kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

আজানের আওয়াজে জেগে ওঠে পৃথিবী

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



আজানের আওয়াজে জেগে ওঠে পৃথিবী

আজান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরধ্বনি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান প্রচারিত হয়। আজানের ধ্বনি মুমিনের মর্মে মর্মে বেজে ওঠে। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজান মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা। আজান নামাজের জন্য ডাক দিয়ে যায়। মহাকল্যাণের হাতছানি দেয়। আজান নব উদ্যমে জাগরণের প্রতীক। ফজরের আজানের আওয়াজে পৃথিবীর ঘুম ভাঙে। কোনো কোনো গবেষণা বলছে, পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে সব সময় আজান হয়। লিখেছেন আতাউর রহমান খসরুমুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

 

যেভাবে পৃথিবীতে এলো আজানের ধ্বনি

পৃথিবীর মধুরতম শব্দ-সুর আজানের। আজানের ধ্বনিতে জেগে ওঠে পৃথিবী, জেগে ওঠে মানবহৃদয়। পাপ-পঙ্কিলতার জীবন ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ধাবিত হয় মানুষ আজানের শব্দ শুনে। মহাকবি কায়কোবাদ লিখেছেন, ‘কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি,/মর্মে মর্মে সেই সুর,/বাজিলো কি সুমধুর,/আকুল হইলো প্রাণ, নাচিলো ধমনি।/কি মধুর আযানের ধ্বনি।’

মানুষের হৃদয় আকুল করা, প্রাণে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা আজানের ধ্বনি পৃথিবীতে এসেছিল মধুর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহ স্বপ্নযোগে তাঁর কয়েকজন পুণ্যাত্মা বান্দার হৃদয়ে ঢেলে দিয়েছিলেন এই পবিত্র ধ্বনি। অবচেতনে তাঁদের শিখিয়েছিলেন তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণার এই অভিনব পদ্ধতি। মূলত আজানের সূচনা হয়েছে নামাজের জামাত অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা থেকে। মক্কিজীবনে নামাজ ফরজ হলেও সেখানে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের অবাধ সুযোগ ছিল না। সেখানে নামাজ ও নামাজের জামাতে ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর আল্লাহ মুসলমানের জন্য পৃথিবী প্রশস্ত করে দিলেন। ফলে তারা স্বাধীনভাবে ইবাদতের সুযোগ পেল। অন্যদিকে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের নামাজের সময় সম্পর্কে অবহিত করা এবং মসজিদে আহ্বানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজন পূরণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আজান ও তার বিধান দান করেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, মুসলমানরা যখন হিজরত করে মদিনায় এলো, তখন তারা নামাজের জন্য অনুমানের ভিত্তিতে একটা সময় ঠিক করে নিত এবং সে অনুযায়ী সমবেত হতো। তখন নামাজের জন্য কেউ আহ্বান করত না। একদিন তারা এ বিষয়ে আলোচনা করল। কেউ বলল, খ্রিস্টানদের মতো নামাজের সময় ঘণ্টা বাজানো হোক। আবার কেউ কেউ প্রস্তাব দিল, নাসারাদের মতো শিঙা বাজানো হোক। হজরত ওমর (রা.) বলেন, তোমরা কি নামাজের সময় সবাইকে আহ্বান করতে একজন লোক পাঠাতে পারো না? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত বেলালকে বলেন, ‘বেলাল, তুমি ওঠো এবং নামাজের জন্য আহ্বান করো।’ (বুখারি ও মুসলিম)

আলোচ্য হাদিস থেকে জানা যায়, জামাতের জন্য সবাইকে একত্র করার পদ্ধতি নির্ধারণের প্রথম বৈঠকে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ওমরের প্রস্তাব পছন্দ করলেও আহ্বানের শব্দ কী হবে সে সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সে বৈঠক মুলতবি হয়ে যায়। রাসুলের দরবারে উপস্থিত সব সাহাবি সেদিন ঘরে ফিরে যান গভীর চিন্তা নিয়ে এবং রাতের ঘুমে অনেকেই স্বপ্নযোগে আজানের শব্দগুলো শিখে নেন। আর এ স্বপ্নটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন, ‘সকাল হলে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে গেলাম। তাঁকে আমার স্বপ্নের কথা বললাম।

