kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

রমজানে স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অবহেলা নয়

মুফতি তাজুল ইসলাম   

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রমজানে স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অবহেলা নয়

রমজানের রোজা যেমন ফরজ করা হয়েছে, তেমনি মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতিও খেয়াল করা হয়েছে। এমনভাবে রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটাই চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুসাফিরের জন্য রোজা, নামাজের অর্ধেক এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণীর জন্য রোজার ক্ষেত্রে সুযোগ রেখেছেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৭১৫)

রমজান ও রোজায় যেন স্বাস্থ্যহানি না ঘটে, সে বিষয়ের প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামে লাগাতার না খেয়ে রোজা রাখা নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সাওমে বিসাল তথা লাগাতার না খেয়ে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তো তা করে থাকেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমার মতো হতে পারবে না, আমাকে আমার রব পানাহার করান।’ তার পরও কোনো কোনো সাহাবি অতি আগ্রহে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণে লাগাতার না খেয়ে রোজা রাখতে শুরু করেন। একাধারে কয়েক দিন এভাবে যাওয়ার পর ঈদের চাঁদ উঠে যাওয়ায় সবাই রোজা সমাপ্ত করতে বাধ্য হয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই সব সাহাবিকে ধমকিস্বরূপ বলেন, ‘যদি চাঁদ না উঠত, তাহলে আমি আরো দীর্ঘ করতাম।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১০৩)

রমজানে স্বাস্থ্যসচেতনতার জায়গা থেকে সাহির খাওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সাহির খাওয়াকে ইসলামে ইবাদত হিসেবে দেখা হয়েছে। রোজা রাখার দরুন যাতে স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সে জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহির খেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহির খাওয়ার মাধ্যমে দিনের বেলা রোজা রাখতে সাহায্য নাও।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯৩)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও সাহির খাও।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৪৭৬)

সম্ভবত স্বাস্থ্যসচেতনতার জায়গা থেকেই রমজানে দ্রুত ইফতারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আমর ইবনে মাইমুন (রহ.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা সবার আগে তাড়াতাড়ি ইফতার করতেন এবং সবার চেয়ে দেরিতে সাহির খেতেন।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৫৯১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘মানুষ যত দিন পর্যন্ত তাড়াতাড়ি ইফতার করবে, তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৫৭, মুসলিম,   হাদিস : ১০৯৮)

রমজানে স্বাস্থ্যসচেতনতার জায়গা থেকে রোজায় শিঙা লাগাতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের রোজায় শিঙা লাগাতে নিষেধ করেছেন, যাতে তাঁদের রোজা রাখতে কষ্ট না হয়। এক সাহাবি (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা অবস্থায় শিঙা লাগাতে ও সাওমে বিসাল (লাগাতার রোজা) রাখতে নিষেধ করেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৭৪)

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রোজা অবস্থায় শিঙা লাগাতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে, যেন আমাদের কষ্ট না হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৭৫)

রমজানে নিরাপদ উপায়ে সাহিরর খাবার গ্রহণ করতে এবং মাসজুড়ে সুস্থ থাকার জন্য সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের ব্র্যাকেল আর্জেন্ট কেয়ার সেন্টার। কালের কণ্ঠ’র অনলাইন বিভাগ তাদের দেওয়া রমজানবিষয়ক পাঁচটি টিপস ভাষান্তর করেছে। সেগুলো হলো—

সুষম খাবার : রমজান মাসজুড়ে শরীরের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খেতে হবে সুষম খাবার। এ সময় বেশি করে খেতে হবে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, প্রোটিন, ফল ও সবজি। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।

হালকা খাবার : সাহিরর সময় হালকা খাবার খেতে হবে। যে খাবারগুলো সারা দিন আপনাদের শক্তি জোগাবে, সেই খাবারগুলো খেতে হবে। দানাদার শস্য ও আঁশজাতীয় খাবার খেতে পারেন।

প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন রমজান মাসে সুস্থ থাকতে ফ্যাটযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা প্রক্রিয়াজাত খাবারে ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি বেশি। পাকোরা, সমুচা ও মিষ্টিজাতীয় খাবারগুলো অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

চা-কফি-কোক : রমজান মাসে নিজেকে সুস্থ রাখতে এড়িয়ে চলুন ক্যাফেইনজাতীয় পানীয়গুলো। এ সময় চা-কফি-কোক পান করা থেকে বিরত থাকুন। ক্যাফেইনজাতীয় পানীয়গুলো শরীরে পানিশূন্যতা বৃদ্ধি করতে পারে। তাই বেশি পরিমাণে পানি পান করুন।

রান্নার পদ্ধতি : রমজান মাসে নিজেকে সুস্থ রাখতে রান্না করার পদ্ধতিতেও খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় গ্রিলিং, বেকিং পদ্ধতিতে রান্না করুন। রান্নার সময় অতিরিক্ত মাত্রায় তেল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে পরিপাকক্রিয়া সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগত কারণে বাংলাদেশের মানুষ বিভিন্ন ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবার দিয়ে ইফতার করে থাকে। ওপরে বর্ণিত হাদিসগুলোর আলোকে যে কেউ এটা বুঝতে সক্ষম যে রমজানে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাবার অবশ্যই এড়িয়ে যেতে হবে। তাই সব রোজাদারের করণীয় হলো, নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া। কিছুতেই স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়।

লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও তাফসিরকারক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা