক কালচারাল সেন্টারগুলোতে করা হয় দেশি-বিদেশি নান্দনিক ইফতারের আয়োজন, যা দেখে যে কারোই মনে হবে, কোনো আন্তর্জাতিক ফুড ফেস্টিভাল চলছে। সেখানে আইরিশ খাবারের পাশাপাশি আরবীয়, জার্মান, নাইজেরীয়সহ নানা দেশের ইফতারের ব্যবস্থা থাকে। সেখানে মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমদেরও স্বাগত জানানো হয়।

কোনো কোনো ইসলামিক সেন্টারে তারাবির পর ইমাম সাহেব ধর্মীয় আলোচনা করেন। রাত জেগে সেখানে ইবাদত হয়। আলোচনা শেষে আলোচ্য বিষয়ের ওপর মুসল্লিদের প্রশ্ন করা হয়, সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হয় প্রায় ২০০ ইউরো পর্যন্ত। এ বছর আয়ারল্যান্ডের ছোট ও বড়দের জন্য করা হয়েছে কোরআন প্রতিযোগিতা।

এককথায় পবিত্র মাহে রমজানকে কেন্দ্র করে আয়ারল্যান্ড হয়ে ওঠে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য মিলনমেলা।

 

মন্তব্য