তিনি বলেন : যাও, বেলালের সঙ্গে যাও। কেননা তার কণ্ঠস্বর তোমার থেকে উঁচু ও দীর্ঘ। সুতরাং তুমি তাকে শিখিয়ে দাও, যা তোমাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে এগুলো দিয়ে আজান দেবে।’ হজরত জায়েদ বলেন, ‘যখন ওমর (রা.) নামাজের জন্য বেলালের আজান শুনতে পেলেন, তখন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উদ্দেশে বের হলেন, (এবং এত তাড়াতাড়ি চলতে লাগলেন যে) তিনি তাঁর চাদর টানতে টানতে এ কথা বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেই মহান সত্তার নামে শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, বেলাল যা বলছে আমি তেমনই স্বপ্ন দেখেছি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

এভাবেই পৃথিবীতে এসেছিল আজানের পবিত্র ধ্বনি। মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে শিখিয়েছিলেন কিভাবে তাঁর বড়ত্বের ঘোষণা দিতে হবে, কিভাবে তাঁর রাসুলের রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে হবে। তিনি শুধু আজানের ধ্বনি ও শব্দ শেখাননি, বরং যারা পবিত্র ধ্বনির মাধ্যমে মানুষকে আহ্বান জানাবে এবং যারা সেই আহ্বানে সাড়া দেবে, সবার জন্য বিশেষ মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জন্য দোয়া করেছেন, ‘ইমামরা হলেন উম্মতের দায়িত্বশীল আর মুয়াজ্জিনরা আমানতদার। হে আল্লাহ! আপনি ইমামদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন আর মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা করে দিন।’ (সুনানে আবি দাউদ)।

 

আজানের গুরুত্বপূর্ণ ১০ মাসআলা

১. আজান ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। সুতরাং কেউ আজান অস্বীকার করলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।

২. আজান দেওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তবে মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে একজন আজান দিলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর কেউ না দিলে সবাই গুনাহগার হবে।

৩. সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আজান অস্বীকারকারী শহরবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বৈধ মনে করতেন।

৪. আজান একটি ইবাদত। তার শব্দ ও পদ্ধতি উভয়টি রক্ষা করা আবশ্যক। সুতরাং আজান সময়মতো, আরবি ভাষায় ও দাঁড়িয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে দিতে হবে।

৫. আজানের শব্দ বিকৃত না হওয়া পর্যন্ত আজানের শব্দে সুর দেওয়া বৈধ।

৬. আজান দেওয়ার জন্য মুসলিম হতে হবে।

৭. শিশুর আজান বৈধ। তবে শিশু অবুঝ হলে তার আজান অগ্রহণযোগ্য।

৮. আজান পুরুষের দায়িত্ব।

৯. উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে আজান দেওয়া মুস্তাহাব; তবে আবশ্যক নয়।

১০. হানাফি মাজহাব অনুসারে আজানের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। অন্য মাজহাব মতে মুস্তাহাব।

সূত্র : মাসায়িলুল মুহিম্মাহ ফিল আজানি ওয়াল ইকামাহ

 

পৃথিবীতে ৯ ঘণ্টাব্যাপী ফজরের আজান হয়

ফজরের পবিত্র আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙে মুসলমানের। তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য, নামাজ ও কল্যাণের আহ্বানে দিন শুরু হয় তাদের। ঘোষণা করা হয়, হে মানব! ওঠো, ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম। শুধু স্রষ্টার ইবাদত নয়, জাগতিক অনেক বিচারেও ফজরের আজানের এই আহ্বান কল্যাণের বাহক। আধুনিক যুগের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সকালের নির্মল বায়ু, সূর্যালোক ও কায়িক পরিশ্রমকে স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে সূর্যালোক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কর্মঘণ্টা এগিয়ে নেওয়ার মতও দিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। আর এর সবই সম্ভব হবে, যদি ফজরের আজানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ সূর্য জেগে ওঠার আগে জেগে ওঠে।

আজান কল্যাণের পথে আহ্বান করে, আজান কল্যাণের ধারক। আর সেই কল্যাণের ধারা পৃথিবীব্যাপী অব্যাহত থাকে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা। এটা মুসলিম বিশ্বের হিসাবে। আর যদি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমের শেষ শহর হিসাব করা হয় তাহলে ফজরের আজানের দৈর্ঘ্য হবে আরো বেশি।

মুসলিম বিশ্বের সর্বপূর্বের শহর ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়াসি এবং সর্বপশ্চিমের শহর মৌরিতানিয়ার নাওজিবো। গ্রিনিচ মান সময়ের হিসাবে উভয় দেশের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ৯ ঘণ্টা। অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ায় ফজরের আজান শুরু হওয়ার ৯ ঘণ্টা পর আজান হয় আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায়। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়াসি দ্বীপে আজান শুরু হওয়ার পর তা ক্রমেই পশ্চিমের দিকে অগ্রসর হয়। অগ্রসরমাণ আজানের ধ্বনি প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবেই অগ্রসর হতে থাকে।

আজানের ধ্বনি পূর্ব থেকে পশ্চিমে অগ্রসর হওয়ার ধারাক্রমটি এমন—ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, মিসর, লিবিয়া, আলজেরিয়া, মালি, মৌরিতানিয়া। তবে তারও আগে আজান হয় জাপানের নিমুরো দ্বীপে। সেখানে ফজরের আজান হয় রাত ১টা ৫৭ মিনিটে (১২ মে)। আর সর্বশেষ আজান হয় আমেরিকার আলাস্কা প্রদেশের শেষ প্রান্তে। জাপানের নিমুরো দ্বীপে মুসলিম কমিউনিটির ছোট একটি মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেলেও আলাস্কা প্রদেশের শেষ প্রান্তে ঠিক কোথায় মসজিদ রয়েছে তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। শুধু ফজর নয়, পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আজান হয় ৯ ঘণ্টা ধরে।

 

আজানের শব্দে লুকিয়ে থাকা কিছু রহস্য

মহিমান্বিত কিছু শব্দমালার নাম আজান। এই আজানের ভেতর লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হলো। আজানের শুরু হয় ‘আল্লাহ’ শব্দ দিয়ে। আবার শেষও হয় ‘আল্লাহ’ শব্দ দিয়ে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করে যে আল্লাহই শুরু, আল্লাহই শেষ। আল্লাহর বিকল্প কিছু হতে পারে না।

পবিত্র কোরআনে আজানের কথা ‘আজ্জানা’ শব্দটি দুইবার, ‘উজ্জিনা’ একবার ও ‘মুয়াজ্জিন’ দুইবার হয়ে মোট পাঁচবার এসেছে। আর মুসলমানদের ওপর ফরজকৃত নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যাও ৫।

আজানের শব্দসংখ্যা ৫০—১. আল্লাহু ২. আকবার ৩. আল্লাহু ৪. আকবার ৫. আল্লাহু ৬. আকবার ৭. আল্লাহু ৮. আকবার ৯. আশহাদু ১০. আন ১১. লা ১২. ইলাহা ১৩. ইল্লা ১৪. আল্লাহ ১৫. আশহাদু ১৬. আন ১৭. লা ১৮. ইলাহা ১৯. ইল্লা ২০. আল্লাহ ২১. আশহাদু ২২. আন্না ২৩. মুহাম্মাদ ২৪. রাসুল ২৫. আল্লাহ (উল্লেখ্য এখানে ‘রাসুল’ শব্দটি ‘আল্লাহ’ শব্দের সঙ্গে সন্ধি হয়ে ‘রাসুলুল্লাহ’ হয়েছে। যার অর্থ, আল্লাহর রাসুল) ২৬. আশহাদু ২৭. আন্না ২৮. মুহাম্মাদ ২৯. রাসুল ৩০. আল্লাহ ৩১. হাইয়া ৩২. আলা ৩৩. সালাহ ৩৪. হাইয়া ৩৫. আলা ৩৬. সালাহ ৩৭. হাইয়া ৩৮. আলা ৩৪. ফালাহ ৪০. হাইয়া ৪১. আলা ৪২. ফালাহ ৪৩. আল্লাহু ৪৪. আকবার ৪৫. আল্লাহু ৪৬. আকবার ৪৭. লা ৪৮. ইলাহা ৪৯. ইল্লা ৫০. আল্লাহ।

মহান আল্লাহ এই উম্মতের ওপরও প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছিলেন। এর আরেকটি ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে, যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে তাকে ১০ গুণ সওয়াব দেওয়া হবে। সুরা আনআমের ১৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ সৎকাজ করলে সে তার ১০ গুণ প্রতিদান পাবে।’

আজানের বাক্যসংখ্যা ১২, আর বছরের মাসের সংখ্যাও ১২। এর দ্বারা বোঝা যায়, মুমিনের জন্য ১২ মাসই নামাজ ফরজ। পুরো আজানের মধ্যে ঘুরেফিরে যে কয়টি অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে তার সংখ্যা ১৭—

১. আলিফ ২. লাম ৩. হা ৪. কাফ ৫. বা ৬. র ৭. শিন ৮. দাল ৯. নুন ১০. মিম ১১. হা (বড়) ১২. সিন ১৩. ওয়াও ১৪. ইয়া ১৫. আইন ১৬. ছদ ১৭. ফা।

আর সারা দিনে বান্দার ওপর ফরজকৃত নামাজের রাকাতসংখ্যাও ১৭। যেমন—ফজরের ২, জোহরের ৪, আছরের ৪, মাগরিবের ৩, এশার ৪, (২+৪+৪+৩+৪)=মোট ১৭।

আজানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ‘আল্লাহ’ শব্দ, যার মধ্যে মৌলিক অক্ষরের সংখ্যা তিনটি—১. আলিফ ২. লাম ৩. হা। পুরো আজানের মধ্যে আলিফ অক্ষরটি এসেছে ৪৭ বার, লাম ৪৫ বার, হা ২০ বার। ৪৭+৪৫+২০=১১২। পবিত্র কোরআনের ১১২তম সুরাটি হচ্ছে ইখলাস, যেখানে আল্লাহর একত্ববাদের কথা বলা হয়েছে।

 

আজানের ধ্বনিতে যে ফুল ফোটে

আজান মুসলমানের একটি ধর্মীয় পরিভাষা। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় আল্লাহর পথে আহ্বানকে আজান বলা হয়। আজানের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা হয়, কল্যাণের পথে আহ্বান জানানো হয়। আজানের ধ্বনি বিশ্বাসী মানুষের হৃদয়-মনে সাড়া জাগায়। তাকে কল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু এই আজান কি শুধু মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে, নাকি সৃষ্টিজগতের অন্যদের ওপরও প্রভাব ফেলে? হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু মানুষ নয়, বরং সাধারণভাবে সৃষ্টির ওপরও আজানের প্রভাব পড়ে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন শয়তান পালিয়ে যায়। যতক্ষণ না আজান শোনা যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৮)

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত অন্য হাদিসে নবজাতক শিশুর কানে আজান ও ইকামাত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রখ্যাত দার্শনিক আলেম শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) এই হাদিস উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘আজান ইসলামের নিদর্শন ও দ্বিনে মুহাম্মদির শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা। নবজাতকের কানে আজান দিতে বলা হয়েছে, কারণ তা শয়তানকে দূরে রাখে। জন্মের পর শয়তান নবজাতককে কষ্ট দেয়।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ১৪৫) আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘যেন শিশুর মনে তার প্রভুর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব স্থান পায় এবং ইসলামে প্রবেশের সাক্ষ্য তার মনে প্রবেশ করে।’ (তুহফাতুল মাওদুদ বিআহকামিল মাওলুদ, পৃষ্ঠা ২১)

এ ছাড়া আজানের সময় পৃথিবীতে দায়িত্ব পালনকারী ফেরেশতাদের ‘দায়িত্ব পরিবর্তন’ বলেও হাদিসে পাওয়া যায়।

হাদিসের নির্দেশনা ও তার ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, সৃষ্টজীব তথা প্রকৃতির ওপর আজানের প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক। আজানের মাধ্যমে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টিজগতের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কয়েক বছর আগে আমেরিকান টিভি চ্যানেল সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি আরো জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়। প্রতিবেদনে দেখানো হয়, আজানের ধ্বনিতে একটি ফুল ফুটছে। আজারবাইজানের একটি বাগানে স্থানীয় প্রজাতির এই বিশেষ ফুলের সন্ধান পান প্রতিবেদক।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ রাহিম ইলদারোভ এই বাগানের মালিক। তিনি ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের ফুল সংগ্রহ করছেন। তাঁর বাগানে রয়েছে হরেক রকমের ফুল। রং, ঘ্রাণ, প্রজাতির বিচারে প্রতিটি ফুল বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। ফুলগুলোর ফোটার সময়ও ভিন্ন ভিন্ন।

মোহাম্মদ রাহিম ইলদারোভের বাগানে পাওয়া বিশেষ ফুলটি আজানের ধ্বনিতে প্রস্ফুটিত হয়। প্রতিবেদক পাঁচ ওয়াক্ত আজানের সময় ফুলগুলো ফোটার দৃশ্য ভিন্ন ভিন্নভাবে ভিডিও করেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর নাম উচ্চারণের সময়ই ফুটছে ফুলগুলো। এ দৃশ্যই প্রমাণ করে, ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম। ইসলাম, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে গভীর বন্ধন বিদ্যমান। (ইউটিউবে সিএনএনের প্রতিবেদনের ভিডিও লিংক : https://www.youtube.com/watch?v=qgeCCZRaY_Q)

 

প্রাচীন আমলে নামাজের সময় নির্ধারণের একটি রেখাচিত্র

পৃথিবীতে কি সব সময় আজান হয়

সংযুক্ত আরব আমিরাতের গণিতশাস্ত্রবিদরা দাবি করছেন, পৃথিবীতে একমুহূর্তের জন্যও আজান বন্ধ হয় না। আর তা ভূগোল ও মহাকাশবিদ্যার মাধ্যমেই প্রমাণ করা সম্ভব। তাঁরা দাবি করেছেন, ভূখণ্ডে একমূহূর্তের জন্যও আজানের ধ্বনি বন্ধ হয় না। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রতিমুহূর্তে আজান অব্যাহত থাকে। পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন আজান শেষ হয়, অপর প্রান্তে তখন আজান শুরু হয়। এভাবেই ২৪ ঘণ্টা পৃথিবীতে উচ্চারিত হয় আজানের ধ্বনি, আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য।

এই তত্ত্বের প্রবর্তক আবদুল হামিদ ফাদিল বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন, পৃথিবীকে ৩৬০ দ্রাঘিমাংশে ভাগ করা হয়। সময়ের হিসাব এই দ্রাঘিমাংশের ভিত্তিতে করা হয়। প্রতি দ্রাঘিমাংশের দৈর্ঘ্য চার মিনিটের সমান। আর মুয়াজ্জিন যদি আরবি উচ্চারণ রীতি (তাজবিদ) মান্য করে আজান দেয় তাহলে ভূখণ্ডের এক দ্রাঘিমাংশের আজান শেষ হতে কমপক্ষে চার মিনিট সময় প্রয়োজন হয়। এক দ্রাঘিমাংশের আজান শেষ হতে চার মিনিট সময়ের প্রয়োজন হলে পৃথিবীতে ধারাবাহিকভাবে ২৪ ঘণ্টা আজান হওয়া প্রমাণিত হয়।

তবে এই তত্ত্বের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে অনেকের। তাঁরা বলেন, এই তত্ত্ব প্রমাণিত হবে দুটি শর্তে—এক. প্রতি দ্রাঘিমারেখায় চার মিনিটব্যাপী আজান হওয়া। কিন্তু তা হয় না। এক দ্রাঘিমারেখায় আজান শেষ হতে সময় প্রয়োজন হয় সর্বোচ্চ তিন মিনিট। কেননা তাজবিদের সঙ্গে আজান দিলেও তার দৈর্ঘ্য এক মিনিট বা এক মিনিট ৩০ সেকেন্ডের চেয়ে বেশি হয় না। দুই. দ্রাঘিমারেখার মধ্যবর্তী সব স্থানে আজান হওয়া। কিন্তু তা-ও হয় না।

আবদুল হামিদ ফাদিলের এই তত্ত্বের বাইরে মুসলিম স্কলাররা অন্যভাবে পৃথিবীতে সর্বক্ষণ আজান হয় তা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। সেটা হলো, যদি ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়াসি দ্বীপকে মুসলিম বিশ্বের সর্বপূর্বের শহর এবং মৌরিতানিয়ার নাওজিবোকে সর্বপশ্চিমের শহর ধরা হয়, তাহলে উভয় শহরের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান বের হয় ৯ ঘণ্টা। অন্যদিকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের হিসাবে আজানের ধ্বনি ক্রমেই পূর্ব থেকে পশ্চিমে ধাবিত হয়। সুতরাং পৃথিবীতে প্রতি ওয়াক্তের আজান উচ্চারিত হয় ৯ ঘণ্টাব্যাপী। যেহেতু ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়াসি দ্বীপের এশা ও ফজরের আজানের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ৯ ঘণ্টার কম। তাই বলা হয় পৃথিবীতে প্রতিমুহূর্তে কোথাও না কোথাও আজান হয়।

মন্তব্য